কাটছেই না গ্যাস সংকট

শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট চলছেই। বিশেষ করে রাজধানীর আশপাশে গাজীপুর, আশুলিয়া, টঙ্গী ও সাভারের শিল্প-কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ থাকছে না। নতুন করে কোনো গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস না পাওয়ার কারণেই এই সংকট কমছে না। আবাসিকেও সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। সিএনজি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও একই অবস্থায় আছে।

এদিকে পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, শীতের সময় এমনিতেই পাইপলাইনে কনডেনসেট জমে আবাসিক লাইনে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এদিকে নতুন করে উৎপাদন না বাড়ায় শিল্পে গ্যাস সংকট কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছেই না।

এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান বলেন, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ার কারণে ঘাটতি মেটানো যাচ্ছে না। রেশনিং করেই চলতে হচ্ছে। তিনি জানান, তিতাসের অধীন এলাকায় গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই পাওয়া যায় ১৫০ থেকে ১৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

শিল্পাঞ্চলের মধ্যে টঙ্গী ও গাজীপুরের শিল্প-কারখানায় সমস্যা সবচেয়ে বেশি। বিষয়টি নিয়ে পেট্রোবাংলার সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক হয়েছে। তাদের সমস্যার কথা জানানো হয়েছে। শিল্প মালিকরা গ্যাস পাচ্ছেন না। তারা বারবার ফোন করে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বলছেন। তিনি অভিযোগ করেন, পেট্রোবাংলা ক’দিন আগেও এমন আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু সমাধান হয়নি, বরং গ্যাসের সরবরাহ কমেছে।

সাভার ও আশুলিয়ার একাধিক গার্মেন্টস মালিক জানান, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু চাপ এত কম থাকে যে কোনো কাজই করা যায় না। ফলে কারখানা প্রায়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অনেক শিল্প মালিক গ্যাসের অভাবে সিএনজি দিয়ে কারখানা চালু রেখেছেন। কিন্তু এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। যার ফল হিসেবে তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে পারছেন না। জানতে চাইলে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সাভার, টঙ্গী, আশুলিয়া, গাজীপুর, কোনাবাড়ি, সফিপুর এলাকার কারখানাগুলো গ্যাসের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। আড়াই শতাধিক কারাখানা বন্ধের পথে। এভাবে চললে শ্রমিক অসন্তোষ হবেই। তিনি বলেন, প্রায় সময় কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে। তারা মনে করছেন কাজ না করলে বেতন পাবেন না। চাকরিও যেতে পারে। মালিক পক্ষ তাদের নানা আশ্বাসে শান্ত রেখেছে।

বিদ্যমান সংকটকে আরো তীব্র করে তুলেছে শীতকালীন অবস্থা। সঞ্চালন ও বিতরণ পাইপ লাইনগুলোতে ময়লা ও উপজাত (কনডেনসেট) জমে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।

আবাসিক গ্রাহকদের কাঁধেও চেপেছে ভোগান্তি। বর্তমানে দেশের অনেক স্থানে দিনে চার ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া গেলে পরবর্তী চার ঘণ্টা পাওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টায় ১২ ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া গেলেও রান্নার প্রচলিত সময়ে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় ২৪ ঘণ্টা গ্যাস থাকলেও চাপ কম হওয়ায় চুলা জ্বলে টিমটিম করে।

দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ আবাসিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে। আবাসিক ছাড়াও বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনগুলো গ্যাস সংকটের ভুক্তভোগী। বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩৪০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু গড় উৎপাদন ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি ৭০ কোটি ঘনফুট। শীতে গ্যাসের চাহিদা গরম কালের চেয়ে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট বাড়ে।

রাজধানীতে গ্যাস সংকটে অপেক্ষাকৃত বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে যেসব এলাকার মানুষ তার মধ্যে রয়েছে- মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, কাজীপাড়া, ইন্দিরা রোড, গ্রিন রোড, কলাবাগান, শুক্রাবাদ, কাঁঠালবাগান, মোহাম্মদপুর, রাজাবাজার, মগবাজার, মালিবাগ, তেজকুনিপাড়া, পশ্চিম রামপুরা, বাসাবো, আরামবাগ, আর কে মিশন রোড, টিকাটুলী, মিরহাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা, উত্তরা, জাফরাবাদ, লালবাগ ও কেরানীগঞ্জ।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, আগামী বছর অক্টোবর নাগাদ গ্যাস সংকট থাকবে না। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু করা হবে। এলএনজি আমদানি শুরু হলেই কমতে শুরু করবে গ্যাসের ভোগান্তি। তবে পুরোপুরি গ্যাস সংকট কাটাতে আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

মানবকণ্ঠ/আরএ