কাজির গরু খাতায় আছে গোয়ালে নেই

কাজির গরু খাতায় আছে গোয়ালে নেই

কথায় আছে, ‘কাজির গরু খাতায় আছে গোয়ালে নেই’ অবস্থার মতো ঘটনা আমাদের দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় হরহামেশাই ঘটে। এবার বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে একই ঘটনা ঘটেছে। কয়লাখনিতে হদিস মিলছে না ১ লাখ ১৬ হাজার টন কয়লার। কাগজ-কলমে কয়লা খনির ইয়ার্ডে ১ লাখ ৩০ হাজার টন কয়লা থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ১৪ হাজার টন। এই কয়লাখনিকে কেন্দ্র করে বড়পুকুরিয়ায় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। সে কেন্দ্র থেকে ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু রাখতে প্রতিদিন কয়লার প্রয়োজন হয় ৫ হাজার দুই শত মেট্রিক টন। মূলত তিনটি ইউনিট মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো ১৫০ মেগাওয়াট। ফলে উত্তরাঞ্চলের ৮টি জেলায় রেশনিং পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ চালু রাখা হয়েছিল। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই হঠাৎ বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কর্তৃপক্ষ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির চাহিদামতো কয়লা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে আরেকটি ইউনিট গত ১৯ জুন কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বাকি একটি ইউনিট চালু রাখতে প্রয়োজন হয় ২৮০০ মেট্রিক টন কয়লার। সেখানে খনি কর্তৃপক্ষ ৫০০-৬০০ মেট্রিক টনের বেশি কয়লা সরবরাহ করতে পারে না। এতদিন খনি কর্তৃপক্ষ পিডিবিকে জানিয়ে আসছিল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখার মতো খনির ইয়ার্ডে কয়লা মজুদ আছে যা নিশ্চিত করে আনলেও কয়েকদিন আগে পিডিবিকে জানিয়ে দেয়, খনির কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ শেষ পর্যায়ে। বরাবরই খনি কর্তৃপক্ষ প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন কয়লা মজুদ আছে মর্মে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছিল। অথচ কয়লার অভাবে ২৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম সর্বশেষ ইউনিটটি গত ২৩ জুলাই বন্ধ হয়ে যায়।

এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খনি থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা মজুদ না থাকায় বিস্মিত হয়ে বলেছেন, এত কয়লা কোথায় গেল? প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ইতিমধ্যেই দুদকের তদন্ত কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে মন্তব্য করেছে, ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা মজুদ থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ১৪ হাজার টন। আমাদের দেশে দুর্নীতিবাজদের হাত অনেক লম্বা। অনেক সময়ই বড় ধরনের দুর্নীতিতে রাঘববোয়ালরা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত থাকায় প্রমাণ থাকার পরও অপরাধীরা পার পেয়ে যান। যেমন হলমার্ক গ্রুপ নামে বেনামে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাতিয়ে নিলেও সে অর্থ আজো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আর বড়পুকুরিয়ার যে পরিমাণ কয়লা তসরুফ কিম্বা পরিকল্পিতভাবে আত্মসাত করা হয়েছে যার বাজারমূল্য প্রায় ৩২০ কোটি টাকা। আমাদের ছোট্ট ভূ-খণ্ডের দেশে ভূ-গর্ভস্থ সম্পদ বলতে পানিই অন্যতম। সৌভাগ্যবান মানুষের কোনো কোনো দেশে ভূ-গর্ভস্থ সম্পদ বলতে সোনা, তেল, থাকলেও আমাদের পানির পরে গ্যাস ও কয়লাই ভূ-সম্পদ। তাও আবার খুব যে বেশি, তাও নয়। এক সময় বলা হতো, গ্যাসের উপরে বাংলাদেশ ভাসছে। মাত্র ক’বছর পর শোনা গেল, গ্যাসে মিতব্যয়ী হোন, গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার পথে। এখন আমদানি হবে এলএনজি। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত প্রমাণই হলো, গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। এরই মধ্যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। দিন যতই যাচ্ছে, ততই মানুষ বাড়ছে, আবার বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের সুবিশাল এলাকাজুড়ে গ্যাসের সঞ্চালন লাইন স্থাপিত হয়নি। ফলে গ্যাসনির্ভর ছোট, মাঝারি কিম্বা ভারি শিল্প এ অঞ্চলে নেই বললেই চলে। মূলত উত্তরাঞ্চল কৃষিনির্ভর। চাষাবাদই এ অঞ্চলের মানুষের বেচেঁ থাকার অন্যতম নিয়ামক। আর উৎপাদিত ধানকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলে চালকলই অন্যতম শিল্প। যদিও সরকারিভাবে আজও চালকলগুলোকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তারপরও এ অঞ্চলের ধান উৎপাদন ও ধান থেকে চাল প্রস্তুত করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর গোটা দেশের সিংহভাগ মানুষের মুখের আহার নিশ্চিত হয় এখান থেকেই। এক সময় আখ চাষকে ঘিরে এ অঞ্চলে চিনিকল স্থাপিত হলেও সে শিল্প সরকারি ভ্রান্তনীতির কারণে রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়েছে। এখন আলু চাষকে ঘিরে কিছু কিছু হিমাগার স্থাপিত হলেও চাহিদার পুরোটা পূরণ করতে পারে না। এ অঞ্চলের রুটি-রুজি ব্যবসা বাণিজ্য একমাত্র অবলম্বন বিদ্যুতের ওপর। দীর্ঘদিন থেকে সে বিদ্যুৎ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থেকে আসছিল। বড়পুকুরিয়ার কয়লাখনির বদৌলতে একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এই তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। আর এ অঞ্চলের চাহিদা প্রায় সাড়ে ছয় শত মেগাওয়াট। বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদনের পর বাকিটা বাইরে থেকে এনে জোগান দেয়া হতো। এখন কয়লার অভাবে একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ায় বৃহত্তর রংপুর জেলার চাহিদার পুরো বিদ্যুৎ অন্যত্র থেকে আনতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, লোডশেডিং, লো ভোল্টেজের সমস্যা যে হবে, এটাই স্বাভাবিক। এরপর পিডিপি কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করে হলেও আশার বাণী শুনিয়েছেন, খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা এ সংকটের মোকাবিলা করব। আমরাও আশাবাদী, যেখানে বলা হচ্ছে, দেশে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, সেখানে মাত্র সাড়ে ছয় শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জোগান দেয়া হয়তো অসম্ভব হবে না।

কিন্তু কথা হচ্ছে, বড়পুুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লা দিয়ে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাক্সিক্ষত পুরো চাহিদা মেটানোর পর উৎপাদন খরচের বাইরে লাভ করে কয়লা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা সম্ভব হতো। যেখানে গত ২০০৭ সাল হতে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা বিক্রি করে পেট্রোবাংলা লাভ করত, সেখানে কয়লার মজুদ শূন্যের কোঠায় চলে আসে কিভাবে? যা এ অঞ্চলের মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। যদিও এখন খনি কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিকে আড়াল করতে দীর্ঘদিনের সিস্টেমলসের কথা বলেছে, বাস্তবে কয়লা উত্তোলন করে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সরবরাহ ও বিপণনের ক্ষেত্রে এত বিপুল পরিমাণ কয়লা সিস্টেমলসের কারণে শূন্য হতে পারে না। যেখানে প্রায় ১ লক্ষ ৪৪ হাজার টন কয়লা উধাও, সেখানে সিস্টেমলস নয়, বরং এটিকে সাগর চুরি বলাই শ্রেয় হবে। যে কয়লা খনি থেকে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদার শতভাগ পূরণ করে অত্র-অঞ্চলের শত শত ইট ভাটার চাহিদার পুরো কয়লা সরবরাহ করা সম্ভব হতো, সেখানে কয়লার অভাবে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অর্থাৎ বড় ধরনের দুর্নীতি করা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত যা সামাল দেয়া সম্ভব হয়নি। থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে।

মোদ্দাকথা, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি অত্রাঞ্চলের মানুষের সমৃদ্ধির প্রতীক। এ অঞ্চলে গড়ে ওঠা শিল্প কলকারখানা, চাষাবাদ সেচযন্ত্রে বিদ্যুতের ব্যবহার মানুষের কল্যাণে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বড় অবদান রাখছে। এটি বন্ধ হওয়ায় এ অঞ্চলের শিল্প কলকারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য ও চাষাবাদে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা পুষিয়ে নেয়া অনেকাংশেই কঠিন হবে। জানা গেছে, খনির ভূ-গর্ভের ১৩১৪ নম্বর ফেজ থেকে নতুন করে কয়লা উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি চলছে। খনির ভূ-গর্ভে ১২১০ নম্বর ফেজে ব্যবহৃত উৎপাদন যন্ত্রপাতি সেখান থেকে সরিয়ে এনে ১৩১৪ নম্বর ফেজে স্থাপন করে কয়লা উৎপাদন শুরু করতে প্রায় ২ মাস সময় লাগবে। আমরা আশাবাদী, কয়লা উৎপাদন শুরু হলে পুনরায় একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে চালু করা সম্ভব হবে। এই স্বল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সমস্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সামাল দিতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে জনগণের সম্পদ লুটপাটে জড়িত চক্রটিকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেন ভবিষ্যতে আর কেউ জনগণের সম্পদ লুটপাট কিম্বা তসরুফ করার মতো দুঃসাহস দেখাতে না পারে।
– লেখক : কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এসএস