কোলাহলের নয় শুদ্ধতার বঙ্গবন্ধু আগামীর আশ্রয়

খুব মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। আজ যা ইতিহাস সেদিন তা ছিল সত্য। আমাদের যৌবনে বঙ্গবন্ধুর নাম বলা যেত না। জয় বাংলা উচ্চারণে ছিল বাধা। দিনের পর দিন নানা মঞ্চে আমরা তা বলে বলে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিলেও রাষ্ট্রীয় টিভি বেতার মিডিয়ায় ছিল নিষিদ্ধ। সে নিষিদ্ধ যে কতটা জাগ্রত আর আবেগময় হয়ে উঠেছিল তার প্রমাণ দেখেছিলাম ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জেতার পর প্রথম যেদিন ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারিত হলো।

ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর রাজপথ সন্ধ্যায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। যেন কারফিউ। যে কোনো হলিউড বলিউড মুভির চাইতেও আকর্ষণে অধিক সে ভাষণ আমাদের বাড়িতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। যেন এক জাদুকরের জাদুময় টান। আজ কি আসলে সে অবস্থা আছে? অতি প্রচার আর অকারণ প্রচারে আমরা কি তার ধার কমিয়ে ফেলিনি?

একটা সময় বঙ্গবন্ধু পরিষদের মিছিল ছিল চোখে পড়ার মতো। আশা জাগানিয়া সেই মিছিল পনেরো আগস্ট কখন রাস্তায় নামবে সেটা দেখার জন্য কৌতূহলী মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। বিচারপতি থেকে চাষি বা সাধারণ মানুষের সেই সব শোভাযাত্রা আজ কিংবদন্তি। মানুষ চোখের পানি লুকিয়ে সবুর করত কখন আবার জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত হবে দেশ। কখন তারা বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাবেন। আজ কি সে জায়গাটা তেমন রেখেছে রাজনীতি? স্পষ্ট মনে আছে, জীবনের শেষদিকে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বারবার বলতেন, মানুষ আমাকে কেন এত ভালোবাসে? আমি তো তাদের তেমন কিছু দিতে পারি নাই।

যে মানুষদের তিনি সুখী সচ্ছল আর আধুনিক করতে জান দিয়েছিলেন তারা কষ্ট অভাব অনটন এড়িয়ে তাঁর জন্য গাছের ফল বাগানের ফুল মাঠের ফসল নিয়ে আসত। দু হাত ভরে গ্রহণ করে চোখের পানিতে ভাসতেন বঙ্গবন্ধু। কি বেদনা আর কি অভিমান ছিল তাঁর গলায়। নিজের অপারগতার কথা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না। আর আজ? নেতারা ফলফুল গ্রহণ করেন না। কোথাও তারা পায় সোনার নৌকা, কোথাও সোনার মুকুট আর টাকার পাহাড়। এরাই আবার বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তুলে ধরার গল্প শোনান আমাদের।

রাজনীতি সবকালে সবসময় তার নিজের মতো করে চলে। সেখানে অবিমিশ্র ভালো মন্দ বলতে কিছু নাই। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কিছু ভুল নিশ্চয়ই ছিল, যার বড় একটি তাজউদ্দীনকে মূল্যায়ন না করা। আর একটি মোশতাকের মতো সাপ খল মীরজাফরকে বিশ্বাস করা। তার পরিণতি দেখেছি আমরা। রক্তের বন্যায় ভেসে যাওয়া ইতিহাসে তার নমুনা আছে। কিন্তু এ থেকে কি পাঠ নিয়েছে রাজনীতি? আজো ঘরে ঘরে মীরজাফর আর দুশমনের দল। তারাই ঘিরে আছে গদিওয়ালাদের। দূরে হটে গেছে নিবেদিত সৈনিকেরা। দল থকে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত সেইসব ত্যাগীর দীর্ঘশ্বাস কি ছেড়ে কথা বলবে? আজকের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কিছু নাই।

এটা কোন শুভ বিষয় হতে পারে না। সবাই জানে দলে, দলের ভেতরে সবজায়গায় সুবিধাভোগীরা ঢুকে গেছে। একেকটা বৈরী পরিবেশ বা রাজপথে ঘটনা দুর্ঘটনাতেই দেখি দল বা রাজনীতি কতটা অসমর্থ। এইটুকু কে না বোঝে? কিন্তু সিংহাসনে থাকলে হয়তো তা চোখে পড়ে না। রাজা যেমন প্রজা ব্যতীত সেনা উজির নাজির নিয়ে বেশিদিন চলতে পারে না, গণতন্ত্রও জনগণ ছাড়া বাস্তবে অকার্যকর। আওয়ামী লীগের ভাগ্য ইতিহাস তাদের সঙ্গে আছে। এদেশের অতীত ঘটনায় তাদের অবদান প্রয়াত নেতাদের ভূমিকা জীবিত কিংবদন্তিদের কারণেই দল এখনো সচল। নতুন প্রজন্মের দিকে তাকালে সে ভরসা পাই না। বরং ভয় জাগে।

এই সেদিনও আমরা রাজপথে নেমে আসা তরুণের বুকে লাগানো পোস্টারের ভাষা দেখে চমকে উঠেছি। কোটা আন্দোলনের নামে যে উত্তপ্ত রাজপথ তার কারণে নেমে আসা যুবকের বুকে লেখা ছিল ‘আমি রাজাকার’। কৌশলে বা অপকৌশলে রাজাকার শব্দটি জায়েজ করা হচ্ছে। এখন যুবসমাজে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তেমন কোনো আবেগ নাই। এটা না মানলে আপনি সত্য অস্বীকার করছেন মাত্র। কিন্তু কেন নাই? তা কি ভেবে দেখছি আমরা? যে কোনো বিষয়কে খুব বেশি কচলাতে নেই। তাতে তেতো হয়ে যায় সব। মুক্তিযুদ্ধ একটি গৌরবময় অতীত। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু ও জাতির সম্মান।

সে কথাটা ভুলে যত্রতত্র যেভাবে ইচ্ছে এর ব্যবহার আর কি ফল বয়ে আনতে পারে? তাই এ কথাটা মনে করিয়ে দিতে চাই- এখনো সময় আছে, পাশের দেশগুলোর দিকে তাকান। সেসব দেশে সরকার বদল আরো কতকিছু ঘটে কিন্তু ইতিহাস বদলায় না। ইতিহাস নিয়ে মারামারি তর্ক থাকলেও নাই অস্বীকার বা সত্য এড়িয়ে যাওয়া। আওয়ামী লীগ যে অপশক্তির ভয়ে তা করে বা নিজেদের ভেতর দুর্বলতা তৈরি করে তার উত্তরণে তারুণ্যের জড়িত হবার বিকল্প নাই। কিন্তু আজ বঙ্গবন্ধুর আমলে যে ছাত্রলীগ ছিল অগ্রগামী তারাই সবচাইতে ভয়ঙ্কর। তাদের নামে বা তাদের কারণে যা হচ্ছে তাকে কি কেবল ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেয়া যায়? কারণে অকারণে তাদের যে ভয়াবহ রূপ আসলে তা সামাল দেয়ার কেউ নেই। অথচ বঙ্গবন্ধু একবার এসে দাঁড়ালে বীরের দল বাঘ থেকে ইঁদুর হয়ে গর্তে লুকাত।

বলছিলাম আমাদের যৌবনের কথা। সে সময় জাতি নিশ্চিতভাবে জানত আমাদের মাথার ওপর অভিভাবক আছেন। শত বিপদেও যিনি দেশ ও জাতিকে ফেলে যাবেন না বা বুক দিয়ে আগলে রাখবেন। তাঁর সেই বুক যারা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল সেই শয়তানদের বিচার ও শাস্তি হলেও দলের মীরজাফরদের ব্যাপারে নীরবতা আজো বোধগম্য নয়। কারণ এরা না থাকলে কেউ খুন করতে সাহস পেত না। সমীকরণের নতুন অংকে জায়েজ হয়ে যাওয়া এদের না ঠেকালে কী করে নিরাপদ হবে আওয়ামী লীগ? আর একটা বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই, সুষ্ঠু ও সমান্তরাল বিরোধিতা না থাকলে কোনো দেশের উন্নতি বা অগ্রগতি টেকসই হয় না। এটা নতুন কিছু নয়। নতুন শুধু এই আজকাল রাজনীতি সহ্য শক্তি হারিয়ে কেবলই একক আর সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে।

এই সর্বগ্রাসিতা বঙ্গবন্ধু বা তাঁর দোসর ও রাজনীতিকে মানায় না। কারণ তিনি সবার। তিনি যদি সর্বজনীন হতে না পারেন বা হতে দেয়া না হয় তো এসব কাঙালি ভোজন আর শোকের মাতম একদিন পথ হারাবেই। পথ এখনো হারিয়ে ফেলেছে প্রায়। মানুষের মন ও বিবেকে যে বঙ্গবন্ধু তিনি যে কতটা শক্তিশালী সেটা আমরা পুরো এরশাদ আমল জিয়ার আমল আর বিএনপির আমলে দেখেছি।

সে শক্তিটা যত্ন করে তুলে রাখাই ছিল বিবেচনার কাজ। সেটা কেউ করছে না। যা করছে তার নাম কোলাহল। একদিকে দলে দলের বাইরে মোশতাক গং কিলবিল করছে। আরেকদিকে চলছে ষড়যন্ত্র। দেশে বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ আর্থিকভাবে উন্নত হলেও নানা কারণে নিম্নমুখী। সেটা মনে রাখলে সময় ছেড়ে কথা বলবে না। সব চাইতে জরুরি বাংলাদেশ ও তার মুক্তিযুদ্ধের ভাবমূর্তি ও সম্মান বজায় রাখা।

নানা ষড়যন্ত্রে ভগবান ভূত হবার সমাজ আমাদের। বদলে যাবার জন্য একপায়ে খাড়া দেশে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, এমনকি ইতিহাসও। তাই বড় ভয় লাগে। বঙ্গবন্ধু তাঁর আপন মহিমায় উদ্ভাসিত। তারপরও আমরা যেন এমন অস্ত্র এমন ভালোবাসা আর এমন আশ্রয়কে অপব্যবহারে মলিন না করি। যেদিকে তাকাই বন্দনা আর স্তাবকতায় অন্ধ রাজনীতি তাঁকেও রেহাই দিতে পারছে না। মনে হয় সে গানটিই যেন সত্য : ‘তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না করে শুধু মিছে কোলাহল।’ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একাকার অভিন্ন বলেই তাকে পবিত্র রাখা জাতীয় দায়িত্ব। লেখক: সিডনী প্রবাসী