ক্ষমতাসীনদের অধীন কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না জামায়াত

ক্ষমতাসীনদের অধীন কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না জামায়াতক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন ১০ বছরে কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়নি অভিযোগ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। তাই এ সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করবে না। গত ১২ ফেব্রুয়ারি দলের আমির মকবুল আহমাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। একই সঙ্গে দলকে সুসংগঠিত করতে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেন শীর্ষ নেতারা।

বৈঠকে জামায়াত নেতারা জানান, সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। একই সঙ্গে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার কবর রচনা করেছে।

তারা বলেন, জাতি গত ১০টি বছর যাবৎ প্রত্যক্ষ করে আসছে যে, বর্তমান সরকারের অধীন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি ভোটারবিহীন ব্যালট ডাকাতির প্রহসনের নির্বাচনের নাটক অনুষ্ঠিত হয়। যে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার আশঙ্কায় জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো কেউই অংশগ্রহণ করেনি। জনগণ বিরোধী দলের ডাকে সাড়া দিয়ে এ নির্বাচন বয়কট করে। নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া আর কোনো প্রার্থী ছিল না। অবশিষ্ট আসনগুলোতে শতকরা ৫ ভাগ ভোটারও ভোট দিতে ভোট কেন্দ্রে যায়নি। নির্বাচনের নামে এই প্রহসন সারা দুনিয়ায় নজিরবিহীন। দলটির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছে প্রবল সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘এটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। দ্রুতই আর একটি নির্বাচন হবে। কিন্তু ক্ষমতার মোহে তিনি তার ঘোষণা থেকে সরে আসেন এবং জোর করে ক্ষমতা ধরে রেখে দলীয়করণ আরো পাকাপোক্ত করেন।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, পরবর্তী সময়ে এই ভোটারবিহীন সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য নির্বাচনে বিরোধীদল অংশগ্রহণ করলেও কোনো নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। সেই নির্বাচনগুলোতে ভোট ডাকাতির মোকাবিলা করে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন বর্তমান কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার নানা ছলছুতোয় তাদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে জেলখানায় আটক রেখে অনেককেই বারবার বরখাস্ত করেছে। শুধু তাই নয়, অনেককে গুমও করা হয়েছিল। তা সত্তে¡ও বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকার এবং তার আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের গালভরা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে বিরোধীদলগুলো ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং সরকার ও তার আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের দ্বারা নজিরবিহীন প্রতারিত হয়।

দলের নেতারা আরো জানান, ক্ষমতাসীন কর্তৃত্ববাদী সরকার নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করার পরিবর্তে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্ব থেকেই বিরোধী দলগুলোর ওপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়। সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শত শত গায়েবি মামলা দিয়ে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে জেলে আবদ্ধ করে রাখে। অনেককে গুম করে বিরোধী দলগুলোকে মাঠ থেকে বিতাড়িত করে দেয়। বিরোধীদলীয় জোটের ধানের শীষ প্রতীকের ১৬ জন প্রার্থীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়, অনেককে গুলি করে আহত এবং গুম করে। সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মী এবং নির্বাচনী এজেন্টদের ব্যাপকভাবে গ্রেফতার করে। এহেন পরিস্থিতিতে ২৯ ডিসেম্বর রাতে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধভাবে ব্যবহার করে। আর সরকারের মনোনীত প্রার্থীদের নৌকা ও লাঙ্গল প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে। ভোটের দিন বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও এজেন্টদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া হয়।

বৈঠকের বরাত দিয়ে জামায়াতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য আব্দুল হালিম গতকাল মানবকণ্ঠকে বলেন, এভাবে একতরফা নির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ করে আওয়ামী লীগ আবার জোর করে ক্ষমতায় বসে। বর্তমান সরকারের ১০ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হচ্ছে যে, দলীয় সরকারের অধীন কখনো অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ১৯৯১, ’৯৬ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন তিনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। তাতে জনগণ ভোট দিতে পেরেছে এবং সে নির্বাচন তিনটি দেশ-বিদেশে সবার কাছে প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের যে দাবি জানিয়ে আসছি তা আবারো সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

জামায়াত নেতা হালিম জানান, এমতাবস্থায় জামায়াতে ইসলামী বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

মানবকণ্ঠ/এএম