কী লিখতেন রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্?

Image result for মানবকণ্ঠ কলামঢাকা: ১৯৭১ সালের পাক হানাদার বাহিনীর বাঙালিদের নিয়ে নৃশংস মৃত্যুখেলা ও নারীদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলার স্মৃতি। ১৯৯০ সালে আবারো হানাদার বাহিনীর একই কর্মযজ্ঞ থাকলেও, সেবার তা ছিল দেশীয় বাহিনীর। কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ এই চিত্রপটে লিখেছিলেন- ‘আজো বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’।

অন্যদিকে ২০১০ সালের ৩ জুনের অগ্নিকাণ্ডে পুরান ঢাকার নিমতলীতে পুড়েছিল বাঙালি প্রাণ। ২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আবারো আগুনে পুড়ে প্রাণ দিতে বাধ্য হলো বাঙালি। যেদিন ১৯৫২ সালের এই দিনে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলো বাঙালিরা। এমন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও চকবাজারের নন্দ কুমার দত্ত রোডের পোড়া লাশের গন্ধ, যে পোড়া লাশের গন্ধ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় কী লাইন লিখতেন সর্বদা সত্যের পথে লড়াই করা কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্?

আজো বাতাসে লাশের গন্ধ পাই কবিতার প্রেক্ষাপটে হয়তো দোষ দেয়ার জন্য সামরিক বাহিনী ছিল। কিন্তু আজ দোষ দেয়ার জন্য কাকে পাওয়া যাবে? তাহলে সান্ত¡না পাবেন কোথায় স্বজন হারানো বাঙালিরা? স্বজনরা যদি বলে দেশের এই ঘুষখোর কর্তৃপক্ষের কারণে আমাদের আত্মীয়দের মৃত্যু হয়েছে, তাহলে ক্ষতিটাও তাদেরই হবে। অতএব মুখ খুলবেন না কেউ। পোড়া লাশ দাফন করে বা কেউ কেউ দাফনের জন্য লাশ না পেয়ে বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে চরম জেদে বেঁচে থাকবেন। তাহলে এবার কী লিখতেন চির তারুণ্যের কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্?

ঢামেকের মর্গের সামনে ও সারারাত নন্দ কুমার দত্ত রোডের ওই ভবনগুলোর সামনে বৃহস্পতিবার (২১ ফেব্রæয়ারি) সাহায্যপরায়ণ ছিল একেবারে সবাই। কিন্তু সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর এই সাহায্যপরায়ণতার কি কোনো সার্থকতা থাকে? চোখে আঙুল দিয়ে নিমতলীর ঘটনার পর কি পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক পদার্থের গোডাউন সরানো যেত না? ঘুষ খেলে কি এভাবেই মানুষ অন্ধ হয়ে যায়? আর কত পোড়া লাশ দেখতে চায় তারা? দুর্ঘটনা ঘটার পর লোক দেখানো কাজ আর কত করবে তারা? অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তো বিশ্বের উন্নত দেশ বা অনুন্নত দেশেও ঘটে। এমন তো হয় না। অসাধু ব্যবসায়ীরাও তো অন্যান্য দেশে কম নেই। তবে সে দেশের সরকার কি এতটা প্রশ্রয় দেয়? এ রকম হাজারো প্রশ্ন নিহতদের স্বজনদের।

এই সব উত্তর দিতে গিয়ে চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিদর্শনে এসে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেছেন, ‘পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসা বংশপরম্পরা। এটা তো বন্ধ করা যাবে না। এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। আমি পুরান ঢাকার মানুষ। আমি জানি’।

নিমতলীর ঘটনার প্রায় ১০ বছর পরও কেমিক্যাল গোডাউন সরানো গেল না কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আপনারা কি ভিনগ্রহ থেকে এসেছেন নাকি? আমরা কি ঢাকা শহর গুঁড়িয়ে দেব?

আবার এই শিল্পমন্ত্রী বলেছেন, গতরাতে সেখানে (চকবাজার) যা ঘটেছে তার সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটেছিল।
আবার বিস্ফোরক অধিদফতর বলছে, রাজ্জাক ভবনে রাসায়নিক পদার্থের অবৈধ মজুত ছিল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনোভাবেই আর এখানে কেমিক্যাল গোডাউন রাখতে দেব না।

একই কথা বলার পাশাপাশি অন্তত সকারের দায় স্বীকার করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

প্রশ্ন হলো, আগুন না হয় সিলিন্ডারের বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটেছে। এরপর যে নকল পারফিউম ও বডি স্প্রের বোতল বোমের মতো ব্লাস্ট হয়ে ছিটে পড়েছে, সেগুলো কি কেমিক্যাল নয়? এছাড়া পুরান ঢাকার বাসিন্দা হয়েও তথা সব গোমর জেনেও কেন পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসা বন্ধ বা সমূলে উৎপাটন করা যাবে না? আবার বিভিন্ন সান্ত¡নামূলক কর্মকাণ্ডের ঘোষণার রেওয়াজ কবে শেষ হবে? এমন নয় আরো কঠোর ঘোষণা কি নিমতলীর ১২৪ জন প্রাণ পুড়িয়ে কেড়ে নেয়ার পর আসেনি? ফলাফল কি হয়েছে?

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়কারী সামন্ত লাল সেন বলেন, লাশগুলো এমনভাবে পুড়ে গেছে যে কঙ্কালের মতো হয়েছে। সে ক্ষেত্রে লাশগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হবে। পুড়ে যাওয়া লাশের চেহারাও চেনা যায় না। কেমিক্যালের মতো দাহ্য পদার্থে পুড়ে গেলে বিষয়টি আরো কঠিন হয়ে যায়।

এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে ৬৭টি ব্যাগে করে লাশ এসেছে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত। আরো তিনটি ব্যাগে লাশের খণ্ডিত অংশ আনা হয়। নিহত ৭০ জনের লাশ এখন রয়েছে ঢামেক মর্গে। আবার মর্গের বাইরে যে পরিমাণ লাশ শনাক্ত না করতে পারা স্বজনদের পাওয়া যাচ্ছে সে অনুসারে লাশের সংখ্যা আরো বেশি। আবার রেড ক্রিসেন্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ৬৭টি লাশের তথ্যের বাইরে আরো ৬৫ জন নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য নিশ্চিত হতে পেরেছেন তারা।

যদিও পুলিশের আইজি জাবেদ পাটোয়ারী বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ভগ্নস্তূপে সন্ধান শেষ হলেই নিশ্চিত করে বলা যাবে মৃতের সঠিক সংখ্যা। কারণ লাশ অনেক পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সন্ধানের কাজ শেষ হতে তাই হয়তো সময় লাগবে।

এরপর কি লিখতেন কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্? তার প্রতিবাদী কলম কি এরপর ভেঙে যেত? যেমনটা ভেঙে যাচ্ছে কলমসৈনিক নামে খ্যাত সাংবাদিকদের।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত কারেন্টের ট্রান্সফর্মার থেকে। ট্রান্সফর্মারটি বিস্ফোরিত হয়ে নিচে থাকা গাড়ির ওপর পড়লে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। পাশে থাকা হোটেলের রান্নার কাজে ব্যবহƒত সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে পাশে থাকা রাসায়নিক পদার্থের গোডাউন এবং প্লাস্টিক পদার্থের গোডাউনের সাহায্যে আগুন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। যে কারণে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথিকেরাও রেহাই পাননি। মুহূর্তের মধ্যে লাশে পরিণত হয়েছেন তারা। ট্রান্সফর্মারের বিস্ফোরণ হওয়ার ঘটনা তো এদেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সেটা দেশের বিদ্যুৎ খাত যত উন্নত হোক না কেন। বিদ্যুৎ ফেরি করে বিক্রি করতে চাওয়া সরকার যন্ত্রপাতি ও টেন্ডারের দুর্নীতির মাধ্যমে কেনা কম দামি ট্রান্সফর্মারের দোষ ঢাকতে এখন বলছে আগুনের ভিন্ন সূত্রপাতের কথা।

আবার স্থানীয় ব্যক্তিদের কেউ কেউ এমন দাবি করলেও চুড়িহাট্টা মোড়ে কোনো ট্রান্সফরমার নেই বলে জানান ডিপিডিসির কর্মীরা। পিকাপ ভ্যানের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা আরো অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা জানালেও আগুনের তীব্রতা বেড়েছে আশপাশের ভবনে থাকা সুগন্ধি কারখানা এবং প্লাস্টিক ও রঙের দোকানে থাকা রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য। আগুনের সূত্রপাত যেভাবেই এই রাসায়নিক দ্রব্যগুলো না থাকলে তো আগুন এত বড় হতো না। সর্বশেষ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডেও আগুন বড় হবার কারণ ছিল এই রাসায়নিক দ্রব্য বা স্টোরের ওষুধ। যাই হোক, এই রাসায়নিক দ্রব্যের বিষয়টা ঢাকতে কেন চান সরকারের মন্ত্রী? যেটাই হোক এ তো মৃত্যুর প্রধান কারণ এই রাসায়নিক দ্রব্যাদি সে বিষয়ে ওই মন্ত্রী ছাড়া আর কারো সন্দেহ নেই বলেই মনে হয়।

আবার এ বিষয়ে অজ্ঞাত আসামি দাঁড় করিয়ে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। কেন এই মামলা? কি হবে মামলার তদন্তে? আসল দোষীরা তো অর্থনীতির সংজ্ঞা অনুসারেই বেড়ে ধনীতর হতেই থাকবে। অর্থনীতিতে যেমনটা বলা হয়, প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে ধনী কৃষকরা দিন দিন ধনী হচ্ছে আর গরিব কৃষকরা গরিবই থেকে যাচ্ছে। চিহ্নিত ও প্রমাণিত আসামি থাকার পরও অসংখ্য মামলা যেখানে বিচার হচ্ছে না, এমনকি হচ্ছে না সুষ্ঠু তদন্ত, সেখানে এ রকম মামলায় কি বিচার পাওয়া যাবে তা নিয়ে সন্দিহান দেশবাসী।

দেশের রাজনীতিবিদসহ কবি, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ জনগণের এমনকি শিল্প সাহিত্য জগতের শিল্পীদের সত্য বলার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া স্বাধীনতা কি চেয়েছিলেন ’৭১-র মুক্তিকামী বীর যোদ্ধারা? এটাকে স্বাধীনতাও বলে না আবার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাও বলা যায় না। এই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পরাধীনতা হয়তো দূর হবে দেশের সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভ‚ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের পর। সেটাকেই ঘনিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। সেটা যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, প্রত্যেকেই আগের দলের চেয়ে এক ডিগ্রি বেশি করার প্রবণতায় থাকে। যে কারণে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ বলেছিলেন, দেশের সব স্তরের মানুষের ঘৃণাই একটি সরকার নামাতে যথেষ্ট। ছাত্র সমাজ অনেক আগেই সেই ক্ষোভের প্রমাণ রেখেছে রাজপথে দাঁড়িয়ে। এবার তাদের অভিভাবকদের পালা। হয়তো তারপরই আবারো শূন্য থেকে শুরু করবে প্রিয় বাংলাদেশ। – লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম