কেমন আছে জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে/এই বাংলায় হয়তো মানুয় নয় শঙ্খচিল শালিকের বেশে…। জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর পরেও ধানসিঁড়ি নদীর তীরে ফিরে আসতে চেয়েছেন। কিন্তু কেমন আছে তার ধানসিঁড়ি? নেই আগের মতো!
হারিয়ে যেতে বসেছে ধানসিঁড়ি নদীর সব সৌন্দর্য। তবে সবাই চুপ কেন? কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় নাকি এর এই বেহাল দশা। ঝালকাঠি সদর উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের সুগন্ধা বিশখালি, জাঙ্গালিয়া, সন্ধ্যা আর সুয়েজ খাল গবাখন চ্যানেল ছুঁয়ে ধানসিঁড়ি প্রবাহিত। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীর অপর প্রান্ত গিয়ে রাজাপুরের বাগড়ি বাজারের তীরবর্তী জাঙ্গালিয়া নদীতে পড়েছে। এক কালে নদীটির প্রশস্ততা এমন ছিল যে, তৎকালীন এক ডোঙা ধান সিদ্ধের জন্য যে সময় লাগত, নদী পার হতে ততক্ষণ সময় লাগত। তাই সে সময় নদীটিকে ধান সিদ্ধের বাঁকও বলা হতো। আবার কারো কারো মতে, এ নদীর বিশাল চরে ব্যাপক ধানের চাষ হতো। কৃষকরা সে ধান কেটে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য হাজার হাজার মণ ধান আঁটির ওপর আঁটি বেঁধে সিঁড়ির মতো করে সাজিয়ে রাখতেন আর সেখান থেকেই নদীর নাম ধানসিঁড়ি।
লোকশ্রুতি রয়েছে, সে সময় বিশাল এ নদীতে সুপারির হাট বসত। নদীপথেই মাইলের পর মাইল ভরে যেত হাজার হাজার নৌকায় আর নদীপথ দিয়ে বড় বড় স্টিমার ভেঁপু বাজিয়ে চলে যেত দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে।
প্রকৃতির নৈস্বর্গে ভরা নদীটির প্রেমে পড়েন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ। ঝালকাঠিতে জনশ্রুতি রয়েছে, জীবনানন্দ দাশের মা মহিলা কবি কুসুম কুমারী দাশ জšে§ছিলেন ঝালকাঠি জেলার ধানসিঁড়ি নদীর নিকটবর্তী বর্তমান ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের চরবাটরাকান্দা গ্রামে। তখনকার একমাত্র নদীপথ ধানসিঁড়ি হয়েই বারবার কবি ঝালকাঠি আসেন তার মামাবাড়িতে আর সে সুবাদেই ধানসিঁড়ি নদীটির রূপ ছুঁয়ে যায় তার কবিতায়। এক কালের জাহাজ চলা নদীতে আজ যেন নৌকা চলতেও বাধা পায়। নাব্য হারিয়ে নদীটি আজ সর্বোচ্চ গভীরতা পাঁচ ফুট আর চওড়ায় সাত ফুটের বেশি নয়। তাই ধান সিদ্ধের বাঁকের কাহিনী আজ আষাঢ়ে গল্পের মতো। এভাবেই আরো কিছুদিন কাটলে হয়তো নদীটির অস্তিত্ব কেবল বইয়ের পাতায়ই থাকবে।
নদীর উৎসমুখের পানি শুকিয়ে গেছে। উৎসমুখ থেকে সুগন্ধা নদীর পানির মূল স্রোতধারা অনেক দূরে চলে গেছে। রাজাপুর উপজেলার পিংড়ি থেকে ধানসিঁড়ি গ্রামে নদীতে মিলিত স্থান পর্যন্ত পিংড়ি সেতুর দুই পাশে প্রায় এক কিলোমিটার ছোট-বড় অসংখ্য চর জেগেছে।
নদীর পানিই ছিল সেচের মূল উৎস। কিন্তু এখন নদী থেকে পানি না পাওয়ায় সবজির চাষ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অনেকে সবজির চাষ ছেড়ে দিয়েছেন আর নদীকে ঘিরে জীবিকা অর্জনকারী শ’খানেক মাঝির এখন বড়ই দুর্দিন যাচ্ছে। অনেকে এ পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক আসেন ধানসিঁড়ির তীরে। এমনকি কলকাতা থেকেও কবি কিংবা সাধারণ পর্যটক পর্যন্ত এখানে আসেন। নদীর দুই ধারে গড়ে ওঠা বেড়িবাঁধে সারি সারি গাছের ছায়ায় দীর্ঘ মেঠোপথ ধরে চলার মতো পরিবেশ পর্যটকদের কিছুটা হলেও মন কাড়ে। নদী দেখে হয়তো হতাশ হন তারা। তাই কবির স্মৃতি রক্ষায় নদীটির খনন করে পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা উচিত আর পর্যটকদের জন্য তৈরি করা যায় জীবনানন্দ স্মৃতি জাদুঘর ও রেস্টহাউস আর ধানসিঁড়ির সঙ্গে বেঁচে যাবে অসংখ্য জেলে-কৃষকের জীবিকা ও জীবন। হ্যাপি জার্নি ডেস্ক