কারাগারে যেমন আছেন খালেদা জিয়া

ভাইবোনসহ বিকেলে দেখা করেছেন চারজন

রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের একমাত্র বন্দি এখন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কেমন আছেন কারাগারে? এই কৌতূহল এখন জনমনে।

কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, প্রথম শ্রেণির (ডিভিশন) বন্দি হিসেবে কারাগারে সব ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন খালেদা জিয়া। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার চাহিদাকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

জানা যায়, তার চাহিদা অনুযায়ী কারগারে তাকে রাখা হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি কক্ষে। সেখানে আছে ডিসের সংযোগসহ টেলিভিশন। একজন ব্যক্তিগত গৃহকর্মীও আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। একমাত্র এই বন্দির নিরাপত্তায় কারাগারে ভেতরে-বাইরে নিয়োজিত আছে শতাধিক নিরাপত্তা কর্মী।

কারা অধিদফতরের ঢাকা বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন্স) তৌহিদুল ইসলাম জানান, একজন প্রথম শ্রেণির বন্দির যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা, কারাবিধি অনুযায়ী সব সুবিধাই খালেদা জিয়াকে দেয়া হবে।

খালেদা জিয়ার মামলার অন্যতম আইনজীবী আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, কারা বিধির ৬১৭ অনুযায়ী একজন ডিভিশন-১ প্রাপ্ত বন্দি যা যা সুবিধা পাওয়ার কথা, তার সবই পাবেন খালেদা জিয়া। বাইরে উন্নত জীবনযাপনে অভ্যস্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনসহ সব ধরনের সুবিধাই খালেদা জিয়া পাবেন।

দীর্ঘ ৩৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া এর আগে একবার কারাগারে যান। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তখন খালেদা জিয়াকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার স্পিকারের বাসভবনকে সাব-জেল ঘোষণা দিয়ে সেখানে রাখা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের এক আদেশে খালেদা জিয়া মুক্তি পান।

যেসব সুবিধা পাচ্ছেন: কারা সূত্র জানায়, কারাবিধি অনুযায়ী তার কক্ষে বিভিন্ন আসবাবপত্রের সঙ্গে আছে টেলিভিশন ও ফ্যান। তবে সেখানে কোনো এয়ার কন্ডিশন না থাকলেও তার চাহিদা অনুযায়ী তা সংযোজন করা হয়েছে। আছে আরামদায়ক খাটসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র। একজন মানুষের থাকার জন্য যা যা দরকার সবই আছে সেখানে। তার বাড়তি চাহিদা থাকলে সেটাও কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে বিধি অনুযায়ী তিনি সেই চাহিদা পূরণ করতে পারবেন। খাবারের তালিকায় আছে সরু চালের ভাত, মাছ, মাংস, ডিম সবই। তিনি চাইলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনে বাইরের খাবারও তাকে সরবরাহ করা যেতে পারে। তবে তিনি পেঁপে দিয়ে তৈরি তরকারি কিংবা পেঁপের জুস খেতে বেশি পছন্দ করেন বলে জানান এক কারা কর্মকর্তা।

গত বৃহস্পতিবার কারাগারে নেয়ার পর কারা চিকিৎসক আহসান হাবিব খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। এ সময় খালেদা জিয়ার রক্তচাপ স্বাভাবিক ছিল। এরপর তাকে অল্প চিনিযুক্ত ফলের জুস পরিবেশন করা হয়। এসব ফলের মধ্যে ছিল পেঁপে, আপেল, কমলা ও আঙুর। এ ছাড়া সকালে রুটি, সবজি ও ডিম খেতে পছন্দ করেন। তার দেখাশোনা করার জন্য একজন নারী বন্দিকে দেয়া হয়েছে। তবে আরেকটি সূত্র জানায়, কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত গৃহকর্মী ফাতেমা রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ দুর্নীতির মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশের পর খালেদা জিয়াকে নেয়া হয় এই কারাগারে। এর আগে ভিভিআইপি এই বন্দির থাকার উপযোগী করে গড়ে তোলা হয় কক্ষটি। কারাগারের ভেতরে প্রবেশের পর বাম দিকে সিনিয়র জেল সুপারের কক্ষে রাখা হয়েছে বেগম জিয়াকে। এই কক্ষটি এতদিন ছিল অব্যবহৃত। খালেদা জিয়ার জন্য কক্ষের ভেতর রাখা হয়েছে আরামদায়ক একটি বিছানা। কক্ষ সংলগ্ন টয়লেটটি করা হয়েছে ঝকঝকে পরিষ্কার। কক্ষের সঙ্গেই করা হয়েছে একটি রান্নাঘর। তবে এই কক্ষে খালেদা জিয়াকে বেশিদিন রাখা হবে না বলে সূত্র জানায়। তাকে এই কারাগারের ভেতরই ডে-কেয়ার সেন্টার সংলগ্ন মহিলা ওয়ার্ডে রাখা হতে পারে। কিংবা অন্য কোথাও বাসা ভাড়া করে সেটিকে সাব-জেল ঘোষণা করে সেখানেও রাখা হতে পারে।

একমাত্র বন্দি, কঠোর নিরাপত্তা: ২০১৬ সালের ২৯ জুলাই নাজিমুদ্দিন রোডের এই কারাগারের প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বন্দিকে স্থানান্তর করা হয় কেরানীগঞ্জের নতুন কারাগারে। এরপর থেকে খালি ছিল এই কারাগারটি। পুরাতন কারাগারের একমাত্র এই বন্দির জন্য কারাগারটির চারপাশ ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা বলয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ওইসব এলাকার বাসিন্দারা। কারাগার সংলগ্ন চারটি রাস্তা জেলখানা ঢাল, নাজিমুদ্দিন রোড, ১নং জেল রোড ও বেগমবাজার সড়কে বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। বংশাল ও লালবাগ থানার পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন এসব ব্যারিকেডে। এখান দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যান চলাচল। ওইসব এলাকার বাসিন্দা ছাড়া কাউকে এখান দিয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হচ্ছেন এখান দিয়ে চলাচলকারী জনসাধারণ। ফলে ভোগান্তির ভয়ে খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া এখানকার বাসিন্দারা বাইরেও বের হচ্ছেন না। জানা যায়, কারানিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক নিরাপত্তা কর্মী এখন এই কারগারের ভেতর ও বাইরে ডিউটি করছেন।
যারা দেখা করলেন: এদিকে গতকাল কারাফটকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের সঙ্গে দেখা করতে যান তার পরিবারের সদস্য ও দলীয় নেতারা। তারা বেগম জিয়ার জন্য খাবার নিয়ে যান। তবে পরিবারের সদস্যদের ছাড়া অন্যদের ভেতরে যেতে দেয়া হয়নি।

গতকাল শুক্রবার দুপুর ৩টার দিকে কারগারে যান তার মেজ বোন সেলিমা রহমান, ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, শামীম ইস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও তাদের ছেলে অভীক ইস্কান্দার। প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তাদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। তারা সঙ্গে করে খালেদা জিয়ার জন্য খাবার নিয়ে আসেন।

এর আগে সকালে খালেদা জিয়ার জন্য তার পছন্দের কিছু ফল নিয়ে যান স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতার স্ত্রী। কিন্তু জেলগেট থেকেই ফিরিয়ে দেয়া হয় তাদের। দুপুরে আবার ফল নিয়ে জেলগেটে আসেন বিএনপির তিন নেত্রী অ্যাডভোকেট আরিফা জেসমিন, নেত্রকোনা জেলা মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেহানা তালুকদার ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি উম্মে কুলসুম রেখা। পুলিশ তাদেরও ঢুকতে দেয়নি। সূত্রাপুর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) শেখ আমিনুল বাশার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় আদালত খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের এবং তার ছেলে তারেক রহমানসহ অন্য ৫ জনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন। একই সঙ্গে তাদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

মানবকণ্ঠ/আরএ