কাজপাগল মানুষটি আর নেই

সকাল সকাল অফিসে ছুটতেন, গভীর রাত পর্যন্ত নিউজরুমে মগ্ন থাকতেন। সংবাদের শিরোনাম, ছবির ক্যাপশন আর নিউজরুমের মানুষগুলোই ছিল তার আপনজন। নিজের জন্য কোনো সময়ই ছিল না কাজ পাগল এই মানুষটির। তিনি ছিলেন দৈনিক মানবকণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবু বকর চৌধুরী। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ধানমণ্ডির বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর নিভে যায় মানবকণ্ঠের বাতিঘরের জীবন প্রদীপ। দ্রুত ইবনে সিনা হাসপাতালে নেয়া হলেও চিকিৎসকদের আওতার বাইরে চলে যান তিনি। চিকিৎসকরা ঘোষণা করেন তিনি আর নেই।

গত প্রায় আট বছরে একদিনও ছুটি নেননি তিনি। প্রতিদিন অফিসে না আসলে যেন তার ঘুমই আসত না। সম্পাদক হয়েও সবার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশেছেন, হৈচৈ করেছেন। পরম মমতায়-ভালোবাসায় নিউজরুমের সবাইকে আগলে রেখেছেন। আর এই মানুষটির জন্যই মানবকণ্ঠের সাবেক হয়ে যাওয়ারা এখনো মানবকণ্ঠের নিউজরুম মিস করেন।

কাছের মানুষজন তাকে ভালোবেসে এবিসি বলে ডাকত। একদিন এই এবিসি নামের রহস্য ও ইতিহাসও শুনিয়েছেন নিজ মুখে। আমাদের এবিসি আমাদের প্রিয় বকর ভাই যাকে সবাই আবু বকর চৌধুরী নামে চেনে তিনি আর আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন না। গতকাল রাজধানীর আজিমপুরে বাবা আবদুল হালিম চৌধুরীর কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।

আবু বকর চৌধুরী ১৯৬৪ সালের ২১ জুন রাজধানী ঢাকার গ্রিন রোডে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবদুল হালিম চৌধুরী ও মা রাজিয়া খাতুন। নয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ম্যানেজমেন্টে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর করেন। ২০১১ সালের ১ অক্টোবর দিল আফরোজার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

আবু বকর চৌধুরী ১৯৯১ সালে ‘সাপ্তাহিক প্রত্যয়ন’ পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। কাজের ধারাবাহিকতায় পরের বছর তিনি ‘সাপ্তাহিক খবর’-এর নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৯৫ সালে ‘আজকের কাগজ’-এ সহযোগী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। এক সময় ‘আজকের কাগজ’ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে ‘আমাদের সময়’ পত্রিকায় যোগ দেন। ওই বছরের অক্টোবরে তিনি ‘সকালের খবর’-এ বার্তা সম্পাদক ও ২০১১-এর এপ্রিলে ‘সমকাল’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ২০১২ সালে তিনি বার্তা সম্পাদক হিসেবে ‘দৈনিক মানবকণ্ঠে’ যোগদান করেন। এরপর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদকের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তিনি নির্বাহী সম্পাদক হন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে পুনরায় তিনি দৈনিক মানবকণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

গতকাল তার মৃত্যুর খবরে মিডিয়া পাড়ায় শোক নেমে আসে। একে একে দেশের সব গণমাধ্যমে কর্মরত তার সাবেক সহকর্মী ও বন্ধুরা ধানমণ্ডিতে তার বাসায় ছুটে আসেন। বাদ জোহর ধানমণ্ডির তাকওয়া মসজিদে প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দুপুর আড়াইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বিকেল সাড়ে তিনটায় আজিমপুর কবরস্থানে বাবার কবরে তাকে দাফন করা হয়।

এদিকে প্রথম জানাজা শেষে আবু বকর চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান আশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও মানবকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং আশিয়ান গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মানবকণ্ঠ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন মানবকণ্ঠের প্রকাশক জাকারিয়া চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম, উপসম্পাদক আলফাজ আনাম, জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) সৌরভ হাসান ভূঁইয়া ও জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) জহিরুল ইসলাম।

প্রথম জানাজা শেষে আবু বকর চৌধুরীর মরদেহ দুপুর সোয়া দুইটায় নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় প্রেসক্লাবে। সেখানে দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন, কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরীর সঞ্চালনায় স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মানবকণ্ঠের প্রকাশক জাকারিয়া চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সহসভাপতি ওমর ফারুক, ডিউজের সহসভাপতি খন্দকার মোজাম্মেল হক, বিএফইউজের যুগ্ম মহাসচিব আবদুল মজিদ, সমকাল পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক লোটন একরাম, সাংবাদিক খালেদ ফারুকী। পরিবারের পক্ষে বক্তব্য রাখেন আবু বকর চৌধুরীর সহোদর মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। এ ছাড়াও জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন পত্রিকায় কর্মরত মরহুমের দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা।

জানাজা শেষে আবু বকর চৌধুরীর কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বিক্রমপুর মুন্সীগঞ্জ সাংবাদিক ফোরাম, জেমকন গ্রুপের চেয়ারম্যান কাজী শাহেদ আহমদের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও মরহুমের সহকর্মীরা।

শোক: আবু বকর চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাসিম, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ, সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা জি এম কাদের, আশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও মানবকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং আশিয়ান গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মানবকণ্ঠ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফএইজে, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুর সাংবাদিক ফোরাম, জেমকন গ্রুপ ও যশোর-৩ এর এমপি কাজী নাবিল আহমেদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। 

মানবকণ্ঠ/এআর