কার্ল মার্কস

একজন প্রভাবশালী জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ও মার্কসবাদের প্রবক্তা। বিংশ শতাব্দীতে সমগ্র মানব সভ্যতা মার্কসের তত্ত্ব দ্বারা প্রবলভাবে আলোড়িত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পতনের পর এ তত্ত্বের জনপ্রিয়তা কমে গেলেও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কসবাদ এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্ল মার্কস প্রুশিয়া সম্রাজ্যের নিম্ন রাইন প্রদেশের অন্তর্গত Trier নামক স্থানে এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা হাইনরিশ মার্কস এবং মা Henriette হল্কব Pressburg। কার্ল মার্কস ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত বাড়িতেই পড়াশোনা করেন। বাল্যপাঠ শেষে Trier Gymnasium এ ভর্তি হন, ১৭ বছর বয়সে সেখান থেকে স্নাতক হন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব বন-এ আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তার ইচ্ছা ছিল সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে পড়া, কিন্তু তার বাবা মনে করতেন কার্ল স্কলার হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে না। কিছুদিনের মধ্যেই তার বাবা তাকে বার্লিনে এ বদলি করিয়ে দেন। সে সময় মার্কস জীবন নিয়ে কবিতা ও প্রবন্ধ লিখতেন, তার লেখার ভাষা ছিল বাবার কাছ থেকে পাওয়া ধর্মতাত্ত্বিক তথা অতিবর্তী ঈশ্বরবাদের ভাষা। এ সময়ই তরুণ হেগেলিয়ানদের নাস্তিকতাবাদ গ্রহণ করেন। ১৮৪১ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
বার্লিনের বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি ভাগ ছিল। তরুণ হেগেলিয়ান, দার্শনিক ছাত্র এবং লুডউইগ ফয়েরবাক ও ব্রুনো বাউয়ারকে কেন্দ্র করে গঠিত সাংবাদিক সমাজ ছিল বামপন্থী। আর শিক্ষক সমাজ ছিল জি ডব্লিউ এফ হেগেল। এই দুটি ভাগ ছিল পরস্পরবিরোধী। হেগেলের অধিবিদ্যাগত অনুমিতিগুলোর সমালোচনা করলেও বামপন্থীরা প্রতিষ্ঠিত ধর্ম ও রাজনীতির কঠোর সমালোচনার জন্য হেগেলের দ্বান্দ্বি^ক পদ্ধতিই অনুসরণ করতো। ১৮৪৩ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে মার্কস প্যারিসে আসেন। এ শহর তখন জার্মান, ব্রিটিশ, পোলীয় ও ইতালীয় বিপ্লবীদের সদর দফতর হয়ে উঠেছিল। তিনি প্যারিসে গিয়েছিলেন মূলত জার্মান বিপ্লবী Arnold Ruge-এর সঙ্গে কাজ করতে। সে সময় ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস প্যারিসে গিয়েছিলেন মার্কসকে ১৮৪৪ সালের বাস্তবতায় ইংল্যান্ডে কর্মজীবী মানুষের অবস্থা অবহিত করতে। এর আগে ১৮৪২ সালে মার্কসের সঙ্গে এঙ্গেলসের এ নিয়ে কথা হয়েছিল। সে পরিচয়ের ভিত্তিতেই এঙ্গেলস এ ধরনের উদ্যোগ নেন। এভাবেই এঙ্গেলসের সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা ঘটান। এটা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধুত্বের একটি। ১৮৪৯ সালের মে মাসে কার্ল মার্কস লন্ডনে যান এবং ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৮৫১ সালে নিউইয়র্ক ট্রিবিউনের স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন, এতে তার জীবিকা অর্জনেও সুবিধা হয়। ১৮৫৭ সালে ৮০০ পৃষ্ঠার একটি পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ করেন। বইটির সংক্ষিপ্ত নাম ছিল rundrisse। ১৮৫৯ সালে প্রকাশ করেন কন্ট্রিবিউশন টু দ্য ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমি যা তার অর্থনীতিবিষয়ক পরিপক্ব প্রকাশনাগুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে সংবাদ প্রতিবেদক হিসেবে মার্কস মার্কিন গৃহযুদ্ধের (১৮৬১-১৯৬৫) ইউনিয়ন কারণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ কার্ল মার্কস মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুর সময় মার্কসের কোনো জাতীয়তা তথা দেশ ছিল না, তাকে ১৭ মার্চ লন্ডনের হাইগেট সেমিটারি-তে সমাহিত করা হয়। ১৯৫৪ সালে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি কার্ল মার্কসের সমাধিতে একটি সৌধ স্থাপন করে যার শীর্ষে আছে মার্কসের মুখমণ্ডলের ভাস্কর্য। লরেন্স ব্র্যাডশ এই মুখাবয়বটির স্থপতি। প্রকৃত সমাধিটি সমতল।
সাবেরীন ইসলাম সেতু