কাছের বিদেশে একমুঠো সৌন্দর্য

তুহিন আহমদ পায়েল :
এশিয়ার একটি ছিমছাম ও গোছানো দেশ মালয়েশিয়া। প্রতিবছর অসংখ্য ভ্রমণপিয়াসী মানুষ প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্যমণ্ডিত এ দেশে ঘুরতে যায়। দেশটির প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই চোখে পড়ে পাহাড়। তাই একে মেঘ ও পাহাড়ের দেশই বলা চলে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই মূলত বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের সেখানে বেড়াতে যেতে আকৃষ্ট করে। দুই পাহাড়ের মাঝে আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ, ছবিতে দেখা এমন দৃশ্যের মতোই মালয়েশিয়া। দেশটির সব আধুনিকায়নের বেশিরভাগই পাহাড় কেটে করা হয়েছে। বিশেষ করে সড়ক ও রেলপথ।

ডং মং টু কুয়ালালামপুর : মালিন্দ্র এয়ারওয়েজ থাইল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করি মালয়েশিয়া। একসঙ্গে অনেকগুলো ফ্লাইট নেমেছে। আমি প্রায় ১৫০ জনের পেছনে ছিলাম। বাংলাদেশের অনেককেই দেখতে পেলাম তখন। কাউন্টারে দেখলাম বেশ জেরা করা হচ্ছে। যাদের কথায় কোনো সন্দেহ প্রকাশ পাচ্ছে, তাদেরকে ভেতরে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আস্তে আস্তে দীর্ঘলাইন হ্রাস হতে লাগল। এক সময় ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সামনে গেলাম। ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে কিছু সাধারণ প্রশ্ন করলেন। আমার হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাকে পাস দেয়া হলো। বেল্টের সামনে ব্যাগেজের জন্য দাঁড়ালাম। সহসাই ব্যাগ চলে এলো।
সেখান থেকে বের হয়ে প্রথমেই ডলার এক্সচেঞ্জ করলাম। এরপর ২৫ রিঙ্গিত দিয়ে একটি সিম কিনে নিলাম। এখন যাত্রা শুরু করতে হবে কুয়ালালামপুর মেইন শহরের দিকে। এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটারের দূরত্ব। আমি ১০০ রিঙ্গিত দিয়ে একটি ট্যাক্সি ঠিক করি বুকিত বিনতাং পর্যন্ত। চাইলে এয়ারপোর্টের ভেতরেই এয়ারপোর্ট টু কুয়ালালামপুর সিটি বাসে অথবা ট্রেনে করে যেতে পারতাম।
টুইন টাওয়ার : কুয়ালালামপুর শহরের মধ্যবর্তী স্থানে সবচেয়ে ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত এ টাওয়ার। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান এটি। কৃত্রিম লেক, ফোয়ারা, গাছ-গাছালি মিলিয়ে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য সংবলিত বেড়ানোর জায়গাও বানানো হয়েছে, যা বিশ্ব পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার শহরের গুরুত্বপূর্ণ জালান আমপাং, পি পামলী, বিনজাই, কিয়া পেং এবং পিনাং-এর রাস্তাগুলো দ্বারা সংযুক্ত। সুরিয়া কেএলসিসি, এভিনিউ কে-সহ অসংখ্য বিখ্যাত শপিং কমপ্লেক্স রয়েছে এ টাওয়ারে। এর পাশেই রয়েছে জি টাওয়ার, মানদারিন ওরিয়েন্টাল, গ্র্যান্ড হাইট কুয়ালালামপুর এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল কুয়ালালামপুর হোটেলের মতো বড় বড় আবাসিক হোটেল। মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ দুটি ভবনকে একত্রে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যেও রয়েছে ৫টি হোটেল, শপিং সেন্টার, অফিস ইত্যাদি।
কেএলসিসির অফিসিয়াল নাম- পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার কেএলসিসি। এর সঙ্গে রয়েছে বিশাল পাবলিক পার্ক ও মসজিদ, যা সবার জন্য উš§ুক্ত। ৮৮ তলাবিশিষ্ট ভবন দুটিকে সংযুক্ত করেছে একটি ব্রিজ। দুই টাওয়ারের মাঝের ব্রিজকে বলা হয় স্কাই ব্রিজ। ৬০ রিঙ্গিত দিয়ে যে কেউ উঠতে পারেন স্কাই ব্রিজে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক টিকিট বিক্রি করা হয়, আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে। সেখানে উঠতে পারাটা জীবনের এক বিশাল অভিজ্ঞতা বলা যায়। আর তাই কেউই কুয়ালালামপুরে এসে স্কাই ব্রিজ না ঘুরে যান না। এই জায়গা থেকে পুরো শহরটাই দেখা যায়। সংযুক্ত পার্কটিও বিশাল। সামনে রয়েছে বিশাল কৃত্রিম লেক, নয়নাভিরাম ঝরনা, ঘোরাফেরার জন্য সুন্দর লন, যেন শিল্পীর সুনিপুণ তুলির আঁচড়ে হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয়!
সেন্ট্রাল মাকের্ট : সেন্টাল মার্কেট- শহরের কেন্দ্রস্থলে মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি, শিল্প ও নৈপুণ্যের কেন্দ্র এ মার্কেট। ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় মার্কেটটি ১৮৮৮ সালে তৈরি করা হয়। যা এখন পর্যটক, ক্রেতা এবং শিল্পপ্রেমীদের জন্য একটি সুদৃশ্য গন্তব্যস্থল। কেন্দ্রীয় মার্কেট কুয়ালালামপুরের একটি দর্শনীয় স্থানও। যেখানে তারা শুধু শপিং করার জন্য না। মালয়েশিয়ার ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যকে এক নজরে আত্মপ্রকাশ করে সবার কাছে। মার্কেটের আর্ট-ডেকো কাঠামোর আওতায় ৩০০টির বেশি দোকান রয়েছে। সেখানে স্থানীয় হস্তশিল্প, বস্ত্র, স্মৃতিস্তম্ভ, সংগ্রহস্থল এবং রেস্টুরেন্ট রয়েছে। কেন্দ্রীয় মার্কেটে কুয়ালালামপুরের শিল্পের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এখানে শিল্প গ্যালারিকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কোতারায়া/চায়না টাউন : কোতারায়ায় পাশে রয়েছে মালয়েশিয়ার কেনাকাটার বিখ্যাত মার্কেট চায়না টাউন। এখানে বেশিরভাগ কাজ করেন বাংলাদেশি শ্রমিক। অনেকে সেলসম্যানে চাকরি করেন। আবার অনেক বাংলাদেশি ব্যবসাও করেন চায়না টাউনে। একজন পর্যটক যে কোনো মূল্যে এখান থেকে স্বচ্ছন্দে বাজার করতে পারেন। মোটামুটি সস্তা বাজারের মধ্যে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ চায়না টাউন। কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে এ মার্কেটে বাস বা ট্রেনে সহজেই যাওয়া যায়। চীনারাই এ মার্কেটের প্রধান হলেও এখন ভারতীয় ও বাংলাদেশিরাও জায়গা করে নিয়েছে। সেখানে রয়েছে আরো একটি মার্কেট- কোতারায়া সেন্টাল মার্কেট। এ মার্কেটেও বেশিরভাগ কর্মজীবী বাংলাদেশি শ্রমিক। মার্কেটে রয়েছে একটি কালচারার ড্যান্স গ্রাউন্ড। ছুটির দিনে এখানে মালয়েশিয়া, বাংলাদেশি, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও সিঙ্গাপুরি ক্যালচারার ড্যান্স পারফরমেন্স করা হয়। যা স্থানীয় ও বিদেশিরা উপভোগ করে থাকেন।
মার্দেকা স্কয়ার : হাজারো পর্যটকের ভিড় সেখানে। মালয়েশিয়া ভ্রমণে এসেছেন আর এ জায়গা দেখে যাওয়া হবে না, তা হতেই পারে না! তাই সবসময়ই এলাকাটি পর্যটক-মুখর থাকে। কুয়ালালামপুরের ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শনের ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রাধান্য পায় এই মার্দেকা স্কয়ার। যা দেখে অভিভূত হন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা। মার্দেকা অর্থ স্বাধীনতা। ১০০ মিটার উঁচু পতাকা উত্তোলনের স্তম্ভ পৃথিবীর বৃহত্তম বলে স্বীকৃত। এটিকে মালয়েশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও ধরা হয়। এটি পুলিশের প্যারেড এবং ক্রিকেট ম্যাচের জন্যও ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এটি একটি দর্শণীয় ল্যান্ডস্কেপ এরিয়া- যা বাগান, ঝরনা ইত্যাদিতে সজ্জিত করা হয়েছে।
সুলতান আবদুল সামাদ বিল্ডিং: ব্রিটিশ শাসনামলে এ বিল্ডিংটি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হতো। ১৮৯৭ সালে এ ভবনটি নির্মাণ করা হয়। নিও-সারাসেনিক ধরনের এ স্থাপত্যটি সম্পূর্ণ ইটের তৈরি। সমসাময়িক স্থাপত্যের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং পুরো মালয় অঞ্চলে সবচেয়ে নিখুঁত স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃত। অশ্বক্ষুরাকৃতির নকশা, তামার তৈরি গম্বুজসহ ৪১ দশমিক ২০ মিটার উচ্চতার ঘড়ির টাওয়ারটি সবাইকে মুগ্ধ করে। বিশেষ করে রাতের বেলায় আলোকসজ্জিত অবস্থায় এটি অপরূপ হয়ে সবার চোখে ধরা দেয়।
সুলতান আবদুল সামাদ জামে মসজিদ : এছাড়াও আপনি দেখতে পারেন সুলতান আবদুল সামাদ জামে মসজিদ। এটি কুয়ালালামপুরের প্রাচীনতম মসজদিগুলোর একটি। এটি স্থানীয় ক্লাং এবং গম্বাক নামক নদীর মিলিত মোহনায় অবস্থিত। ১৯০৯ সালে নির্মিত এ মসজিদটির ডিজাইন করেন আর্থার বনেনিস হাবব্যাক। ইসলামি মুগল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি এ মসজিদটি মালয়েশিয়ার ইসলামী ঐতিহ্যর এক অনন্য নিদর্শন। বর্তমানে মসজিদটি কুয়ালালামপুর ইসলামী কাউন্সিল পরিচালনা করে আসছে। মসজিদটিতে দুটি বড় মূল মিনার রয়েছে। এছাড়াও কিছু ছোট ছোট মিনার রয়েছে। জাভা স্ট্রিট এবং মালে স্ট্রিট এলাকায় মালয়েশিয়ার মাদ্রাসায় ইবাদতের জন্য আরো কয়েকটি মসজিদ আগেও ছিল, কিন্তু জামে মসজিদটি কুয়ালালামপুরে নির্মিত প্রথম ও একমাত্র বড় মসজিদ ছিল। ১৯০৮ সালে সুলতান স্যার আলাউদ্দিন সুলাইমান শাহের সুলতান কর্তৃক মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯০৯ সালে সুলতান আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটি সবার ইবাদাতের জন্য খুলে দেন। মুঘল স্থাপত্য শৈলীর আদলে মসজিদটি ডিজাইন করা হয়েছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে হয়ে যাচ্ছে, তাই আমাকেও এ এলাকা ছাড়তে হবে।
কেএল টাওয়ার : সেদিন ছিল মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচন। তাই সরকারি সবকিছু বন্ধ ছিল। প্রথমে শুরু করি কেএল টাওয়ার দিয়ে সেদিনের ঘোরঘুরি। কুয়ালালামপুরের একটি অন্যতম আকর্ষণ কেএল টাওয়ার। যার পুরো নাম- মিনারা কুয়ালালামপুর। কেএল টাওয়ারকে মালয়েশিয়ার টেলিযোগাযোগ টাওয়ারও বলা হয়। এটিকে মালয়েশিয়ার জাতীয় প্রতীকও ধরা হয়। আসলে এটি একটি কমিউনিকেশন টাওয়ার। কুয়ালালামপুরের দুটি দর্শনীয় আকাশচুম্বী স্থাপনার মধ্যে এটি একটি। এর মেইন লবি কাঁচের কারুকার্যখচিত গম্বুজের মতো, যার নকশা ইরানের ইস্পাহানের কারিগরের হাতে বানানো।
জাতীয় মসজিদ : মসজিদের ভেতর ঢুকতেই চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল! এতো সুন্দর মসজিদ! শুধু সুন্দর বললেই হবে না, এর অপূর্ব সুন্দর কারুকাজ যেন মুগ্ধতায় ভরে তুলবে যে কারো মন। কুয়ালালামপুর জাতীয় মসজিদ মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই এ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। যুক্তরাজ্যের স্থপতি হাওয়ার্ড অ্যাশলে এবং মালয়েশিয়ান হিশাম আল বাকরি ও বাহারুদ্দিন কাশিমের নকশায় মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৫ সালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। মসজিদের মূল কক্ষে প্রবেশ পথের সামনে মালয়, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় রচিত পুস্তক রাখা আছে তাকে। ইংরেজিতে লেখা ধর্মীয় বাণী সংবলিত বিভিন্ন লিফলেটও রাখা আছে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য।