কেমন হবে আগামী নির্বাচন!

রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচনীমুখী। নির্বাচনী মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পুরোমাত্রায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিসহ বিভিন্ন দল। তৃণমূল নেতাকর্মী, সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়েই চলেছে। বাড়ছে তাদের কদর। এ মুহূর্তে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ এলাকায় সর্দার-মাতবর, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ছুটছেন দোয়া ও সমর্থন লাভের আশায়। সেই সঙ্গে প্রধান দু’টি রাজনৈতিক পক্ষ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী কিংবা সম্ভাব্য প্রার্থী, তৃণমূল নেতাকর্মী, সমর্থকরা নির্বাচনের নানামুখী আলোচনা-পর্যালোচনা, আগাম হিসাব-নিকাশ ও জল্পনা-কল্পনা শুরু করে দিয়েছেন।
গত নির্বাচনের আগে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ধারণা দেয়া হয়েছিল, অল্প কিছুদিন পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেয়া হবে। আন্তর্জাতিক চাপেই হোক কিংবা আবারো নির্বাচনের আশায় বিএনপি জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন থেকে সরে আসে। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেন, পরের ট্রেন ধরতে অর্থাৎ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপিকে অপেক্ষা করতে হবে এই সংসদের পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত।
বিএনপি আজ মাঠে বা সংসদে-কোথাও নেই। তারপরও আওয়ামী লীগ ভরসা পাচ্ছে না। আমাদের রাজনীতিকরা কে, কত বছর ক্ষমতায় থাকলেন, সেটি নিয়ে বড়াই করেন; কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে কীভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রাখবেন, সে নিয়ে মোটেই মাথা ঘামান না। আওয়ামী লীগের নেতারা গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়নের কথা বলে আসছেন। তবে আধুনিক যুগে গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন টেকসই হয় না।
বিগত নির্বাচনে বিএনপি না গিয়ে ভুল করেছে বলে আওয়ামী লীগ নেতারা জোর গলায় প্রচার করে থাকেন। তাদের এ কথার পেছনে যুক্তিও হয়তো আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এও স্বীকার করতে হবে যে, বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করায় বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, ১৫৪টি আসনে জনগণ ভোট দিতে পারেননি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যায় মহজোটের প্রার্থী। সংসদের ভেতরে ও বাইরে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারা প্রশাসনকে নিজের মনে করছেন। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো আগামী নির্বাচনেও হয়তো খেলা চলবে সংসদে প্রধান বিরোধী দল আর সরকারের অংশ জাতীয় পার্টিকে নিয়ে।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস বলে, বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, বিদেশিদের হস্তক্ষেপও বেড়েছে। অনেকের মতো বিএনপির উপলব্ধি ভারতের কংগ্রেস সরকার আওয়ামী লীগের পাশে ছিল বলেই একতরফা নির্বাচন করে জিততে পেরেছিল। ভেতরে ভেতরে আবারো নাকি বিদেশিদের কাছে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে তা আরো বাড়বে, সে ধারণা পাওয়া যায়।
নিকট অতীতে দৃষ্টি ফেরালে স্পষ্ট হয় ১৯৯৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সালের উদ্ভূত পরিস্থিতি কিংবা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে না আসার খেসারত দিতে হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোকে তো বটেই, দেশের মানুষকেও। ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণকে হাতিয়ার বানানোর অধিকার সংবিধান কাউকে দেয়নি। যদিও সংবিধানের দোহাই দিয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করেছে, যে যখন পেরেছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আগামী নির্বাচন নিয়ে চলা সংকট সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পথ দেখিয়েছেন। সংবিধানের মধ্যে থেকেও নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের নেতাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যায়। শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান। সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে বিএনপিকেও এই সরকারে রাখা সম্ভব। প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতে পারে। দায়িত্ব রয়েছেন সুশীল সমাজেরও।
আগামী দিনগুলোতে রাজনীতির মাঠে অনেক জল ঘোলা হবে। তর্ক-বিতর্ক হবে। দেশের মানুষ চায়, বিএনপিপ্রধান যে ক্ষমা ও ইতিবাচক রাজনীতির কথা বলেছেন, তার বাস্তবায়ন; আর আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দল, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নিজের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে নিজেকে এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে আগামী নির্বাচন কেমন হবে এবং রাজনীতির ভবিষ্যৎ। দেশের মানুষ আশা করতেই পারেন, আরেকটা ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হবে না আর জনগণ তাদের পছন্দের মানুষকে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবে। – রাজনীতি ডেস্ক