ক্ষতিপূরণে উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না

ক্ষতিপূরণে উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণে উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আদালতের রায় পেলেও ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না নিহতদের পরিবার। স্বজন হারানোর ব্যথা নিয়ে অসহায়ভাবে জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। আদালতের রায় দেয়ার পর বাস মালিকরা ক্ষতিপূরণ না দিয়ে হুমকি-ধমকি অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দৈনিক সংবাদের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর আদালতে মীমাংসাতেই ২৪ বছর পার হলেও আজও পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাননি তার স্ত্রী রওশন আক্তার। স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করে ২৮ বছর ধরে আদালতে দৌড়ে এখন ক্লান্ত ৭০ বছর বয়সী এই নারী। এখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইছেন। মন্টু ছাড়াও আদালতের রায়ে ক্ষতিপূরণ পাননি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজীব হাসান, শিশু জিহাদ, তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনিরসহ অনেকেই।

এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মামলায় হাইকোর্ট রায় দিলে পরিবহন মালিকরা আপিলে যায়। কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় আপিল করেছেন বাস মালিকরা। সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর মামলাটি আপিলের চূড়ান্ত রায় পেয়েছেন তার পরিবার। যে মামলাগুলো আপিলে চলমান আছে তার রায় হলেই ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হবে মালিকপক্ষ। দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক ছিলেন মোজাম্মেল হোসেন মণ্টু। ১৯৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর পেপসি কোলার সে সময়ে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বেভাজের ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি ট্রাক উল্টোদিকে চলার সময় মণ্টুকে চাপা দেয়। আর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান এই সাংবাদিক। দৈনিক সংবাদের পরামর্শে ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি মাসে জজ আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করেন মণ্টুর স্ত্রী রওশন আক্তার। প্রায় ১৬ বছর পর ২০০৫ সালের মার্চ মাসে এই মামলায় রায় দেন আদালত। বিচারক তিন কোটি ৫২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাংলাদেশ বেভারেজকে নির্দেশ দেন। সেই রায়েরও ১৩ বছর হয়ে গেল, এখনো ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও পাননি রওশনা। অবশ্য এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিলের মীমাংসা হতেও বিলম্ব হয়েছে। আর উচ্চ আদালত ক্ষতিপূরণের টাকাও কমিয়েছে কিছুটা। বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার ও নূরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১০ সালের ১১ মে চালকের ভুলে কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দেয়া যায় বলে মত দেন। পাশাপাশি টাকার পরিমাণ কমিয়ে দুই কোটি এক লাখ ৪৭ হাজার আট টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর হাইকোর্টে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। আর ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল সে সময়ের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ আপিল বিভাগ মন্টুর পরিবারকে এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে গাড়ির মালিক বা কোম্পানিকে নির্দেশ দেন। আপিল বিভাগের এই রায়টি দেশে আইনের শাসনের জন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু আদালত থেকে সাত দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিলেও সেই টাকা তিন বছরেও পরিশোধ করা হয়নি।

রওশন আক্তারের ক্ষতিপূরণের মামলার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে এপ্রিলে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজীব হাসানের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশের ঘটনায়। ৩ এপ্রিল রাজধানীর দুটি বাসের চাপায় হাত হারিয়ে ১৬ এপ্রিল মারা যান রাজীব। বাবা-মা হারা রাজীব তার দুই ভাইয়ের অভিভাবক ছিলেন। নিজে তিতুমীর কলেজে পড়াশোনা করলেও দুই ভাইয়ের জন্যই চাকরি করতেন। রাজীবের মৃত্যুর পর পর দুই ভাইয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

৮ মে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রাজীবের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন। এই টাকার অর্ধেক দিতে হতো রাষ্ট্রীয় পরিবহন কোম্পানি বিআরটিসি এবং স্বজন পরিবহনকে। এই দুটি কোম্পানির বাস চাপাতেই আহত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন রাজীব। অবশ্য ২২ মে এই আদেশ স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ। এর আগেও দেখা গেছে, আদালত থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার একাধিক আদেশের পরও ভুক্তভোগীরা একটি টাকাও পাননি।
২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর শাহজাহানপুর রেল কলোনিতে কয়েকশ’ ফুট গভীর কূপের পাইপে পড়ে মারা যাওয়া চার বছরের শিশু জিহাদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ এসেছে ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু হাইকোর্টের সে আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি ২৭ মাসেও।

চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক মিশুক মুনিরের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ এলেও সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। ওই দুটি মামলায় আইনি প্রক্রিয়া তাও কিছু বাকি আছে। কিন্তু সাংবাদিক মন্টুর মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণ দিতে আদালতের আদেশের পর আর কোনো আইনি প্রক্রিয়াই বাকি নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর স্ত্রী রওশন আক্তার বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর বাবার বাড়িতে থাকতেন বলে ভাড়া লাগত না। তখন বেতন ছিল দেড় হাজার টাকা। প্রতি মাসেই উকিল, মুহুরি, সেরেস্তেদার, পিয়ন থেকে শুরু করে সবাইকে টাকা দিতে হতো। মাত্র ১০ টাকা ২০ টাকা রিকশা ভাড়া বাঁচাতে মাইলের পর মাইল পথ হেঁটেছি’- কঠিন জীবনের অবস্থা বলতে গিয়ে রওশন আক্তার বলেন, জীবনের শেষ বেলায় ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে সন্তানদের জন্য অন্তত কিছু করে যেতে পারবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশেও যখন টাকা পরিশোধ হচ্ছে না, তখন তিনি ২০১৬ সালে আবার মামলা করেন। সেই মামলায় আদালত থেকে বাংলাদেশ বেভারেজ কোম্পানির জমি ক্রোক করে বিক্রির জন্য আদেশ এসেছে। সেই নিলাম বিজ্ঞপ্তি দু’বার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কেউ নিলামে অংশ নেননি। এর পেছনে কোম্পানির হাত দেখেন তিনি। এই মামলার বিবাদিরা ও আইনজীবীরা খুবই শক্তিশালী। তাদের কারণে নিলাম ডাকলে সেখানে কেউই যেতে পারেন না। ক্ষতিপূরণের টাকার কথা বলতে একবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনেও গিয়েছিলেন রওশন আক্তার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততার জন্য তার দেখা পাননি। পরে ব্যক্তিগত সহকারী সাজ্জাদুল হাসানকে বলে এসেছিলেন বিষয়টি। পরে কী হয়েছে আর জানেন না।

মানবকণ্ঠ/এসএস