কুড়িগ্রামের ওম

-মুখ হা করো দেখি।

-হা

-আরো বেশি হা।

-হাআ..

-জিভে কি হলো তোমার, দাঁত দিয়ে কেটেছো নাকি ?

-নাহ। হঠাৎ কামড় লেগে কেটে গেলো কাল। আপেল খেতে গিয়ে।

– কি করে হয় তোমার এসব হাসান ? গতবার এসে দেখলাম গাল কেটে ফেলেছো ! কি সব হচ্ছে ?

-কই কিছু নাতো !

-আমি আর আসবো না বুঝলে তোমাকে দেখতে !

– না না , আমি কিছু করি নি।

-তুমি আমার কথা শোনো কই ? কুড়িগ্রামে থাকতে চাইলে কথা শুনতে হবে আমার।

ডাক্তার বেড়িয়ে গেলেন। কেউ একজন ঘরটা বন্ধ করে দিয়ে গেলো , বাইরে থেকেই।  কাশির শব্দ হলো। ঘরে একা বসে আছে হাসান। খাটের মশারিটা তোলা হয় নি আজ। মশা তেমন নেই। তবুও সে অভ্যাসের বশে মশারি টাঙ্গায় প্রতিদিন। রশিগুলো ঝুলে আছে।  কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছে হাসান নিজেই।  মশারিটা ময়লা দেখাচ্ছে।

কানাই ঘরে আসে নি এখনো। বাড়ির আশে পাশেই আছে,  নাস্তা নিয়ে আসবে হয়ত। হাসানের খিদে নেই। তবে সিগারেটের তৃষ্ণা আছে। ফুরিয়েছে দুদিন হলো। ঠোঁট শুকিয়ে আসে মাঝে মাঝে।

কানাই এলো। হাসি হাসি মুখ। কথা বলে না ছেলেটা। হাসান প্রশ্ন করে তবুও। ঘর ঝাড়ু দেয় কানাই।

-সিগারেট দিবি না এনে ?  শোন , মশারিটা নিয়ে যা , এত্তো ময়লা হলো , তুই কী শুনিস না কিছুই ?

-হুম

– খাবার আনবি না ঘরে , আমি ফেলে দেবো বুঝলি ! একটাও না। শুধু বিড়ি আনবি। আর মোজা। একটা মোজা খুঁজে পাচ্ছি না , কত করে বল্লাম তোকে।

-হুম

– যা হারামজাদা , তুই যা।

কানাই কোনো কথা বলে না। ঘর ঝাড়ু দিয়ে বাথরুমের দিকে যায়। ভেজা তোয়ালে বালতিতে নিয়ে ঘরে ঢুতেই পানি পরে মেঝেতে। টুপ টুপ।

-পানি ফেল্লি ক্যান ? মুছে দিয়ে যা !

-দেই।

কানাই নিচু হয়ে ঘর মোছে। টেবিলে খাবার ঢেকে দিয়ে যায়।

জানালা খোলা ছিল। রাতে শিশির প’রে শিকগুলো আরো ঠান্ডা বরফ হয়ে আছে।  হাসান হাত রাখে। উফ ! একি ঠান্ডা !  সোয়েটার , তার উপর শাল পেচিয়ে বসে থেকেও খুব শীত লাগছে । জানালা বন্ধ করে দেয় হাসান।

কানাই দরজা খোলে , হাতে সিগারেটের প্যাকেট। হাসান ছো মেরে প্যাকেটটা হাত থেকে নেয়। কানাই দাড়িয়ে থাকে। সে জানে হাসান লাইটার খুঁজে পাবে না এখন।

– কানাই দেখতো কই রাখলাম ?

-কি ?

– কি আবার আমার লাইটার !

কানাই আলনার পেছনে, টেবিলের নিচে, বালিশের পাশে হাতড়ে দেখে। কোথাও নেই। পকেটে লাইটার টা লুকিয়ে রাখে।  খুঁজে না পেলে হাসানের হাতে দেবে সে।

সেন্ডেলের পাশে এমন ভাবে লুকিয়ে ছিলো সবুজ লাইটার টা !  টবে ফুল ফোটার মতই লাগছিলো দেখতে ! কানাই হাতে নিয়ে হেসে ফেলে

-এই নেন। বিড়ি কিন্তু একদিনে শেষ কইরেন না। আমি আর আনতে পারুম না। স্যার মানা করসে।

– যা বুঝছি। আর মোজা কই আমার ?

কানাই উত্তর দেয় না। এর রহস্যটা আজো বুঝতে পারে না। একজোড়া মোজার জন্য শেষ পর্যন্ত ডাক্তারকেও বলেছে হাসান। কিন্তু কেউ দিচ্ছে না এনে ! মাস খানেক হয়ে গেলো !

কানাই আজকেও মাথা নিচু করে চলে গেলো ! কিন্তু কেন !

ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম আসার পর এই কানাই একমাত্র মানুষ যে তার ঘরে আসে। আর কেউ না। ছোট বড় কেউ না। তাদের কোন শব্দ পায় না ঘরের আসে পাশে। মাঝে মাঝে রুবেল আসে। কানাই এর বদলে। ঘর পরিষ্কার করে দিতে। তাও খুব কম। ঐ পিচ্ছিটা কে খুব পছন্দ হাসানের।  গান গায় খুব সুন্দর। সিনেমার গানই ওর পছন্দ ! হাসানের ভালো লাগে । ডাক্তার সাহেব পুরোনো মানুষ। ছোটবেলা থেকে চেনে হাসান। ঢাকা থেকে আসেন ৩/৪ মাস পর পর। কথা বলতে ভালো লাগে না। আবার খুব যে খারাপ লাগে তাও না।

জানালা খোলাই ছিলো। হাসান এক নজরে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। দুরে একটা মাঠ। কিছু মানুষ , দু চারটা গাছ আর ভেড়া।  ভেড়ার পালের হেঁটে যাওয়া কুয়াশায় ছবির মত লাগে। ক্যানভাসে আঁকা। বেলা বাড়ে। বদলে যায় ক্যানভাসের রঙ। মনে মনে হাসান ভাবে আজ সূর্য না উঠুক।  শীত শীত লাগে। আরো আরো শীত। আঙ্গুল আঙ্গুলে জড়িয়ে গেলে সিগারেট ধরায় হাসান। অবশ হাতে সিগারেট ধরে রাখতে কষ্ট হয় কয়েক সেকেন্ড। বুকে , পীঠে , গলায় কোন শীত নেই। শুধু হাতের আঙ্গুলে। আর তারপর পায়ে। হ্যাঁ দুপায়ের পাতায় , আঙ্গুলে। সিগারেট নিয়ে পায়ের আঙ্গুলের কাছে ধরে রাখে হাসান। আহা , শীত পোহাতে হবে এভাবেই। ছাই প’রে বিছানায়। একটা ছাইদানি ছিলো কোথাও , এখন আর চোখের সামনে নেই। ছাইগুলো পায়ের কাছেই এসে পরে। সিগারেট চারটা শেষ। না আর না ! কানাই আর দেবে না এনে !

কম্বল টা গায়ে জড়িয়ে বসে থাকে হাসান। কতদিন হলো বাইরে পা রাখে নি হাসান ?  মনে নেই। ঢাকাতেও ঘরেই থাকতো সে। দোতলার ঘরে। দরজায় তালা খোলা থাকলেও বেরুতে ইচ্ছা হতো না। কুড়িগ্রামেও না। ঘরেই থাকে সে। নিজের মত করে। লুডুর গুটি বদলায়। কখনো তাসের পাতা। একা একা। কিংবা বাথরুমে অনেকটা সময় পানির শব্দ শোনে। মেঝেতে ব’সে। কলটা নষ্ট হয়েছে অনেকদিন। টুপ টুপ শব্দে হাসান জেগে থাকে রাত। রাতের পর রাত। তাসের রাজা রানী, লুডুর সাপ সবাই একে একে  ঘুমিয়ে পড়ে ।  জেগে থাকে সে একাই।

আজ হঠাত  বৃষ্টি হলো। শীতের মাঝেই।হাসান বাথরুমে। মেঝেতে। পানি পড়ার শব্দ শুনছে। এ আবার কিসের শব্দ ? ওহ ! বৃষ্টি এ অসময় ! সকাল হয়নি তখনো। কুড়িগ্রামে বৃষ্টি পড়ে ! হাসানের বাইরে যেতে মন চায়। দরজা খোলে না। তালা দেয়া। হাসান জানে তবুও দুবার শব্দ করে ভেতর থেকে। কেউ যদি দরজাটা খুলে দেয়।  শোনে না কেউ। কানাই , রুবেল , অন্য কেউ , কেউ আসে না।

লেখক: কবি ও গল্পকার, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় সরকারি প্রসাশনে কর্মরত।

বৃষ্টি থেমে যায়। বিছানায় সাপলুডু ছড়িয়ে আছে। হাসান খেলছে। খেলছে। খেলা থেমে যাচ্ছে। আঙ্গুলে ঠান্ডায় জমে যায় হাত। হাতের সবকটা আঙ্গুলে। দশ আঙ্গুল। আর পায়ে। পায়ের সবকটা আঙ্গুলে। মোজাটা খুঁজছে হাসান। হন্নে হয়ে !

কোথায় যে প’রে আছে ! এইতো কম্বলের পাশেই লুকিয়ে ছিলো। ডান পায়ে মোজা প’রে  হাসান। বা পা খালি। একজোড়ার এরেকটি হারিয়েছে সেই কবে। তারপর থেকে তার একটাই মোজা।  কতবার চেয়েছে একজোড়া মোজা। কেউ এনে দেয় নি ! রুবেল, কানাই এমনকি ডাক্তার সাহেবও না ! কুড়িগ্রামে এতো শীত ! কেউ কী এনে দেবে না একজোড়া, কেউ কি আছে ! ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরে হাসান।

মোরগ ডেকে ওঠে। ঘড়িটাও টিক টিক। কত সময় হলো এখন ? জানালা খুলে বসে। বিছানার চারিপাশে ছড়ানো তাস, রাজা রানী।

হাসান বালিশ পিঠে দিয়ে বসে। সিগারেটের প্যাকেট শেষ। রুবেলের গান শুনতে মন চায়। সিনেমার গান। সারেং বউ ছবির গান ! কি অদ্ভুত গায় সে ! হাসান গুন গুন করে। রুবেল ছেলেটা আসে না অনেকদিন। কানাই আসে। ঘর মোছে, নাস্তা দেয়, দুপুরের খাবার, রাতে মাঝে মাঝে পাউরুটি জেলি। ওর বোবা মুখে হাসি ভালো লাগে না হাসানের।

নিজের পা দুটোর দিকে তাকায় হাসান। রাতে মোজা বদল করে সে। ডান। বা। ডান। বা। বা। ডান। কাল সারারাত।  বরফ পায়ে উলের জড়িয়ে  থাকার কথা ভাবে। আহা ! কোথাও একটু উল যদি পাওয়া যেতো  ! একটা মোজা সে নিজেই বানিয়ে নিতো !

জানালার দিকে তাকিয়ে আছে হাসান। গাছের রেখাগুলো সরু হয়ে আসে। গাছগুলো আর নেই যে আগের মত। শুধু রেখা আছে। বাদামি ভেড়ার পাল হাটছে। কখনো ধুসর। কিংবা শাদা।  নোঙরা শাদা। আজ ওদের সঙ্গে কোন মানুষ নেই। ওরা একা ঘুরছে। হাঁটছে। কেউ দাড়িয়ে।  দু’ তিন, চার, পাঁচ, সাত, সাতাশ আরো আরো। হাসান ওদের ডাকছে কাছে। জানালায় সিক ধ’রে।  জালির ফাঁকে হাত নেড়ে। মাঝখানে অল্প ছেঁড়া জালি। হু হু করে বাতাস আসে। ঠান্ডা!  হিমশীতল ! তাও জানালা খোলা রাখে হাসান। ভেতর থেকে কপাট বন্ধ করে না সে। ছেঁড়া জালিতে হাত নেড়ে ডাকছে । ভেড়াদের কাছে ডাকছে হাসান । একজোড়া মোজা বোনার স্বপ্নে ভাসে কেউ ! উলের রোলে লুটোপুটি খাওয়া ভোরের স্বপ্ন ! কুশায়ার মাঝে থেকে বেড়িয়ে এসে কেউ কি দেবে শরীরছেঁড়া সুতো। ওম ! কোনো এক ভেড়া , ওদের কেউ ?

উল চাই উল!  উল দাও। ভেড়ার পাল !  একজোড়া মোজা বুনতে যেটুকু ওম , যেটুকু উত্তাপ , তার চেয়ে বেশি কিছু চায় না হাসান।