কোন পথে ডাকসু নির্বাচন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে নির্বাচন নেই ছাত্র রাজনীতির এই সূতিকাগারের। ফলে গড়ে উঠছে না মেধাবী নেতৃত্ব।

শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী সিনেটের ১০৫ সদস্যের মধ্যে ডাকসু থেকে ৫ জন ছাত্র প্রতিনিধি থাকবেন। ডাকসু না থাকায় ছাত্র প্রতিনিধিও নেই।

এদিকে ডাকসু নির্বাচনের পদক্ষেপ নিতে প্রথমে ৩১ শিক্ষার্থীর পক্ষে ২০১২ সালের ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টর ও কোষাধ্যক্ষকে উকিল নোটিশ দেয়া হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাড়া না দেয়ায় ২৫ শিক্ষার্থীর পক্ষে রিট আবেদন করা হয়। দীর্ঘ শুনানির পর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১৭ তারিখে আদালত ৬ মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। প্রশাসন সময় বাড়িয়ে আগামী বছরের মার্চ মাসে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। তবে আদালতকে এ বিষয়ে অবগত করা হয়নি তখন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ডাকসু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের তালিকা হালনাগাদ করার জন্য প্রাধ্যক্ষদের বলা হয়েছে। ডিজিটালভাবে সবকিছু হালনাগাদ করা হবে।

ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দীর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আদালত অবমাননা করেছেন। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে ১ বছরেরও বেশি সময় পর নির্বাচন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নতন কোনো ষড়যন্ত্র আছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে নির্বাচন বন্ধ। বার বার এমন আশ্বাস দেয়া হয়েছে। সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনই হয়নি। রিটের কারণে আদালত যে নির্দেশনা দিয়েছে, সেটাও মানা হয়নি।

জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৬ জুন। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে ৩ দফায় তফসিল ঘোষণা করলেও হয়নি নির্বাচন। ২০০৫ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার উপাচার্য এস এম এ ফায়েজ ওই বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে তা গতি পায়নি। ২০০৯ সালে তখনকার উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক দায়িত্ব নেয়ার পরই নির্বাচন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও ঘোষণা অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হন।

বিশ্লেষকদের মতে, ২৮ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার মূল কারণ ক্ষমতাসীনদের একক নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর কোনো দলই ডাকসুর বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। অথচ বিরোধী শিবিরে থাকার সময় একই দলের নেতাদের ডাকসুর দাবিতে সোচ্চার হতে দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও চায় না ছাত্র প্রতিনিধিরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হোক।

এ প্রক্রিয়ায় ছাত্র প্রতিনিধিরা যুক্ত হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ খেয়ালখুশিমতো প্রশাসন চালাতে পারবে না। এটা তাদের ভয়ের কারণ। ডাকসু থাকলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে ছাত্ররা সোচ্চার হবে। এটা শাসক দলের বড় ভয়ের জায়গা। এ ছাড়া নিজ দলের ছাত্র সংগঠন ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলে ছাত্রদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ও তাদের মধ্যে কাজ করে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতা হলো- সরকার চায় না বলেই ডাকসু নির্বাচন হয় না। সরকার ভাবে, ডাকসু নির্বাচন হলে ছাত্রদের মতামত তাদের পক্ষে নাও যেতে পারে। আরেকটা সমস্যা হলো, এ নির্বাচনকে সরকারের জনপ্রিয়তার অংশ হিসেবে নেয়া হয়। ফলে সরকার চায় না, তাদের জনপ্রিয়তার ভাটা প্রকাশ্যে আসুক। ফলে তারা নির্বাচন দেয় না।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন বলেন, ক্যাম্পাসে এমনো অনেক ছাত্র সংগঠন আছে যেগুলোর নেতৃত্বে অছাত্ররা রয়েছে। তারা থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ছাত্র সংগঠনের পাশাপাশি থেকে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান ছাত্রদের হাতে সংগঠনের নেতৃত্ব তুলে দিতে হবে। তিনি বলেন, অছাত্র ও মৌলবাদী সংগঠনগুলো যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের কাজ না করতে পারে সেজন্য প্রশাসনকে উদ্যোগী হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি এ কাজটি করতে পারে তাহলে ডাকসুর অচলাবস্থা ভাঙা সম্ভব হবে।

ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বলেন, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যত আন্দোলন হয়েছে, সবকিছুর মূল কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই নেতৃত্বে ছিল। সরকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলনকে তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বশূন্য করার জন্যই ডাকসু নির্বাচন বন্ধ রেখেছে।

ডাকসুর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের যুগ্ম সমন্বয়ক আবু রায়হান খান বলেন, হাইকোর্ট নির্বাচন করার জন্য ৬ মাস সময় বেঁধে দিয়েছিল। যা ইতিমধ্যে চলে গেছে। প্রশাসনের এমন আচরণ নির্বাচন না দেয়ারই পাঁয়তারা।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নীরবতায় আদালত অবমাননার মামলা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন আয়োজনে হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে দেয়া আইনি নোটিসের যথাযথ জবাব না পেয়ে উপাচার্য, প্রক্টর, কোষাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে। গতকাল বুধবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় মামলাটি করেন আইনজীবী মনজিল মোরশেদ।

পরে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে উচ্চ আদালতের রায়ের যে বাধ্যবাধকতা সে বিষয়টি উল্লেখ করে ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান, প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানি ও কোষাধ্যক্ষ ড. কামাল উদ্দিনকে আইনি নোটিশ দিয়েছিলাম। উপাচার্যের পক্ষে একজন আইনজীবী একটা জবাব দিয়েছেন। কিন্তু আমরা যে নির্বাচনের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বলেছি সে ব্যাপারে তারা পদক্ষেপ নেননি, এটা নিশ্চিত হয়েই এই মামলাটা করা হয়েছে।

মনজিল মোরশেদ বলেন, জবাবে তো তারা বলবে যে, পদক্ষেপ নিয়েছি বা নিচ্ছি। কিন্তু সে রকম কোনো জবাব না দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আইনি নোটিশে আমরা যে বক্তব্য দিয়েছি, তা তারা অস্বীকার করছেন।

আগামী রোববার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হতে পারে বলে জানান এ আইনজীবী। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ছয় বছর আগের একটি রুল যথাযথ ঘোষণা করে চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি দেয়া রায়ে ছয় মাসের মধ্যে এই নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা দরকার হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সে বিষয়ে ‘যথাযথ সহযোগিতা’ দিতেও রায়ে বলে দেয় আদালত।

এ রায়ের পর গত সাত মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসু নির্বাচনের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কি না, তা জানতে ৪ সেপ্টেম্বর আইনি নোটিশ পাঠান রিটকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরের বছর যাত্রা শুরু করে ডাকসু। প্রথমে পরোক্ষ নির্বাচন হলেও শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে ডাকসু নির্বাচন শুরু হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর।

ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে ডাকসু এবং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতারা ছিলেন সামনের কাতারে। স্বাধীন বাংলাদেশেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

প্রতিবছর ডাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভোট হয়েছে মাত্র ছয়বার। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু নির্বাচনের পর ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও সে নির্বাচন হয়নি। পরে ডাকসু নির্বাচনের পদক্ষেপ নিতে প্রথমে ৩১ শিক্ষার্থীর পক্ষে ২০১২ সালের ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টর ও কোষাধ্যক্ষকে উকিল নোটিশ দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাড়া না দেয়ায় ২৫ শিক্ষার্থীর পক্ষে রিট আবেদন করা হয়। সেখানে বলা হয়, ১৯৯৮ সালের ২৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এক সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ডাকসু নির্বাচনের পর এর সময়সীমা হবে এক বছর। পরবর্তী তিন মাস নির্বাচন না হলে বিদ্যমান কমিটি কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। এ সিদ্ধান্তের পর ডাকসু ভেঙে দেয়া হয়।

সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল থেকে আমানউল্লাহ আমান সহ-সভাপতি (ভিপি) এবং খায়রুল কবির খোকন সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে আমান বিএনপির উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আর খোকন যুগ্ম মহাসচিব। ছাত্র সংগঠনগুলো থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়ে এলেও তারপর আর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার কেন্দ্র সিনেটে ছাত্রদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকছে না।

মানবকণ্ঠ/এএএম