কাশ্মীর: স্বর্গ থেকে বিদায়

পঞ্চদশ শতাব্দীর কাশ্মীরের সুলতান গিয়াসউদ্দিন জয়নুল আবেদিন ছিলেন এক অসাধারণ ক্ষণজন্মা পুরুষ। আক্ষরিক অর্থেই এমন প্রজাহিতৈষী, উদার মনের শাসক পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম জন্মগ্রহণ করেছেন। এ সুলতানের বাবা সুলতান সিকান্দার ছিলেন একজন অত্যাচারী গোঁড়া মুসলিম শাসক। ইতিহাসে তাকে ডাকা হয় সিকান্দার দি আইকোনোক্লাস্ট বা ‘মূর্তি ধ্বংসকারী সিকান্দার’। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রজাদের জোর করে ধর্মান্তরিত করতেন। বহু মন্দির ধ্বংস এবং বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

যারা ধর্মান্তরিত হতে রাজি হতো না, তাদের ওপর তিনি উচ্চহারে জিজিয়া কর ধার্য করেছিলেন। তার গোঁড়ামিপূর্ণ অত্যাচারে দলে দলে হিন্দু কাশ্মীর ছেড়ে পালিয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। তারই সন্তান শাহি খান শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন বড় ভাই আলী শাহ সিংহাসন ত্যাগ করে মক্কায় চলে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দিলে। যাওয়ার সময় ছোট ভাইকে তিনি জয়নুল আবেদিন খেতাবে ভূষিত করেন।

জয়নুল আবেদিন সিংহাসনে বসেই প্রথম আদেশ দেন, যেসব হিন্দুকে তার বাবার সময় জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, তারা এখন ইচ্ছা করলে নিজ ধর্মে ফিরে যেতে পারে। সেই সঙ্গে তিনি জিজিয়া কর সম্পূর্ণরূপে তুলে দেন। এরপর তিনি আদেশ দেন, যেসব মন্দির তার বাবা ধ্বংস করেছেন, সেগুলো রাজকোষের খরচে পুনর্নির্মাণ করে দিতে। তিনি শাসন ক্ষমতায় এসে এসব সিদ্ধান্ত নেয়ায় দলে দলে হিন্দু আবার কাশ্মীরে ফিরে আসতে শুরু করে।

আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তিনি তার রাজ্যে গোহত্যা নিষিদ্ধ করেন এবং গরুর মাংস ভক্ষণকে বিষ বলে আখ্যায়িত করেন। (তার এসব কর্মের কথা শুনে তার বড় ভাই আর মক্কায় না গিয়ে বর্তমান পাকিস্তানের শিয়ালকোট থেকে ফিরে আসেন এবং জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু জয়নুল পাঞ্জাবের এক বীর সেনার সহায়তা নিয়ে তাকে পরাজিত করেন)। জয়নুল তার শাসনকালে সংস্কৃত ভাষাকে ব্যাপক চর্চার মধ্যে নিয়ে আসেন। মহাভারত এবং রাজাতরঙ্গিনী মহাকাব্য ফারসি ভাষায় অনুবাদ করান।

নিজে তিব্বতি, ফারসি, সংস্কৃতি এবং তুর্কি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। জয়নুল আবেদিন তার রাজ্যের ব্রাহ্মণদের বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। এ অসাধারণ মানবতাবাদী শাসক তার রাজ্য থেকে সতীদাহ প্রথা তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু ব্রাহ্মণদের অনুরোধে তা করতে পারেননি। এসব কারণে তিনি তার প্রজাদের মধ্যে এত জনপ্রিয় ছিলেন যে, যুদ্ধবিগ্রহের প্রশ্ন উঠলে বর্ণধর্ম নির্বিশেষে তারা তাদের শাসকের পক্ষে যুদ্ধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। যে কারণে তিনি জীবিত অবস্থায় লাদাখ এবং বাল্টিস্তানের মতো দুর্গম এলাকায় নিজের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

এ দূরদর্শী শাসক দলে দলে লোক পাঠিয়েছিলেন ইরান ও মধ্য এশিয়ায় কাঠের কাজ, কারপেট ও শাল তৈরির কাজ শিখতে। কাশ্মীরে সেসব দক্ষ কর্মী ভালো উপাদান থাকায় এমন শাল তৈরি করতে আরম্ভ করে যে, সেই থেকে কাশ্মীরের শাল উপমহাদেশ এবং মধ্য এশিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আজও কাশ্মীরের শালেরই সবচেয়ে চাহিদা। সে সময় থেকেই কাশ্মীরে কাঠের বাড়ির প্রচলন হয়েছিল। বিগত শতক পর্যন্ত কাশ্মীরে খোদাই করা নানারকম কাঠের দোতলা, তিনতলা বাড়ি দেখা যেত, যা কাশ্মীরে সৌন্দর্যকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আজও কাশ্মীরে অপূর্ব সুন্দর কাঠের বাড়ি দেখতে পাওয়া যায়।

এ জয়নুল আবেদিনের মৃত্যুর পর দলে দলে হিন্দুরা স্বেচ্ছায় তার প্রতি ভালোবাসা থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। তারপর থেকেই কাশ্মীরে মুসলমান ৮৫ শতাংশ এবং হিন্দু ১৫ শতাংশ ছিল গত শতাব্দী পর্যন্ত। শুধু শাল, কার্পেট বা কাঠের ঘরবাড়ি নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে কাশ্মীরকে বলা হয় ভূস্বর্গ। আগেও বলা হতো। কাশ্মীর যে পৃথিবীর অপরূপ ভূমি, তা অনুধাবন করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। আকবর শত ব্যস্ততার মধ্যেও জীবনে তিনবার কাশ্মীর ভ্রমণ করেছিলেন। প্রতিবারই তিনি কাশ্মীরের সৌন্দর্যে অভিভ‚ত হয়েছেন। ফিরে আসতে চাইতেন না। তার চেয়েও বেশি প্রেমে পড়েছিলেন তারই সন্তান এবং উত্তরাধিকারী সম্রাট জাহাঙ্গীর।

প্রথম দুবার বাবার সঙ্গে কাশ্মীর ভ্রমণ করেন। এরপর জাহাঙ্গীর আরও ছয়বার কাশ্মীর ভ্রমণ করেন। সেখানে অবস্থান করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। স্ত্রী নূরজাহানের কাছে প্রশাসনের দায়িত্ব দিয়ে তিনি কাশ্মীরে থেকে আফিম খেতে, বাগান করতে এবং এ রাজ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভালোবাসতেন। শেষবার তিনি কাশ্মীর থেকে লাহোরে ফিরে এসে মৃত্যুশয্যায় পতিত হন। তাকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনার কী ইচ্ছা করছে? তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, কাশ্মীর ফিরে যেতে চাই। ওটাই হলো পৃথিবীর স্বর্গভ‚মি! জাহাঙ্গীর তার আত্মজীবনীতে কাশ্মীরের কথা লিখেছেন, যদি পৃথিবীতে কোনো স্বর্গভূমি থাকে, তাহলে তা এখানেই! এখানেই! এখানেই!

জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহজাহান কাশ্মীরে তৈরি করেছিলেন রাজকীয় বাগান বাড়ি। শাহজাহানের সুশিক্ষিত, আধুনিকমনস্ক সন্তান দারাহ শিকোহ জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন কাশ্মীরে। তিনি কাশ্মীরের বর্তমান রাজধানী শ্রীনগরে গড়ে তুলেছিলেন রাজপ্রাসাদ, মসজিদ এবং সুফি কলেজ।

আইরিশ কবি থমাস মুর কখনো উপমহাদেশে আসেননি। কিন্তু মুর তার ‘লালা রুখ : অ্যান ওরিয়েন্টাল রোমান্স’ নামক দীর্ঘ কবিতার প্রধান চরিত্র লালা রুখের চোখ দিয়ে কাশ্মীর দেখতে চেষ্টা করেছেন। তার এ দীর্ঘ কবিতা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১৭ সালে। থমাস মুরের কাল্পনিক চরিত্র লালা রুখ আওরঙ্গজেবের কন্যা। তার বর্ণনায়, লালা রুখের রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবিরা তখন সব রূপকথার নায়িকাকেও পেছনে ফেলে দিতেন। এদিকে মধ্য এশিয়ার বুখারার রাজা আবদুল্লাহ তার ছেলের পক্ষে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে পরিভ্রমণে বের হন। তিনি মক্কায় যাবেন দিল্লি হয়ে। তখন ভারত সম্রাট আওরঙ্গজেব। আবদুল্লাহ সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজকীয় আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। অতিথির আগমন উপলক্ষে বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়।

আবদুল্লাহ খুবই মুগ্ধ হন এবং এক পর্যায়ে নিজ সন্তান অর্থাৎ বুখারার রাজপুত্রের সঙ্গে দিল্লির রাজকন্যা লালা রুখের বিয়ের প্রস্তাব করেন। উভয়পক্ষের স্বতঃস্ফ‚র্ত সম্মতির সে বিয়েতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন হয়। তখন সিদ্ধান্ত হলো এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে কাশ্মীরে। দিল্লি থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত বর্ণাঢ্য সাজে সাজল। রাজকুমারী লালা রুখ আগে কখনো কাশ্মীরে যাননি। ছোটবেলা থেকেই তিনি দিল্লির রাজপ্রাসাদে। বিয়ের সময় তাকে যখন কাশ্মীরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তিনি কাশ্মীরের প্রকৃতি দেখে ভীষণ মুগ্ধ হন। ছোট ছোট নদীর ছোট ছোট ঢেউ যেন মুক্তার ঝরনাধারা, এখানে-ওখানে হরিণ, ময়ূর নেচে বেড়াচ্ছে! নানা রঙের ফুল-ফল, ছোট ছোট পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতধারা, যা দেখেন তাতেই লালা অভিভূত হতে থাকেন!

অনুমেয়, কাশ্মীরের সৌন্দর্য সম্পর্কে ব্রিটিশ শাসকদের যে বর্ণনা ও প্রশংসা ছিল, তা থেকেই হয়তো থমাস মুর এ ভ‚স্বর্গের আন্দাজ করেছিলেন। উপনিবেশ শাসনামলে ব্রিটিশরা কাশ্মীরকে বলত ‘হ্যাপি ভেলি’ বা সুখের উপত্যকা। ১৯৪৬ সালে ৮ হাজার ব্রিটিশ পর্যটক কাশ্মীর ভ্রমণ করে। সময়টা বিবেচনা করতে হবে। তখনকার ৮ হাজার পর্যটক মানে নানা বিচারে এখন ৮০ লাখ! কিন্তু সেই কাশ্মীরে এখন কোনো পর্যটক নেই। অতি প্রয়োজন ছাড়া সেখানে কেউ যায় না, যেতে পারে না, এমনকি বেশিরভাগ এলাকায় বাইরের লোকদের ঢোকার অনুমতি দেয়া হয় না। কাশ্মীর ভাগ হয়ে গেছে ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে। এখন দ্বিখণ্ডিত দুই কাশ্মীরকে ডাকা হয় জম্মু কাশ্মীর এবং আজাদ কাশ্মীর নামে।

এ কাশ্মীর ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর থেকেই দুই দেশের বৈরিতায় এক নরকভ‚মিতে পরিণত হয়েছে। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা হলো কাশ্মীরের লাইন অব কনট্রোল তথা উপমহাদেশ।’ এ কাশ্মীর নিয়ে অন্তত তিনটি বড় যুদ্ধ হয়ে গেছে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে। এছাড়া খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দুই পক্ষই হারাচ্ছে সেনাসদস্য এবং বেসামরিক নিরীহ মানুষ। কাশ্মীরের মানুষের জন্য ভোর আসে আতঙ্কের বার্তা নিয়ে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে। আর বেসামরিক সেসব মানুষের নিহত হওয়ার ধরন কাশ্মীরের সীমান্ত ভেদ করে বিশ্বব্যাপী মানুষের বুকে গিয়ে ঠোকর দেয়। সেদিন দেখলাম ভারতীয় অংশে একটি সাধারণ বাড়িতে পাকিস্তানের গোলাবর্ষণে প্রাণ দিয়েছেন এক মমতাময়ী মা ও তার দুটি ছোট্ট শিশু, যারা জানে না এ যুদ্ধের কারণ কী, এ মূল্যবান জীবন কেন দিতে হলো।

কাশ্মীরের মানুষ ভারত এবং পাকিস্তানের দুই দেশেরই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির শিকার। একদিকে ভারতীয় সেনা, পাকিস্তানি সেনা ও অস্ত্রধারী জিহাদিরা, অন্যদিকে সাধারণ কাশ্মীরের জনগণ। তাই তারা ভাবতে পারে, এ আধুনিক যুগের চেয়ে হয়তো জয়নুল আবেদিনের শাসনই তাদের জন্য শ্রেয় ছিল। এর চেয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় তাদের জীবনের নিরাপত্তা ছিল অনেক বেশি। মারণাস্ত্র, জঙ্গি বিমান, আত্মঘাতী বোমার এ আধুনিকতা সব স্বর্গীয় সৌন্দর্যকে ধূলিতে মিশিয়ে দিচ্ছে। কবে কাশ্মীরের মানুষ তাদের স্বর্গভ‚মিতে শান্তিতে বাস করতে পারবে- তা এখন কেউ জানে না। লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.