কেমিক্যালেই এত প্রাণহানি

যে কোনো জায়গায় আগুন লাগতেই পারে। সে আগুনের লেলিহান শিখা কেন এত ভয়াবহতা, ব্যাপকতা ও দ্রুত বিস্তার সেটাই মুখ্য প্রশ্ন। বিপুল পরিমাণ কেমিক্যাল (রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ) থাকার কারণেই মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলেই এতগুলো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। মুহূর্তেই তাজা প্রাণগুলো পুড়ে প্রায় কয়লা হয়ে গেছে। চকবাজার ট্র্যাজেডির নেপথ্যে যে সুগন্ধির অগণিত ক্যান, লাইটার রিফিল করার ক্যানসহ কসমেটিকস কেমিক্যাল ছিল সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের ভয়াবহ আগুনের ব্যাপারের এমন তথ্যই দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, ঘটনাস্থলে বিপুল পরিমাণ কেমিক্যাল থাকার কারণে ঘটনাস্থলে এক ধরনের ফায়ার চেইন তৈরি হয়েছিল। যে কারণে মুহূর্তেই সংলগ্ন সড়কে ও ভবনগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের এমন ভয়াবহতা থাকায় নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমহিম খেয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিটের সদস্যরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন অ্যান্ড সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসকরাও বলেছেন, ওই অগ্নিকাণ্ডের দগ্ধদের কারো কারো চামড়ার তিন স্তরই পুড়ে গিয়েছে। কেমিক্যালের কারণেই এমন গভীরভাবে পুড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে।

এ দিকে রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় কেমিক্যালের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রাথমিকভাবে মতো দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) তদন্ত কমিটি। চুড়িহাট্টা মোড়ের হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের বেজমেন্টে কেমিক্যাল ভর্তি শত শত কন্টেইনার পেয়েছে কমিটি। ওই কেমিক্যালে আগুন নাগাল পেলে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারত বলেও মনে করেন ডিএনসিসি তদন্ত কমিটি ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। এ ছাড়া পাঁচতলা ওই ভবনটিতে নেই কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা।

অপরদিকে চকবাজার ট্র্যাজেডিতে নিহতের মধ্যে শনাক্ত হওয়া ৪৫ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনকে গত বৃহস্পতিবার রাতে ও গতকাল আজিমপুর ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মরদেহ শনাক্ত না হওয়া ব্যক্তিদের ২০ জন স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন টিম। এ দিকে স্বজনদের খোঁজে গতকালও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে ও ঘটনাস্থলে অনেককে বিলাপ করতে দেখা গেছে। তাদের হাতে ছিল নিখোঁজ স্বজনদের ছবি।

অন্যদিকে চকবাজারে চুড়িহাট্টায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন নয়জনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্তলাল সেন। আহতদের মধ্যে পাঁচজনকে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রাখার কথাও জানান তিনি।

ওয়াহিদ ম্যানশনে কেমিক্যাল ছিল দাবি তদন্ত কমিটির: চকবাজারের ওয়াহিদ ম্যানশনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লে. কর্নেল এসএম জুলফিকার রহমান। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) তদন্ত কমিটির একজন সদস্য। গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শনে এসে তিনি এ মন্তব্য করেন।

জুলফিকার রহমান বলেন, ‘ভবনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এ ছাড়া অন্যান্য কেমিক্যাল ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে। এগুলো আগুনকে টিগার করেছে, যে কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কেমিক্যালের কারণে এভাবে ছড়িয়েছে। না হলে কখনোই আগুনে এভাবে ছড়ায় না।

তদন্ত কমিটির সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার পুরোটাতেই গোডাউন ছিল। এটি বেশ বড় ভবন হওয়া সত্ত্বেও আগুন নেভানোর কোনো ইকুইপমেন্ট নেই। পর্যাপ্ত সিঁড়ি নেই। ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়তো সিলিন্ডার বিস্ফোরণে, কিন্তু কেমিক্যালের কারণে আগুন ছড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়া ওয়াহিদ ম্যানশনের প্রথম তলা ও দ্বিতীয় তলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিম ও কলামগুলো বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩-৪ তলার বিম ও কলাম তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এক সপ্তাহ পর জানা যাবে, ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী কীনা।

দুর্ঘটনার সম্ভাব্য ৩ কারণ: বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম দাবি করেছেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল থেকে অনেক ক্লু পেয়েছি। ধারণা করা হচ্ছে তিনটি কারণে আগুন লাগতে পারে। কারণগুলো হচ্ছে- ট্রান্সফরমার, গ্যাস সিলিন্ডার অথবা কেমিক্যাল বিস্ফোরণ।’ গতকাল সকালে চকবাজারে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা কয়েকটি গাড়ি চেক করেছি। অনেকেই দুর্ঘটনাস্থলে থাকা যেই পিকআপটির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলেছিল। কিন্তু সেই পিকআপের সিলিন্ডারটি অক্ষত অবস্থায় আছে।’ তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা গেছে এই এলাকায় বেশ কিছু কেমিক্যালের দোকান রয়েছে। এ ছাড়া ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচে কিছু প্লাস্টিকের দানার দোকান ছিল। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।’

ঘটনাস্থলে ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়নি: চকবাজারে আগুন লাগার কারণ হিসেবে অনেকেই ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের কথা বলছেন। কিন্তু বুধবার রাতে সেখানে কোনো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়নি বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান।

তিনি বলেন, ‘চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনের ঘটনায় কোনো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়নি। তবে বিদ্যুতের তিনটি খুঁটি, চার স্পেন (এক খুঁটি থেকে অন্য খুঁটি পর্যন্ত এক স্পেন) এলটি তার (.৪১৫ কেভি লো ভোল্টেজ তার) ও ৫ স্পেন এরিয়াল বান্ডেল ক্যাবল নষ্ট হয়েছে। সেদিন রাতে আগুন লাগার পর চকবাজারের ১২টি ট্রান্সফরমার বন্ধ করে দেয়া হয়। পরের দিন বিকেলে চুড়িহাট্টা ছাড়া অন্য এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হয়।’

৪৫ জনের মরদেহ হস্তান্তর: চকবাজারে আগুনের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে গতকাল বিকেল পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ৪৫ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুড়ে যাওয়া লাশগুলো শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ নিহতের শরীর পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে।

ডিএনএ নমুনা দিলেন ২০ স্বজন: ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত অন্তত ২৫ জনের লাশ শনাক্ত করা যায়নি। লাশ শনাক্ত করতে নিহত লোকজনের স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছে সিআইডি। নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা গতকাল বেলা ১১টা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে লাশের সন্ধানে আসা স্বজনের ডিএনএ পরীক্ষা শুরু হয়। বিকেল পর্যন্ত ১৫টি মৃতদেহের জন্য ২০ জন স্বজন এসে তাদের ডিএনএ নমুনা দিয়ে গেছেন।

সিআইডির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন জানান, নিয়মিত মৃতদেহের নমুনা দিয়ে শনাক্ত করা হলেও অগ্নিদগ্ধদের ক্ষেত্রে তা সময়সাপেক্ষ। যারা ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছেন, তাদের রক্ত ও মুখের ভেতর থেকে কোষ সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃতদেহ থেকে হাড় ও দাঁতের নমুনা নেয়া হয়েছে। মৃতদেহ শনাক্ত করতে এক থেকে ৬ মাস সময় লাগবে। আজ শনিবার পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজের বুথ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।

১৫ মিনিটেই সবাই মারা যায়: প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর এত দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পরে যে ঘটনাস্থলের আশপাশের সব ভবনে ও পাঁচ রাস্তার মোড়ে অনেক মানুষ আটকে যায়। আর আগুন ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ ছিল প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, পারফিউম ও কেমিক্যাল। ভবন ও ঘটনাস্থল এতটাই ঘিঞ্জি যে আগুন লাগার পর পরই এসবে আগুন ধরে যায়। বের হওয়ার কোনো পথই ছিল না কারোর।

মানবকণ্ঠ/এআর