কাঁচা চামড়ার দামে ধস

কাঁচা চামড়ার দামে ধসকোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দামে ধস নেমেছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম দামে কেনাবেচা হচ্ছে পশুর চামড়া। এজন্য মৌসুমি ব্যবসায়ী বা ফড়িয়ারা ট্যানারি মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়লেও ব্যবসায়ীরা বলছেন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার কারণেই কাঁচা চামড়ার দাম পড়ে গেছে। এ ছাড়া, হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভারের অপ্রস্তুত চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরিত করার কারণেও দেশি-বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলেও দাবি ব্যবসায়ীদের। কোরবানির ঈদে ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত সাড়া না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা। আড়তদারদের দাবি, গত কয়েক বছরে কাঁচা চামড়ার দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে সারাদেশে চামড়া শিল্পে ধসের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়া আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে কেনা শুরু করবে ট্যানারিগুলো। সরকার নির্ধারিত দামেই আড়তদার ও ডিলারদের কাছ থেকে এ বছর ১ কোটির ওপরে গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের চামড়া সংগ্রহ করা হবে। এ কার্যক্রম চলবে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, সারাদেশে ফড়িয়া ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেন। পরে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করেন আড়তদার ও ডিলাররা। এরপর লবণযুক্ত চামড়া কিনে নেন ট্যানারি মালিকরা। তাদের মতে, এবার নির্বাচনী বছরের কারণে গতবারের তুলনায় ২০-৩০ লাখ পশু বেশি কোরবানি হয়েছে। সে হিসেবে কোটির ওপরে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হবে।

জানা গেছে, হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করে সাভারে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল সরকারের। যার পথ ধরে ইতিহাসের খাতায় নাম লিখিয়ে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর করে সাভারে নেয়া হয়। উদ্দেশ ছিল ট্যানারিগুলো হবে কমপ্লায়েন্ট, আন্তর্জাতিকভাবে বাড়বে দেশীয় চামড়ার বাজার। কিন্তু গত বছর থেকে উৎপাদনে যাওয়া এই ট্যানারি শিল্পের অবকাঠামোর অবস্থা বেহাল। এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি এখানকার সিইটিপি (কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার)। ডাম্পিং ইয়ার্ডে রয়েছে নানা সমস্যা। এই জিনিসগুলো ঠিক না হওয়ায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ইউরোপের ক্রেতারা। আর বিদেশিরা না এলে চামড়ার দাম কখনোই বাড়বে না। এ ছাড়া, হাজারীবাগে ছোট-বড় প্রায় ৪শ’ ট্যানারি ছিল। যা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সাভারে বড় বড় ১৫৫টি ট্যানারিকে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১৩০টি ট্যানারি পূর্ণ কিংবা আংশিক উৎপাদন শুরু করেছে। এ অবস্থায় ট্যানারিগুলোর পক্ষ থেকে এবার চামড়া কেনার চাহিদা কম।

অনেক ট্যানারিতে এখনো গত বছরের চামড়াই রয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ও দাম কমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া ছোট ছোট ট্যানারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবার ছাগল, ভেড়া ও গরুর মাথার চামড়ার চাহিদা নেই বললেই চলে। চামড়া শিল্পের বেহাল অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে সারাদেশের আড়তগুলোতে। আড়ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়া শিল্পের এমন মন্দা তারা আগে দেখেননি। নারায়ণগঞ্জের এক ব্যবসায়ী বলেন, ২৫-৩০ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করি। এ রকম অসুবিধা কখনোই দেখা দেয়নি যে চামড়া বিক্রি হয় না। চামড়াগুলো পড়ে আছে, দাম অর্ধেকে চলে আসছে।

ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ না পেয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আড়তে চামড়া সংগ্রহের চাহিদা কমে যাওয়ায়ও চামড়ার বাজার পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। চামড়া শিল্পের এমন পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দাকেই দায়ী করছেন ট্যানারি মালিকরা। তারা বলছেন, সরকারের বেঁধে দেয়া দামেই তারা চামড়া কিনছেন। এদিকে, গত বছরের তুলনায় দাম কমিয়ে কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। এবার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৫ টাকা কমিয়ে ধরা হয়েছে ৪৫-৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা। গত বছর এ দাম ছিল ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫০-৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪০-৪৫ টাকা। অপরদিকে, প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম সারাদেশে ১৮-২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা গত বছর ছিল ২০-২২ টাকা।

আর বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩-১৫ টাকা। যা গত বছর ছিল ১৫-১৭ টাকা। তবে মহিষের চামড়ার দামের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। রাজধানীতে ঈদের দিন গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৫শ’ টাকা থেকে ৭শ’ টাকা দরে। তবে বরাবরের মতোই মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তারা চামড়া যে দামে কিনেছেন সে দামে বিক্রি করতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা জানান, এ বছর আন্তর্জাতিকভাবে চামড়ার দাম কম থাকায় দেশের বাজারেও সরকার দাম কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী বিষয়টি ধরতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করার পর তা প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু এই দামটা আড়তদারদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যারা লবণযুক্ত চামড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করবেন।

অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী না বুঝতে পেরে এবার বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেছেন। তারা আংশিকভাবে কিছুটা লোকসানের শিকার হয়েছেন। রাজধানীতে কাঁচা চামড়ার সবচেয়ে বড় বাজার পোস্তা। এখানকার ব্যবসায়ীরাই দেশের সিংহভাগ চামড়া বিভিন্ন চেইনে সংগ্রহ করে ট্যানারিতে সরবরাহ করেন। এ বছর রাজধানীর দুই সিটিতে প্রায় ৫ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে আশপাশের জেলা মিলিয়ে এবার ১০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য ধরেছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। এখানকার ব্যবসায়ী নেতা বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন, সারাদেশের ফড়িয়া ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কিনে লবণ দিয়ে তা সংরক্ষণ করেছি। বিশ্ববাজারে দাম কম ও অর্থ সংকটের কারণে এবার চামড়ার দাম পড়ে গেছে। ট্যানারি মালিকরা যদি সময়মতো টাকা দিত, তাহলে এ সংকট হতো না। আগামী সপ্তাহ থেকে ট্যানারিগুলো চামড়া কিনবে। আশা করছি, সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে পারব। তবে বিশ্ববাজারে চামড়ার দাম কমে যাওয়া এবং দেশে হাজারীবাগ থেকে সাভারে কারখানা স্থানান্তরের কারণে অর্থ সংকটে রয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। ফলে গত কয়েক দশকের তুলনায় এবার কাঁচা চামড়ার দাম সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে গেছে।

এ বিষয়ে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আগামী সপ্তাহ অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর থেকে ট্যানারির মালিকরা লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহ শুরু করবেন। সরকার নির্ধারিত দামেই আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লবণযুক্ত চামড়া কেনা হবে। চামড়ার মান অনুযায়ী দাম দেয়া হবে। রাজধানীর সবচেয়ে বড় কাঁচা চামড়ার আড়ত পোস্তাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এ চামড়া সংগ্রহ করা হবে। তিনি বলেন, এবার সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের কারণে অর্থ সংকটে পড়েছেন মালিকরা। নতুন করে অনেকে ব্যাংক ঋণ পাননি। সব মিলিয়ে অনেক ট্যানারির মালিক আড়তদারদের পাওনা পরিশোধ করতে পারেননি। অর্থের অভাবে আমাদের ব্যবসা থমকে আছে। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে ২০ থেকে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। এর অর্ধেকের বেশি আসে কোরবানির ঈদের সময়।

মানবকণ্ঠ/ডিএইচ