কাব্যিক ঐশ্বর্যের অফুরন্ততায় একটি নজরুলসঙ্গীত

কাব্যিক ঐশ্বর্যের অফুরন্ততায় একটি নজরুলসঙ্গীত

সৃজন-ছন্দে আনন্দে নাচো নটরাজ
হে মহাকাল প্রলয়-তাল ভোলো ভোলো।।
ছড়াক্ তব জটিল জটা
শিশু শশীর কিরণ ছটা
উমারে বুকে ধরিয়া সুখে দোলো দোলো।।
মন্দ-স্রোতা মন্দাকিনী সুরধ্বনি তরঙ্গে
সঙ্গীত জাগাও হে তব নৃত্য-বিভঙ্গে।
ধুতুরা ফুল খুলিয়া ফেলি
জটাতে পরো চম্পা বেলী
শ্মশানে নব জীবন , শিব, জাগিয়ে তোলো।।

সুর ও বাণীর অপরূপ সুন্দর মিলন ঘটেছে এ গানে। নজরুল তাঁর বিদ্রোহী কবিতায় বলেছিলেন ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতুযর্’ ,- এ গান সে দাবিরই যথার্থ প্রমাণিকা। তিনি এ গানে ভাঙার উন্মাদনায় গাজনের বাসনা বাজাননি, সৃষ্টির সুরলহরী তুলেছেন। জটাধারী শিব যখন মহাকালের প্রলয়ংকর বেশভূষা ধারণ করেন, তখন ধ্বংসের আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে সৃষ্টি। তাঁর প্রলয় নৃত্য শুরু হলে সৃষ্টির আর রক্ষা নেই। বিশ্বের সুখ-দুঃখের প্রতি ভীষণ উদাসীন এই জটাধারী উন্মাদ মহাদেবকে শান্তির পক্ষের শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে সৃষ্টির মহোপকার সাধিত হবে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো কান্না, কোনো বৈষয়িক লোভ তো তাকে থামাতে পারে না। তাহলে উপায় কি? উপায় একটাই নারীর প্রেম। এই জটাধারী ধ্বংস-উন্মত্ত সন্ন্যাসীকে সংসারী বানাতে হবে। সে প্রস্তাবই নজরুল রেখেছেন ছন্দে ছন্দে, সুরে সুরে।

তাকে প্রলয়ের তাল ভুলে সৃজনের ছন্দে নৃত্য করার অনুরোধ জ্ঞাপন করা হয়েছে। তার জটিল জটা থেকে অসৌন্দর্য নয়, বিচ্ছুরিত হবে নবচন্দ্রের আলোর মত কোমল পেলব স্নিগ্ধ রশ্মি -যা প্রেমের পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। বজ্রনির্ঘোষ উন্মাদ-নৃত্য নয়, নৃত্য হবে শান্ত নদী স্রোতের মতো কুলকুল ধ্বনিময় ছন্দে। সে-নাচের সঙ্গে প্রেমানন্দে নেচে উঠবে পৃথিবী। উন্মাদের ধুতরাফুল ফেলে দিয়ে চুলে গুঁজে নিতে হবে চম্পা-বেলীর মতো অনুরাগ-সহায়ক মিষ্টি ফুল। সর্বোপরি আর ভয়ংকর গৃহবিমুখ সন্ন্যাসীর জীবন নয়, এখন থেকে প্রেয়সী দুর্গাকে বুকে ধরে সাংসারিক সৃষ্টির আনন্দে নেচে ওঠা।

এ যেন নজরুলেরই আরেক রূপ। তিনি বিদ্রোহের কবিতা, ভাঙার গান আর অনলবর্ষী প্রবন্ধ লিখে পুরাতন জরাজীর্ণকে ধ্বংস করার ঝড় তুলেছিলেন। আবার যখন গান বাঁধতে শুরু করেন, তখন ধরেছেন শান্তকোমল মুগ্ধমূর্তি। অগ্নিবীণার কবি প্রলয়নৃত্যরত ঝাঁকড়া চুলের নজরুল; আর বুলবুলের কবি উমাকে বক্ষে জড়িয়ে ধরে সৃজন-ছন্দে নৃত্যরত গীতিকার সঙ্গীতকার নজরুল।

গানের সুর ও বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহৃত শব্দ ও অভিনব সুন্দর উপমার ব্যবহার দেখে চমৎকৃত হতে হয়। শিবের চেহারা ও কর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে য্ক্তুাক্ষর যুক্ত তৎসম ও সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার গানটিকে প্রয়োজনীয় গাম্ভীর্য দান করেছে। ‘মন্দ-স্রোতা মন্দাকিনী সুরধ্বনি তরঙ্গে/সঙ্গীত জাগাও হে তব নৃত্য বিভঙ্গে’ এই গভীর ধ্বনিমাধুর্যমণ্ডিত লাইন দুটি অতুলনীয় কাব্যিক ঐশ্বর্যে ভরে উঠেছে। ওজনদার শব্দসমূহের অনুপ্রাসের সভার অনুরণন গানটির ভেতর মহাসঙ্গীতের প্রবলপ্রাণে সম্ভার করেছে। ওজনদার শব্দসমূহের অ তেমনি ‘শ্মশানে নবজীবন শিব, জাগিয়ে তোলো’- এই উপসংহারমূলক চরণটির অর্থব্যঞ্জনা গানটিকে উৎকৃষ্টে কাব্যে উন্নীত করেছে। শ্মশান যেন সে সময়ের কুসংস্কারাচ্ছন্ন জরাগ্রস্ত, জীর্ণতাতাড়িত, বীর্যহীন, ঐশ্বর্যহীন ভারতীয় সমাজের বাস্তব চিত্র। সেই মরার দেশে বরাভয় দিয়ে নবজীবন জাগিয়ে তোলার মিনতি নজরুলীয় সমাজভাবনার শিখরস্পর্শী সাংগীতিক প্রকাশ। বিষয় গৌরবের সঙ্গে মিল রেখে সুর ও বাণীর এমন মহামিলন সঙ্গীত জগতে দুর্লভ বললেও বেশি বলা হবে না।

মানবকণ্ঠ/এসএস