কী বলবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন, ইচ্ছে হলো আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটু ঘুরে আসি। কলাভবনের সামনে, কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলি। ইচ্ছে মতন ছুট দিল গাড়ি। জাদুঘরের সামনে যেতেই চোখে পড়ল কতগুলো মোটরসাইকেল ভটভট করতে করতে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে একখানে জড়ো হলো। আমার গাড়ির চালক অভাস দিল সম্ভবত কিছু ঘটতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর যাওয়া ঠিক হবে না। মোটরসাইকেলে বসা তরুণেরা বেশ অস্থির। পাশে দাঁড়িয়ে পুলিশ। বাইকগুলো ছুটছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে। চালক ঝুঁকি না নিয়ে গাড়ি ইউটার্ন নিল।

বিকেলের মধ্যে সংবাদ দেখলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। এই নির্যাতন উন্মাদনায় অংশ নিয়েছে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি। আন্দোলনকারীদের দাবি, আক্রমণকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এটা পরিষ্কার, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি দ্বারা নিগ্রহ, লাঞ্ছিত, নির্যাতিত হয়েছেন। কিছুদিন পূর্বে এই কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। যে ঘটনার সূত্রে দেশব্যাপী কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। অবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে অর্থাৎ কোটা পদ্ধতি বাতিল করার আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত হয়। ভেবেছিলাম যৌক্তিক সমাধান হবে।

যারা বুদ্ধিওয়ালা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, আশা ছিল তারা সুচিন্তিত মতামত দিয়ে উত্থাপিত কোটা সমস্যার সমাধান দিতে সরকারকে সহায়তা করবেন। এই ফাঁকে একটি কথা বলে নেয়া ভালো যে, পত্রিকার পাতা কিংবা টিভি নিউজে যারা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন, তাদের বাইরে ইতোমধ্যে পড়াশোনা শেষ করেছেন এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, এমন কিছু ব্যক্তির কাছে কোটা সংস্কার নিয়ে মতামত জানতে চেয়েছিলাম। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের একজন নাগরিক তার মেধা, যোগ্যতা বলে সুযোগ, সুবিধা ভোগ করবে, নিয়ম তো এটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের কথা ভিন্ন।

যেহেতু তারা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী, তাদেরকে বিশেষ সুবিধা দিতেই হয়। আমি অভিভূত, আশ্বস্ত হয়েছিলাম তাদের বিবেচনাবোধ দেখে। সত্যিই তো, যদি একজন ব্যক্তি জন্মসূত্রে এদেশের নাগরিকত্বই লাভ করেন, রাষ্ট্র তাকে নাগরিকের পরিচয় দিয়েই থাকেন, তাহলে কেন তিনি তার যোগ্যতার ভিত্তিতে মর্যাদায় আসীন হবেন না, সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন না? দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে মানবাধিকার, জয়-পরাজয়, সফলতা কিংবা ব্যর্থতা ইত্যাদি সব বিষয়কেই দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখা হয়, ওজনে মাপা হয়। জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার, মাপার সুযোগ নেই। একটি স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক বিভাজন টেনে জাতিসত্তাকে বিপর্যস্ত করছেন। কোটা সংস্কার নিয়ে পুনরায় আন্দোলন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুনরায় হামলা, তারই ধারাবাহিকতা।

মূল কথায় আসি। যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রতিউত্তরে কোটা পদ্ধতি উঠিয়ে নেয়ার কথা বলেছেন আন্দোলনের তৃতীয় দিনে, সেহেতু তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ভবিষ্যতে আশ্বস্ত হতে চাইছি। আমি বিশ্বাস করি, কমিটি গঠন, পর্যালোচনা কমিটি গঠন, যেটাই হোক তার কাছ থেকে একটি সুন্দর সমাধান পাব, যাতে সব শিক্ষার্থী, সব নাগরিক তাকেই পরম অভিভাবক হিসেবে খুঁজে পান, ভরসা করেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সব ঘটনা ঘটছে, যেভাবে দাবি আদায়ে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, নির্যাতন চালানো হচ্ছে, বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের ওপর অশালীন আক্রমণ হচ্ছে, হয় এই সমস্ত ন্যক্কারজনক, ঘৃণিত ঘটনার দায়ভার আসলে কার ওপর বর্তায়, জানার সময় এসেছে।

কেন আমরা একজন শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা দিতে পারছি না, কেন এই বর্বরতাকে মেনে নিচ্ছি নীরবে ? একটা দাবী আদায়ের আয়োজন কী গোটা রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল? ছাত্র আন্দোলন তো পঞ্চাশ দশক থেকেই চলে আসছে। পূর্বে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর আঘাতের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ছাত্রলীগ এইভাবে, শিক্ষাঙ্গন ও ভাইস-চ্যান্সেলরের নিরাপত্তা, মানসম্মান রক্ষার জন্য তারা এগিয়ে এসেছিলেন। বুঝে নিতে হয়েছিল সেইদিন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্ভবত ব্যর্থতার ভারে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে।

আর তাই ছাত্রলীগের দরকার পড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। ছাত্রলীগের ভাষ্যানুযায়ী, শিক্ষকদের ওপর হামলা তারা সহ্য করতে পারেননি, তাই এমন প্রতিবাদী ঘটনার সূত্রপাত। কিন্তু ২ জুলাই কী ঘটেছিল যে, আন্দোলনকারীদের ওপর ফের বর্বরোচিত হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হলো? নারী শিক্ষার্থীকে অশালীনভাবে লাঞ্ছিত করা হলো? এখানে তো ভাইস-চ্যালেন্সর বা শিক্ষকদের রক্ষা বা উদ্ধার করার কোনো প্রশ্ন ছিল না, তাহলে? কাকে, কার স্বার্থ রক্ষার জন্য এই হামলা, এই প্রশ্নের জবাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেয়া উচিত। কারণ, ঐ সীমানা তাদের নিয়ন্ত্রণে।

আবার নারী শিক্ষার্থীদের যেভাবে, যে কায়দায় লাঞ্ছিত করা হয়েছে, তাতে পাকিবর্বরদের সঙ্গে তফাত কী থাকছে? একটা স্বাধীন দেশে শকুনের মতন ঝাঁপিয়ে পড়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতন স্থানে, কিছুতেই মানা যায় না। মনে হলো, পাকি পাশবিকতার বীজ এখনো কারো কারো ভেতর রয়ে গেছে। কখনো কখনো এর সীমা ছাড়িয়ে যায়, প্রকাশ পায়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার হবে কী হবে না এই ফয়সালার দায় তো সরকারের, ছাত্রনামধারী উচ্ছৃঙ্খলদেরকে দিল। এতটা বেপরোয়া কেন তারা! আর ছাত্রদের ওপর আঘাত তো একটি দেশের শেকড় উৎপাটনের শামিল। একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেয়া। যে কোনো পরিবর্তনে ছাত্ররাই হলো মূল হাতিয়ার। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, এসব তো তারই ইতিহাস। আমরা ভুলে যাই কী করে!

কেউ কেউ বলছেন, সরকারি চাকরিতে যারা কোটা সংস্কার চাইছেন, তারা রাজাকার। এই আন্দোলনের নেপথ্যে নাকি রাজাকারদের উস্কানি আছে। যদি তাই হয়, তাহলে যারা কোটা সংস্কারের দাবি করছেন, তাদের সবার বিস্তারিত তথ্য কী অভিযোগকারীদের কাছে আছে? এমন কথাবার্তায় জানতে ইচ্ছে হয়, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এমন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা আসলে কত। এই সংখ্যা বা তালিকা কী অরাজনৈতিকভাবে নির্ণীত হয়েছে, জোর দিয়ে দাবি করে বলার মতন কেউ আছেন কিনা জানি না। আজকাল পঞ্চাশ বছর বয়সীও মুক্তিযোদ্ধা পাওয়া যায়।

মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে নানান সুবিধা ভোগ করছেন কিন্তু তারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধা নন, এমন তো আছে, তাই না? কেন জানি আমার বিশ্বাস হয়, মুক্তিযোদ্ধার রক্ত শরীরে বহন করছেন, এমন কেউই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের বিরোধিতা করছেন না। কারণ, তারা তার পূর্বপুরুষদের নিঃস্বার্থ অবদানকে তুচ্ছ করে দেখেন না। দেখার সাহস রাখেন না। আর আন্দোলনের পেছনে রাজাকারদের উস্কানি আছে, যারা এমন অভিযোগ করছেন, তাদের কাছে কী প্রমাণাদি আছে? থাকলে তা দৃশ্যমান হওয়া জরুরি। পরিশেষে বলি, ছাত্র দিয়ে ছাত্র প্রহার, ছাত্র দিয়ে ছাত্রীকে লাঞ্ছনা, উন্নত চেতনার পরিচয় বহন করে না। যারা ছাত্রছাত্রীদের দেখভাল করার দায়িত্বে আছেন, শিক্ষিত করে তোলার প্রত্যয় নিয়ে শিক্ষকতা করছেন, তারা আগে নিজের ভেতর নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করুন। যেন ছাত্রছাত্রীরা ভালো মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার উৎসাহ পান। আর এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন হয়, সেটা জানানোর দাবি জানাই। লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

মানবকণ্ঠ/এএএম