কালিকাপ্রসাদ: নিভে গেল গানের এক প্রদীপ

দেশে-বিদেশে আর কত প্রাণ যাবে সড়ক দুর্ঘটনায়? আর কত প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ শুনে স্তব্ধ আমরা? সড়কে মৃত্যুর মিছিলে প্রিয়জনের লাশের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এ ভার বহন করার ক্ষমতাও যেন নিঃশেষ হয়ে পড়ছে দিন দিন। সর্বশেষ যুক্ত হলেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য যিনি বাংলা লোকগানের সুর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নাগরিক সীমানায়। ভারতীয় চ্যানেল জি বাংলার রিয়ালিটি শো সারেগামাপা তার জন্যই হয়ে উঠেছিল অনন্যসাধারণ। তার গান মানেই নিজেকে খুঁজে পাওয়া। নিজস্ব সংস্কৃতির হারানো পথে ফিরে যাওয়া। তার জন্যই সারেগামাপা পূর্ণতা পেয়েছিল মাটির সুরে, মাটির গানের ছোঁয়ায়। এই তো সেদিন তিনি ঘুরে গেলেন বাংলাদেশ। বছরখানেক আগে শিল্পকলা একাডেমিতে গাইলেন লোকগীতি ও গণসংগীত। ছুঁয়ে গেলেন অসংখ্য ভক্তের হৃদয়। আর আজ? সব যেন স্মৃতি! আচ্ছা মনে আছে, শাহবাগ চত্বরের কথা? যেখানে গণজাগরণ মঞ্চকে ঘিরে জেগে উঠেছিল পুরো বাংলাদেশ? সেই শাহবাগকে নিয়ে গান লিখেছিলেন তিনি। ওপার বাংলায় থেকেও ১৯৭১ এ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার চেয়েছিলেন গানের কথায় এবং সুরে। বলেছিলেন আজ আমাদের প্রেম, আমাদের রাগ, শাহবাগ শাহবাগ/আজ দুনিয়ার কাছে লড়াই মানেই, শাহবাগ শাহবাগ? শাহবাগ মানে মুক্তিযুদ্ধের অপরাধীদের ফাঁসি/ শাহবাগ মানে বাংলাভাষা, বাংলাকে ভালোবাসি। এও বলেছিলেন, ‘৭১ এ মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে যে যার অবস্থান থেকে কাজ করেছে মাতৃভূমির জন্য। আর আমিও তো বাঙালি। তাই এক ধরনের দায়িত্ববোধ এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা জানাতেই আমার এই গান।’ গানটির শেষাংশ ছিল এ রকম শাহবাগ মানে বাংলা থেকেই রাজাকার নিশ্চিহ্ন/ একুশের মাসে বসন্ত আসে এবার এসেছে সংগ্রাম/ সারা বাংলায় শাহবাগ আজ, শাহবাগ বাংলার নাম/ শাহবাগ শাহবাগ একুশে দিচ্ছে ডাক/ শাহবাগ শাহবাগ আমাদের প্রেমরাগ/শাহবাগ শাহবাগ যৌবন দেয় ডাক/ বসন্তে এলো ডাক শাহবাগ শাহবাগ।…গানটিতে তিনি নিজে সুর করেছিলেন, কণ্ঠ দিয়েছিলেন। সারাবিশ্বের মানুষ যেন শাহবাগের আন্দোলনের আবেগ, যৌক্তিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে সেজন্য ইউটিউবে গানটি সংযুক্ত করেছিলেন। সততার পক্ষে, সত্যের পক্ষে এমন দরদি মানুষটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলেন। সঙ্গে ছিলেন আরো ছ’জন। এদের মধ্যেও তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশ এবং ভারতের অনলাইন সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, সিউড়ির একটি স্কুলে অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ও তার দল। সেখানে যাওয়ার পথে বর্ধমানের গুড়াপের কাছে কালিকাপ্রসাদের গাড়িটিকে পেছন দিক থেকে একটি লড়ি এসে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা মারলে গুরুতর আহত হন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য এবং তার সঙ্গীরা। গুরুতর অবস্থায় বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের। মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে লোকসঙ্গীতের মহীরুহসম এক ব্যক্তিত্বের জীবনাবসান হলো। এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, সে মৃত্যু কাক্সিক্ষত নয়।
‘দোহার’ কলকাতার বাংলা গানের একটি ব্যান্ড। এর প্রাণপুরুষ ছিলেন কালিকাপ্রসাদ। বাঙালির কাছে ‘দোহার’ শুধু একটি পরিচিত নাম নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে লোকগান ও দোহার যেন অনেকটাই সমার্থক। শুধু গাওয়া নয়, লোকগানের গবেষণার দিকটিকেও সমানে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন কালিকাপ্রসাদ। সেই সঙ্গে ছিল প্রয়োগের দিকটাও। প্রজন্ম পরম্পরায় লোকগানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাটনটি যেন এই সময়ে তার হাতেই তুলে দিয়েছিল প্রবহমান সময়। বাংলা ব্যান্ড যখন বাংলা গানের ইতিহাসে নতুন পরিবর্তন আনছে, তখন লোকগানকে নতুন আঙ্গিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে দোহার। এই দলটির পথচলা শুরু ১৯৯৯-এ। শহুরে মানুষদের মাটির গান শোনাতেই দলটির জন্ম-এমনটাই জানিয়েছিল দোহার। তারা তাদের কথা রেখেছিল। উত্তর-পূর্ব তথা গোটা বাংলার বাউল-ভাটিয়ালি-চটকা-ঝুমুর-সারিগান-বিহু সব গানই ঘুরেফিরে এনেছে তারা। নতুন করে শ্রোতা তৈরি করেছে। বিস্মৃত প্রায় বাংলা গানের সুদিন ফিরিয়ে এনেছে।
কালিকাপ্রসাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শোকতপ্ত শিল্পীমহল। গায়কের আকস্মিক মৃত্যুর খবর এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না কবীর সুমন, শ্রাবণী সেন, উষা উত্থুপ, রূপঙ্কর, সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা। শোকাহত আমরাও। এপার বাংলার অগণিত ভক্ত শোকাবৃত। অকালে নিভে যাওয়া গানের এ প্রদীপ আর জ্বলে উঠবে না জানি। তবু শুধু এইটুকুই বলতে পারি ‘তোমায় হৃদমাঝারে রাখিব ছেড়ে দেব না।’
সাবিরা ইসলাম