কোথায় হারিয়ে গেলেন ভাই?

কোথায় হারিয়ে গেলেন ভাই?

বিশ্বাস করি না, করতে চাই না। তবু এটাই অমোঘ সত্য। বকর ভাই নেই। আমাদের বকর ভাই। দীর্ঘ প্রায় সাত বছর যার ছায়াতলে কাজ করে যাচ্ছিলাম দৈনিক মানবকণ্ঠে। এই দীর্ঘ সময়ের কত স্মৃতি! একে একে ছয়জন সহকর্মীর চিরপ্রস্থান প্রত্যক্ষ করা কত যে দুঃসহ যন্ত্রণার তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা যারা কর্মজীবী তাদের কাছে প্রতিষ্ঠান হলো সংসার! এই সংসারের প্রতিটি সদস্য আপন, অনেক কাছের মানুষ। তাই কারো যে কোনো ব্যথায় অন্যরা ব্যথিত হই। প্রথম ধাক্কাটা খেয়েছিলাম, ওবায়দুল গনি চন্দন ভাই চলে যাওয়ায়! আগের দিনও পাতার কাজ করে গেছেন, পরের কয়েক দিনের ডামি শিট তার ডেস্কের ওপর সাজানো। তার পরিকল্পনাগুলো পড়ে রয়েছে। শুধু চন্দন ভাই নেই। আহারে চন্দন ভাই! হাসিতে, আনন্দে একাই পুরো অফিস মাতিয়ে রাখতেন। হঠাত্ এক সকালে শুনি, চন্দন ভাই নেই। বুকের ওপর চাবুকের আঘাত পড়ল! মানুষের জীবন এমন কেন? সেই শোক কাটিয়ে উঠতে শরীরের-মনের অর্ধেক শক্তি ক্ষয় হয়ে গেল। বিকেলের শিফটে কম্পিউটারে কাজ করতেন টিপু ভাই। অফিসেই অসুস্থ হয়ে পড়েন! ফিরে আসেননি আর! তার সব স্বপ্ন, ব্যস্ততা, কষ্ট, না পাওয়া পড়ে রইল ধূলি হয়ে!

আবু তালেব। দিনের শিফটে কম্পোজিটর হিসেবে কাজ করতেন। কাজ শেখার গভীর আগ্রহ থেকে পেজ মেকআপটা শিখে নিয়েছিলেন। প্রায়ই সম্পাদকীয় পাতা মেকআপ করতেন। আমাদের চেয়েও তালেব ভাইয়ের তাড়া ছিল পাতা তৈরির। কতবার যে এসে ধর্ণা দিতেন! আপা মেটার দেন, ছবি দেন, ইনসার্ট মার্ক করে দেন। সেই ছেলেটিও নাই হয়ে গেল। কোরবানির ছুটিতে বাড়ি গেলেন। সেই ছুটি আর ফুরাল না। এরও আগে প্রেসের আরো দু’জন সহকর্মী অকালে চলে গেছেন! এই সব মানুষেরা, মানবকণ্ঠ পরিবারের সদস্যরা কেমন আছেন জানার উপায় নেই। আমরা শুধু তাদের শোক বয়ে চলেছি। আজ তিন দিন হয়ে গেল! বিশ্বাস হয় না বকর ভাই নেই। মনে আছে চন্দন ভাইয়ের মৃত্যুর পর অফিস প্রাঙ্গণেই অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে থেকে মৃত্যু পরবর্তী সব দায়িত্ব পালন করেছিলেন বকর ভাই। চন্দন ভাইকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন তিনি। সে ভালোবাসার কোনো আকাশ পাতাল নেই। মৃত্যুর খবর শুনে আমরা সবাই ধানমণ্ডি ছুটে গেলাম বকর ভাইকে বিদায় দিতে। কেউ কেউ গেল প্রেসক্লাব, আজিমপুর পর্যন্ত! আমি বকর ভাইয়ের মৃত মুখ দেখতে চাইনি। চেয়েছিলাম, চিরচেনা বকর ভাই আমার স্মৃতিতে গেঁথে থাকুক। পারলাম না। ছুটে গেলাম। এত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন বকর ভাই? বিশ্বাস হয় না। কাজপাগল বকর ভাইকে এমন নীরবতায় মানায় না।

চারদিকে শূন্যতা। এত গভীর, এত ভারি সে শূন্যতা যে সে ভার বহন করা যায় না। মানবকণ্ঠে আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, কাজে নিয়োজিত আছি নিজেদের পাষাণ সাজিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা প্রত্যেকে জানি কষ্ট হচ্ছে আমাদের। খুব কষ্ট! বর্ণনার অতীত সে মনো কষ্ট! বকর ভাই চলে গেছেন। চলে তো যাব আমরাও। কিন্তু এভাবে? বকর ভাই দেখে গেলেন না আমরা সবাই তাকে কতটা ভালোবাসতাম! প্রাতিষ্ঠানিক নানা সমস্যা-সংকট নিয়ে দাঁড়াতাম গিয়ে তার সামনে। কখনো কখনো অসহায় হয়ে পড়তেন। কারণ সব সমস্যা সমাধান করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার করুণ, অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে আমরাও কতবার মুখ নিচু করে কাজে এসে বসেছি! সমস্ত দায় থেকে মুক্তি নিয়ে চলে গেলেন বকর ভাই।

বকর ভাইয়ের শূন্য কক্ষটির পাশে আমার বসার জায়গা। ওই কক্ষটির ভেতরকার স্থির শূন্যতা বুকের ভেতর চাপ তৈরি করে। সব কিছু ফেলে চলে যেতে ইচ্ছে করে। কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে চারগুণ বেড়ে গিয়েছিল বকর ভাইয়ের। পাত্তাই দেননি। শুধু কাজ আর কাজ। পত্রিকা আর নিউজই ছিল তার একমাত্র ধ্যান আর জ্ঞান। দুর্বলতার আরেকটি জায়গা ছিল তার। মা। বকর ভাইয়ের মা বেঁচে আছেন এখনো। মাঝে মাঝেই মায়ের গল্প করতেন। সেদিনও বলছিলেন, আমি যখন বাসা থেকে বের হই, প্রতিদিন মা আমাকে আয়াতুল কুরসী পড়ে ফুঁ দিয়ে দেন। কথাটি বলার সময় বকর ভাইয়ের মুখ মায়ের প্রতি মমতায়, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় দ্যুতিময় হয়ে উঠেছিল।

আর দেখা হবে না বকর ভাইয়ের কর্মব্যস্ত, উদ্বিগ্ন মুখ। অফিসে ছুটে আসবেন না আর কোনো দিন। আয়াতুল কুরসী পড়ে ছেলেকে নিরাপদ রাখতে বুকে-মাথায় আর ফুঁ দেবেন না তার মা! তবু ভালো থাকুন বকর ভাই। ওপাড়ে শান্তিময় স্থানে আপনার জায়গা হোক।

মানবকণ্ঠ/এসএস