কালো তালিকাভুক্ত করায় মিল মালিকদেরই লাভ বেশি

বোরো মৌসুমের আগে পরে এবার চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সব জায়গায় ব্যাপকভাবে হইচই পড়ে। তারপরও মিল মালিকরা চাল না ছাড়ায় বাধ্য হয়ে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বৃহস্পতিবারে চাল মজুতের অভিযোগে ১৬ হাজার মিল মালিককে ব্ল্যাকলিস্ট করেছেন। এতে তাদের ক্ষতি হবে না। কারণ তারা সরকারকে চাল না দিয়ে বর্তমানে বাড়তি দামেই ৩৯ টাকা কেজি মোটা চাল বিক্রি করছেন। অপরদিকে, সরকার আমদানি শুল্ক কমানোয় এর সুফল পেতে শুরু করেছে ভোক্তারা। আগামী ২ সপ্তাহ পরে আরো কমবে। আগে খালি থাকলেও বর্তমানে পাইকারি বাজার কৃষিমার্কেটসহ সব দোকানেই মোটা, চিকন চালে ভরপুর। তবে দেশি গুটি স্বর্ণা মোটা চালের সরবরাহ কম থাকায় দাম কমছে না। চিকন মিনিকেট ও আটাশ চালে আগের চেয়ে সর্বোচ্চ ১ টাকা কমলেও বর্তমানে তেমন আর কমবে না।

শনিবার রাজধানীর চালের পাইকারি বাজার কৃষিমার্কেটসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং মিল মালিক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বোরো মৌসুমের আগে রাজধানীতে বাড়তে থাকে চালের দাম। তা শেষ হয়ে গেলেও হাওরে বন্যা ও ব্লাস্টে ধানের ক্ষতির অজুহাতে কম দামে তো দূরের কথা বাড়তি দামের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। তা নিয়ে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে সব জায়গায় এপ্রিল থেকে ব্যাপকভাবে সমালোচনা শুরু হয়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা চাল না পাওয়ায় মিল মালিকদের দোষারোপ করেন যে, তারা চাল দিচ্ছে না। টাকা নিয়েও তারা চাল দিচ্ছে না। তারা গোডাউনে চাল মজুত করে রাখছে। অপরদিকে মিল মালিকরা বলতে থাকেন, আমাদের এবার মোটা ধান নেই। তাই চাল দিতে পারছি না। আমদানি করলে কমে যাবে। এভাবে কেটে যায় ৩ মাস। অবশেষে ২০ জুন সরকার উদ্যোগ নেয়। আমদানি

শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। তখন বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, প্রতি কেজিতে কমবে ৫ থেকে ৬ টাকা। এরপরে চাল আমদানি শুরু হলে প্রথমে তেমন কমেনি। কারণ খুচরা ব্যবসায়ীরা লোকশন করতে নারাজ। তবে গত সপ্তাহ থেকে চালের দাম কমতে শুরু করেছে।

এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের লতিফ রিয়েল স্টেটের ভাই ভাই জেনারেল স্টোরের মালিক রাকিব বলেন, আগে না কমলেও সম্প্রতি কম দামে কেনার কারণে কম দামেই মোটা চাল বিক্রি করা হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি করা চাল ৪৫ টাকা, আটাশ ৫০ টাকা ও মিনিকেট চাল ৫৬ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে দেশি মোটা চাল পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কম দামে পাওয়ায় কম দামেই বিক্রি করছেন। কারণ শুল্ক কমানোর আগে ৫০ টাকা কেজি চাল বিক্রি করা হয়। এসব চাল তারা বাংলাদেশের বড় পাইকারি মোকাম রাজধানীর কৃষিমার্কেট ও সদরঘাটের বাদামতলী থেকে নিয়ে আসেন। এখানে কেনার দামের সঙ্গে আরো ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে খুচরা ব্যবসায়ীরা চাল বিক্রি করছেন।

সরেজমিন গেলে চালের ব্যাপারে কৃষিমার্কেটের শাপলা রাইস এজেন্সির শিপন মানবকণ্ঠকে বলেন, ভারতের মোটা চাল ৪১ টাকা, আটাশ ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা এবং মিনিকেট চাল ৪৮ থেকে ৫২ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে দেশের গুটি স্বর্ণা চাল পাওয়া যায় না। কুষ্টিয়ার রশিদ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাগর মিনিকেটের দামই বেশি। তিনি আরো বলেন, চিকন চালের দাম তেমন কমবে না। তবে মোটা চালের দাম আরো কমে অল্প দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কারণ আমদানি করা চাল ওএমএস করা হবে।

তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ওই বাজারের মাস্টার এন্টারপ্রাইজের স্বপন বলেন, ‘ভাই দেশের গুটি স্বর্ণা চাল পাওয়া যায় না। তবে সম্প্রতি ভারতে দাম বাড়ায় বর্তমানে ৪১ টাকা কেজি মোটা চাল বিক্রি করা হচ্ছে। যেহেতু প্রতিনিয়ত আদমানি বাড়ছে, তাই দামও কমতে থাকবে। আটাশ ৪৬ থেকে ৪৭ টাকা, মিনিকেট ৫২ থেকে ৫৩ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে।
কৃষিমার্কেটের সেমার্স মহসিনা ট্রেডার্সের মালিক সানোয়ার এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকার শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেয়ার পর থেকে ভারত থেকে আদমানি করা প্রতি কেজি চালের দাম কমেছে ৫ টাকা। প্রথমে সাড়ে ৩৮ টাকা কেজি বিক্রি করা হয়। তবে ভারত দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই একটু দাম বেড়েছে। গত শনিবার ভারতের মোটা চাল ৪২ টাকা, আর দেশি গুটি স্বর্ণা আগের দামেই ৪৪ টাকা এবং হাইব্রিড স্বর্ণা ৩৮ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে আগে আটাশ সাড়ে ৪৭ থেকে ৪৮ টাকা বিক্রি করা হলেও ১ টাকা কমে বিক্রি করা হচ্ছে। আর মিনিকেট চাল আগে ৫০ থেকে ৫৪ টাকা কেজি বিক্রি করা হলেও গতকাল ৪৭ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, মোটা চাল পাওয়া যাচ্ছে না। মিলে পর্যন্ত গেছি। তারা বলছেন চাল নেই। কীভাবে দেব।

বৃহস্পতিবার চাল মজুত করার অভিযোগে ১৬ হাজার মিল মালিককে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়েছে। বাজারে এর প্রভাব পড়ার ব্যাপারে সানোয়ার বলেন, এতে মিল মালিকরাই লাভবান হবেন। কারণ তারা ৩৪ টাকা কেজি চাল সরকারকে দেয়নি। আবার বাজারেও ছাড়েনি। এখন থেকে ৩৯ টাকা দরে বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রশিদ এগ্রো ফুড প্রডাক্টসের মালিক মো. আব্দুর রশিদ এ প্রতিবেদককে বলেন, কোনো মিল মালিক চাল আটকাতে চায় না। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দেয়া হয়েছে, ৯৬০ টাকা মণ ধানের দাম দেয়া হয়েছে। এটা ভালো। কিন্তু আমরা তো লোকশান করে ব্যবসা করতে পারি না। তাই অনেকের সক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় ৩৪ টাকা কেজি চাল সরকারকে দেয়া সম্ভব হয়নি। সরকার ব্ল্যাক লিস্টের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা অনৈতিক ও অন্যায়। মিল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই মূল্য সংশোধন করা দরকার। চালের আরেক বড় ব্র্যান্ড সাগরের মালিক মো. ইরফান আলী বলেন, ধান না থাকায় আমরা চাল বিক্রি করতে পারছি না। ধানের দাম বেশি থাকায় সরকারকে চাল দেয়া সম্ভব হয়নি, বাজারেও দেয়া যাচ্ছে না, এটাই আসল কথা। কারণ হচ্ছে, এবারে অন্য বছরের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ ধান হয়েছে। তবে আমদানি করা চাল বাজারে সরবরাহ বাড়তে থাকায় আগামী ২ সপ্তাহে চালের দাম কমে স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। মিল মালিকদের ব্ল্যাকলিস্টের ব্যাপারে তিনি বলেন, এতে আমাদের লাভ হবে এটাই স্বাভাবিক কথা। কারণ সরকার কম দামে চাল কেনে। কিন্তু বাজারে তার চেয়ে বেশি দাম।

চাল মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জয়পুরহাটের মদিনা রাইস মিলের মালিক লায়েক আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, সমিতির সিদ্ধান্ত ছাড়া আমি কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। আমরা বসে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই আপনাদের সঙ্গে কথা বলব।

মানবকণ্ঠ/এসএস