কামাল-হুদা বাহাস

কামাল-হুদা বাহাস

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর খারাপ হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীনরা বিরোধীপক্ষের প্রার্থী-কর্মী-সমর্থকদের মাঠেই নামতে দিচ্ছে না। নির্যাতন, নিপীড়ন করে পরিবেশ নষ্ট করে দিচ্ছে। এদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে পুলিশ। সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নির্যাতন ও গ্রেফতার করা হচ্ছে। প্রতিকারের আশায় নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নালিশ দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। উপরন্তু প্রতিপক্ষের মতো আচরণ করছে ইসিও। নির্বাচন উপলক্ষে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও কমিশন তাদের মাঠে না নামিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পে বসিয়ে রেখে ঐতিহ্যবাহী এই বাহিনীটির সুনাম নষ্ট করছে। এসব কারণে অংশগ্রহণমূলক এই নির্বাচনটি এরই মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে এসব বিষয় তুলে ধরে ঐক্যফ্রন্ট জরুরিভিত্তিতে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর দাবি জানায়। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন পুলিশ নিয়ে কথা বলার একপর্যায়ে সিইসির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। সরকারি একটি বাহিনী সম্পর্কে সরাসরি নেতিবাচক মন্তব্য না করতে বলার জেরে বৈঠকেই বাহাস শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনার পর সিইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে বৈঠক বর্জন করে বেরিয়ে আসেন ড. কামাল হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, ডা. জাফরুল্লাহ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ ফ্রন্টের নেতারা। ক্ষুব্ধ ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন ভবন থেকে নেমে দ্রুত নির্বাচন কমিশন থেকে চলে যান। পরে মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অপর নেতারা।

বৈঠকে আগামী ২৭ ডিসেম্বরের সমাবেশ সম্পর্কে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় ধানের শীষের প্রার্থীদের ওপর যেসব হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং যেসব নেতাকর্মী আটক হয়েছেন সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে তালিকা দেয়া এবং ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইতেই বৈঠকটি চেয়েছিলেন নেতারা।

নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে অভিযোগ তুলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, সিইসি আমাদের কোনো কথাই শোনেননি। আমরা সারাদেশে পুলিশের হাতে ধরপাকড়, হয়রানির বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছি, তিনি তা শোনেননি। তিনি পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করেছেন। তিনি জানান, ড. কামাল হোসেন ‘পুলিশ লাঠিয়াল বাহিনীর মতো আচরণ করছে’ এমন মন্তব্য করলে তার প্রতিবাদ করেন সিইসি। তিনি ড. কামাল হোসেনের উদ্দেশে বলেন, সরকারের একটি বাহিনীকে নিয়ে তিনি এমন কথা বলতে পারেন না। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই পরে সবাই বৈঠক থেকে বের হয়ে আসেন।

ইসি ও সরকার নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বৈঠকে মির্জা আব্বাস, মঈন খান আফরোজা আব্বাস, মওদুদ আহমদ, সালাউদ্দিন আহমদসহ বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের হামলার কথা বললেই সিইসি ক্ষেপে যান। তিনি জানান, বিএনপি কর্মীদের গ্রেফতার, আক্রমণ, আহত ও হত্যা করা হচ্ছে। সারাদেশে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সরকার ও কমিশন মিলে নির্বাচনকে বানচাল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নির্বাচনের ৩ দিন আগে গ্রেফতার, অত্যাচার, নির্যাতন বন্ধ না হলে ভোটাররা কীভাবে ভোট দেবে এমন প্রশ্ন তোলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। এখন জনগণ সিদ্ধান্ত নেবেন তারা কি করবেন?

বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, সেনাবাহিনী ইসির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের ক্যাম্পে রেখে পুলিশ দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নৃশংসতা চালাচ্ছে। এতে সেনাবাহিনীকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। নির্বাচনের মাঠের পরিবেশ ভয়ঙ্কর খারাপ। এ অবস্থায় নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখতে সেনাবাহিনী মাঠে নামানোর দাবি জানায় ঐক্যফ্রন্ট। গত রোববার মাঠে নামে সেনাবাহিনী। এরপরেও কেনো নির্বাচনের মাঠের পরিবেশ নিয়ে এত অভিযোগ? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে। তাদের ক্যাম্পে রাখা হচ্ছে। ক্যাম্পে রেখে, নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করলে, সেনাবাহিনীর সুনাম নষ্ট হবে।

ঐক্যফ্রন্টের অপর নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, বৈঠককালে নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ড. কামাল হোসেন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তিনি বলেন, পুলিশ লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এই কথার প্রেক্ষিতে সিইসি ক্ষেপে যান। সিইসি পুলিশের পক্ষ হয়ে কথা বলেছেন, এটা হতে পারে না। সিইসির আচরণ ভদ্রোচিত ছিল না। আমরা তার পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণে সভা বর্জন করে চলে আসছি। সুষ্ঠু নির্বাচনে সাংবাদিকদের ভূমিকার বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের যাতায়াতে বাধা দেয়া থেকে প্রমাণ মেলে কী নির্বাচন হতে যাচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস