ক্রেডিট কার্ডে সুদহারের সীমা মানছে না ব্যাংকগুলো

রাসেল আহমেদ রনি। কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। মে মাসে তার ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে বকেয়া ছিল এক লাখ টাকা। তার বিপরীতে ব্যাংক কেটে নিয়েছে ২৯ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ২৯ শতাংশ সুদ কেটে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। যদিও গত মাসে ক্রেডিট কার্ডে সুদহার বেঁধে দিয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৬ শতাংশের বেশি হতে পারবে না এসব কার্ডের সুদহার। কিন্তু এই নির্দেশনা কোনো ব্যাংকই মানছে না।
এ প্রসঙ্গে রাসেল আহমেদ বলেন, আমি তিনটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করি। প্রতিটি ব্যাংকই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার তুলনায় অনেক বেশি সুদহার কেটে নিচ্ছে। বিশেষ করে দেশের বাইরে কেনাকাটার ক্ষেত্রে গলাকাটা অবস্থা। সেখানে ডলারে কোনো ব্যাংকই ৩০ শতাংশের নিচে সুদ নেয় না। তিনি আরো বলেন, যারা নিয়মিত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন, তাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় ব্যাংক কত শতাংশ সুদ নিচ্ছে। তবে অনেক বেশি সুদ নিচ্ছে এটা সবাই বুঝতে পারেন। কিন্তু অসহায় ব্যাংকের আবদার মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন এমন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা ব্যাংকের কাছে জিম্মি হয়ে যায়। কোনো কোনো ব্যাংক বকেয়া পরিশোধের সময় পেরিয়ে গেলে পরিবারের লোকজনকে ফোন করে বিব্রত করে। এমনকি পুলিশ বা ডিবি থেকে লোক আসবে বলেও হুমকি দেয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোর অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান তারা।
১১ মে ক্রেডিট কার্ড সেবাসংক্রান্ত এক নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোক্তা ঋণের যে সুদহার রয়েছে, তার চেয়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বেশি হতে পারবে এসব কার্ডের সুদহার। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ভোক্তা ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ, ফলে ক্রেডিট কার্ডে নতুন সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ। যদিও ব্যাংকগুলো বর্তমানে ক্রেডিট কার্ডে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ কেটে নেয়। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এর ফলে ক্রেডিট কার্ডের যেসব ব্যবহারকারী সুদহার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন, তারা কিছুটা স্বস্তির আশা পেয়েছেন। বর্তমানে দেশে ৯ লাখ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী রয়েছেন। তবে ব্যাংকগুলো এখনো এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়নি বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশনাটি পুনর্বিবেচনার দাবিতে চিঠি দিয়েছে ব্যাংক নির্বাহীদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। একই দাবিতে চিঠি দিয়েছে ক্রেডিট কার্ড সেবার শীর্ষে থাকা দ্য সিটি ব্যাংকও। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা মানবকণ্ঠকে বলেন, যে কোনো গাইডলাইন বা প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর হওয়ার কথা। ক্রেডিট কার্ড বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যে নির্দেশনা দিয়েছে সেখানে সুদের হার ছাড়াও বেশকিছু বিষয় ছিল। যদি কোনো ব্যাংক এখনো সেই নির্দেশনার চেয়ে বেশি সুদহার নেয় তাহলে অবশ্যই তাদের সেটা ফেরত দিতে হবে। এবিবির দেয়া চিঠি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা চিঠি দিয়েছে বলে শুনেছি। তাদের কিছু দাবি আছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। সবকিছু পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার। ক্রেডিট কার্ড সেবার শীর্ষে রয়েছে দ্য সিটি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক। এ ছাড়া মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি ব্যাংক সেবাটি দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি মাসেই গ্রাহকরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ৭৩৫ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। ডিসেম্বরে ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকরা ৭০৫ কোটি টাকার লেনদেন করেন। জানুয়ারিতে প্রায় ৮ লাখ ৭৭ হাজার ক্রেডিট কার্ড চালু ছিল। এর মধ্যে দ্য সিটি ব্যাংকের ২ লাখ ৮ হাজার, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ১ লাখ ৫০ হাজার, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ লাখ ৫০ হাজার ও ব্র্যাক ব্যাংকের ১ লাখ ৩ হাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ব্যাংক গ্রাহককে ক্রেডিট কার্ডের যে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, তার ৫০ ভাগ নগদ উত্তোলন করতে পারবেন। কার্ডধারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যবহারের ওপর কোনো ধরনের পুরস্কার, বোনাস, কুপন, টিকিটের অফার দেয়া যাবে না। একজন কার্ডধারীকে যে সৌজন্য বা অতিরিক্ত কার্ড দেয়া হয়, ওই কার্ড কোনো ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ পাবে না। ক্রেডিট কার্ড পেতে হলে কোনো ধরনের ঋণখেলাপি হওয়া যাবে না, পাশাপাশি গ্রাহকের ই-টিআইএন থাকতে হবে। কার্ডে যে ঋণ হবে, তা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পরিশোধ না করলে গ্রাহক খেলাপি হয়ে পড়বেন। তার নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোতে (সিআইবি) প্রতিবেদন পাঠাতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে। সুদ হিসাবের পদ্ধতি, বকেয়া পরিশোধের শেষ সময়সীমা গ্রাহককে সুস্পষ্টভাবে অবহিত করতে হবে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কাউকে ক্রেডিট কার্ড দেয়া যাবে না। তবে যদি কোনো শিক্ষার্থীর পড়ালেখা কার্ডের লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে ইস্যু করা যাবে। তা ছাড়া ক্রেডিট কার্ডে কোনো সংশোধনী আনতে হলে কার্যকরের ৩০ দিনের আগে গ্রাহককে অবহিত করতে হবে।

মানবকণ্ঠ/জেডএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.