‘কামাই ভালা হলে মুড়ি-ছোলা, না হলে ভাত দিয়েই ইফতার’

রেল লাইনের ২ ফুট দূরই সারি-সারি টিন সেডের ঘর। ঘরটির লম্বা ৬ফুট হলে পাশে আরো কম। উচ্চতাও তেমন নয়। কোন রকম ভাবে দাঁড়নো যায়। সেই জায়গা ৪জন এক সাথে বসবাস করে। তারা মাঝে মধ্যে খেয়ে না খেয়ে রোজা রাখছেন। অধিকাংশ রোজাই ভাত দিয়েই ইফতার করেন। সামনে ঈদ আসলেও তাদের কপালে ঈদের ছোঁয়া লাগবে না বলে জানান রোকেয়া বেগম।

আমদের আবার ঈদ আছে নাকী? আমদের তো পরের দেয়া পাতলা কাপড়ে ঈদ যায়। পরে দিলে নতুন কাপড় পরি, না দিলে পুরান কাপড়ই ঈদ কাটাই। আমদের ঈদের চাঁদতো বড়লোকের দিকে চেয়ে থাকে। তারা কিছু দিলে পরি, না দিলে পরি না। আমগো তো সেই রকম তৌফিক (সামার্থ্য) নেই। গত ঈদের আগের দিন রাতে একটি কাপড় ও একটি লুঙ্গি পেয়ে ছিলাম। তা দিয়েই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেছি উনি আর আমি (স্বামী-স্ত্রী)। এভাবেই গত ঈদের দিনের গল্পটি শোনালেন রোকেয়া বেগম।

তিনি তার পরিবার নিয়ে কারওয়ান বাজার রেল লাইনের পাশে থাকেন। স্বামী অসুস্থ্, সন্তানরা আলাদা থাকেন। তিনি তার ছোট মেয়ে, নাতনি আর স্বামীকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে এখানে বসবাস করে আসছেন গত কয়েক বছর ধরে। রেল লাইনের পাশেই তাদের টিনসেটের ঘরটি। ঘরটি লম্বায় ৬ ফুট হলেও পাশে আরো কম। এইটুকু জায়গা কষ্ট করে থাকতে তাদের ৪ জনকে।

রোকেয়ার স্বামী আব্দুর সামাদ গত ২ বছর ধরে কোন কাজ করতে পারে না। তার আগে তিনি রেল লাইন পরিষ্কার ও মেরামতের কাজ করতেন। হঠাৎ একটি দিন তিনি হার্ট অ্যাটাক করেন। তারপর থেকে তিনি কোন কাজ করতে পারেন না। স্বামী অসুস্থ্ হওয়ার পর থেকে রোকেয়া পরিবারের হাল ধরেন। কারওয়ান বাজার থেকে পাকা করলা পাল্লা হিসেবে কিনেন। করলার পাকা দানাগুলো আলাদা করে রৌদ্রে শুকিয়ে বীজ হিসেবে বিক্রয় করেন। প্রতি কেজি বীজ তিনি ৩শত টাকা ধরে বিক্রয় করেন। প্রতি ১৫ দিন পরপর তিনি ১৭-১৮ কেজি বীজ বিক্রয় করেন। তার এই বীজ বিক্রির টাকা দিয়ে কোন মতে সংসারে খরচ চালিয়ে রাখেন। তাছাড়া শীতকালে তিনি কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন পিঠা বিক্রয় করে থাকেন।

রোকেয়া পাঁচ সন্তানের জননী। ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে তার সংসার। ছেলে তিনটি বিয়ে করার পর তারা আলাদা হয়ে যায়। বড় সন্তান মাজহার হোসেন মাঝে মধ্যে এসে তাদেরকে দেখে যান। আর ছোট ছেলে তার পাশের গলিতে থাকেন কিন্তু কোন কিছু দিয়ে তাদেরকে সহায়তা করেন না। মেজো ছেলে কোথায় আছেন তার খবর জানেন না। বড় মেয়ে বিয়ে দিয়ে ছিলেন। ভাগ্য দোষে তাকেও ফেরত আসতে হয় বাবার বাড়িতে। কিন্তু তিনি এখানে থাকেন না। আলাদা বাসা নিয়ে অন্য কোথাও থাকেন। তার মেয়েকেই মা-বার কাছে রেখে গেছেন। ছোট মেয়ে সুমির এখনো বিয়ে হয়নি। মা’র কাজের সহায়তা তিনি করেন।

জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানা সদরেই আব্দুর সামাদ মিয়ার বাড়ি। সেখানে কোন কাজে সন্ধ্যান না পেয়ে পরিবার নিয়ে ঢাকা আসেন প্রায় ১ যুগ আগে। প্রথমে রিকশা চালালেও পরে তিনি রেল লাইন পরিস্কারের কাজটি নিয়ে ছিলেন। বেশ কিছুদিন তিনি কাজটি করে ছিলেন। হঠাৎ অসুস্থতাই তাকে ঘরমুখি করে দিয়েছে। রোজা সময় কিভাবে সংসার চলছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমি কোন কিছুই করতে পারি না। আমার বউ’ই সংসার চালাচ্ছে। ভোর রাতে সবজি দিয়েই খাবার খেতে হয়। টাকা পাবো কই? মাছ, গোশত কিনতে? দুইবেলাই খেতে পাই না ভালো করে!

ইফতার কি দিয়ে করা হয় রোকেয়া কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, সারা দিন রোজা রেখে ইফতারের সময় মনটাই তো অনেক কিছুই খেতে চায় কিন্তু আর্থিক সামার্থ না থাকলে কি করে খাবো। কামাই ভালা হলে মুড়ি-ছোলা ও পেয়াজু আর খারাপ হলে ভাত দিয়েই ইফতার করে থাকি। তিনি আরো বলেন, ঈদের পরে কোথায় থাকবো এটা নিয়ে চিন্তার মধ্যে আছি। রেল লাইনের পাশের জায়গা পরিষ্কার করতে বলে সিটি করর্পোরেশনের লেকেরা।

ছবি : কামরান হোসেন তাজিন

মানবকণ্ঠ/এসই/আরএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.