কল্যাণের সঙ্গেই থাকতে হবে সাংবাদিক সমাজকে

সংবাদপত্র প্রকাশ ও সাংবাদিক হওয়া, লেখা- সবাইকে প্রচণ্ড ব্যথিত করছে। তাই সাংবাদিকতা বিষয়েই লিখতে মনস্থ করেছি। ক্ষমা করবেন। জানি সময় অনেকটাই পাল্টে গেছে। প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধন বলতে গেলে সীমাহীন। ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি এটা আমাদের অর্জন। মানুষ সমৃদ্ধ হয় এসব প্রগতিতে, চরিত্রে অর্জন বাড়ে। দক্ষতা আরো কর্মময় করে তোলে মানুষকে। মানুষের দৈহিক অবয়ব পাল্টায় না,হৃদয় আর মগজটাও যা ছিল তাই থাকে, কিন্তু উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়, মেধা উর্বর হয়। তাই মানুষ বুদ্ধিদীপ্ত, প্রত্যয়ী ও কর্মোদ্যমী হন। তবে তার মধ্যেও সংকীর্ণ মানস এবং কুটিল চরিত্র যে বাস করে না তা বলতে পারব না। আমরা তাই মানুষ হয়েও দু’ভাগে বিভক্ত, এক. মানুষ এবং দুই. অমানুষ। সমাজে বসবাস করা এই মানুষরাই নানা দ্বন্দ্বে ভোগেন বলে মানুষে মানুষে এই ফারাক সৃষ্টি হয়।

মজার ব্যাপার, মানুষ যেহেতু সামাজিক জীব, তাই তারা সচেতন হন, শিক্ষিত হন। কিন্তু এই সচেতনতায় প্রগতিশীলতা অনেক ক্ষেত্রে থাকে না আবার ‘শিক্ষিত’ হয়েও মূর্খ থেকে যায় অনেকেই, কিছুতেই মনুষ্যত্ব বাস করে না ওদের মধ্যে। ফলে এসব মানুষের ক্রিয়াকর্মের অংশ হিসেবে রাজনীতিও তালিকাভুক্ত হয়। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলছি, এসব মানুষই কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে পারিবারিক সংসারে নেতৃত্ব দেন। যখনই এই আচরণে অশিক্ষা কিংবা অপশিক্ষার কৃতজন অনুপ্রবেশ করেন নিজ নিজ বিত্তবৈভবের ওপর আকর্ষণ সৃষ্টি করে, তখনই রাজনীতি, রাষ্ট্র কলুষিত হয়। আমাদেরই এমন অবস্থা বিদ্যমান। আমরা কিন্তু আগের জমানায় ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তানিদের বিরোধিতা করে জনমনে যে আস্থার ভাব সৃষ্টি করেছিলাম সংগ্রাম কিংবা আন্দোলনের মাধ্যমে, তা কিন্তু বাংলাদেশ আমলে বিস্মৃত হয়েছি সবাই।

এখন কেবল আত্মরক্ষা, প্রচার এবং স্বার্থ সংরক্ষণেই মত্ত সবাই। আমার তাই বারবার মনে হচ্ছে, অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে নয়। নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে আমরা চাই না কিছুতেই অথচ আমরাই এ দেশের মালিক। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নয়, লাখো প্রাণের শাহাদাতের বিনিময়ে অর্জন করেছি দখল হয়ে যাওয়া মাতৃভূমিকে। তবুও কেন জানি না, আমরা লড়ে যাচ্ছি নিজেদেরই বিরুদ্ধে। এখানে বিদেশি হস্তক্ষেপ কিংবা অনাকাক্সিক্ষত নাক গলানোর ঘটনা অহরহ প্রত্যক্ষ করি। কেন এই অবস্থা মেনে নিচ্ছি? কারণ সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ, পরে ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব থেকে মুক্তির লক্ষ্যে যে আন্দোলন সূচিত হয়েছিল তার পক্ষে ছিলাম আমরা জনগণ সবাই। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানি শোষক গোষ্ঠী নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য কপটতা, হিংস্রতা ও চক্রান্তের জাল বিস্তার করেছিল কৌশলে এবং দোসর হিসেবে এই বঙ্গেরই মুষ্টিমেয় ‘বঙ্গসন্তান’কে পেয়েছিল, তাদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে ‘সে সব কাহারও জন্ম নির্ণয় ন’ জানি।’ পাকিস্তানিরা এ বঙ্গে চড়াও হলে এদের স্বার্থবাদী আর সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কখনোই দেশমাতৃকার পক্ষে দাঁড়ায়নি, মুখে দেশ ও দশের জন্য কেঁদে জার জার হয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় মত্ত ছিল, শাসকগোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য। আর প্রগতিশীল সব কর্মকাণ্ডকে ওরা ধর্মবিরোধী, নাস্তিকতার আবরণে মুড়ে দেয়ার চেষ্টায় মত্ত থাকত।

ওই মুষ্টিমেয় স্বার্থবাদী লোকজন আমাদের মুক্তিসংগ্রামের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে একাত্তরে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো মানুষকে বেধড়ক হত্যা করে দেশটাকে নিজেদের করতলগত করে রাখারই চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নয় মাসের সর্বজনীন মুক্তিযুদ্ধে বিপুল রক্ত খরচে অর্জিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ আজ চারদশক বছর পার করছে কিন্তু এই সময়কালে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের স্লোগানে যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা জীবন বাজি রেখে রণাঙ্গনে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে শাসিত-আতঙ্কিত প্রহর গুনেছিলাম, তা পূরণ হয়নি আজও। দেশ, স্বাধীনতা, পতাকা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় কবি, মাছ, পশু-পাখি ইত্যাদি পেয়েছি। কিন্তু মানুষ হিসেবে সবার মধ্যে ‘আমাকে’ চেনার জন্য অবশ্য জাতীয় পোশাক নির্ধারণ করতে পারিনি। মুখে মুখে গালভরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলি কিন্তু অমুসলিম জনগণকে নিরাপত্তা দিতে পারিনি ফলে ৩০/৩৪ ভাগ জনসংখ্যা থেকে ওরা আজ ৮-৯ ভাগের নির্লজ্জ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। কেন হয়েছে, কেউ বলতে চায় না আর অন্যরা মৌলবাদী অপশক্তির কাঁধে দোষ চাপিয়ে প্রবল পরাক্রমে দেশের রাজনীতিতে বিচরণ করছেন।

২০১৩ সালে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’-এর উত্থান এবং শাহবাগ চত্বর কিংবা প্রজন্ম প্রাঙ্গণ সৃষ্টিতে টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা অনন্য এবং গৌরবোজ্জ্বল, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের সবিশেষ প্রচার-প্রচারণা তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ মানুষকে পর্যন্ত প্রভাবিত এবং দায়বোধে জাগ্রত করেছে। গণমাধ্যমের এই তো প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয় ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ড। যা জনসাধারণের প্রচণ্ড সমর্থন পেয়েছিল এবং এই সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী চত্বর ও যুদ্ধাপরাধী বিচারের প্রবল মঞ্চ নির্মাণে বিপুল সহযোগিতা করেছিল। বস্তুতই একটি আন্দোলন-সংগ্রাম যত বড়, প্রবল এবং জনগণ গ্রাহ্য হোক না কেন, তার প্রচার যদি সঠিকভাবে না হয় তবে উদ্দেশ্য সাধন সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে আমি বলব গণমাধ্যম চ্যাম্পিয়নের ভূমিকা পালন করেছিল যা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। গণজাগরণের মঞ্চেও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদেরও সরব উপস্থিতি ছিল, চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সেদিন ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি হেফাজতে ইসলামের মতো একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর রাজধানীমুখী অভিযান আটকে দেয়া হলো এবং আকস্মিভাবে সরকার ও পুলিশ প্রশাসন তাদের আবার ঢাকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের চত্বরে সমবেত হওয়ার সুযোগ কেন দেয়া হলো, এর পেছনে কোন ধরনের কারচুপি এবং রাজনৈতিক আপসকামিতা কাজ করেছে, তা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে জনতা লাখ লাখ শিশু-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষের কী অভূতপূর্ণ সেই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ জমায়েত অভাবনীয়, কল্পনাতীত। যাদের গণঅভ্যুত্থানে কসাই কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আপিলে গিয়ে ফাঁসিতে পরিণত হয়েছিল।

মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সহিংসতার যথার্থ বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তিবিধানের চলমান লড়াইকে সেদিন ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া কী অসাধারণ আন্তরিকতা নিয়ে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল, আমাদের সবারই তা মনে আছে। ছাত্র-ব্লগার, সংস্কৃতি সংগঠনের সাহসী প্রয়াসকে গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা যে ভূমিকা পালন করেছিলেন এই সংগ্রাম ও প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চকে সংগঠিত করতে, তা কিন্তু বিক্ষুব্ধ তারুণ্যের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এই লড়াইয়ের ময়দানে আমরা যেন সেই আমাদের সাংবাদিক জীবনের পঞ্চাশ-ষাট দশককে খুঁজে পেয়েছি। যখন আমরা ছিলাম পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যূথবদ্ধ সংগ্রামের অন্যতম সংগ্রামী সহযোগী সাংবাদিক ইউনিয়নের ব্যাপারে। তখন সাংবাদিক মাত্রই নিজ স্বাধীন সত্তা অক্ষুণ্ন রেখে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বেগবান ও জনগণকে জাগ্রত করার ভূমিকা পালন করতেন। সাংবাদিকরা যে কোনো দলের নয় তারা জনগণের পক্ষে- গণজাগরণ মঞ্চে সংবাদ পরিবেশনে তাই প্রমাণ হয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকাল সাংবাদিক বা সংবাদপত্রের শিল্পের ঐক্যবদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে নানা কারণে।

তার জন্য অবশ্য প্রধানত দায়ী এ দেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতি। বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতায় সাংবাদিক ইউনিয়নকে বিভক্ত করে সাংবাদিক ঐক্যকে ধ্বংস করে নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের অপচেষ্টাই করা হয়েছে, ফলে আজ ইউনিয়নই গ্রহণযোগ্যতার বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত। এটা পাকিস্তান আমলে সামরিক শাসক জাঁদরেল সমরনায়ক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। যা হোক এই সাংবাদিক ঐক্য ভাঙা ও ইউনিয়নকে দুটিতে পর্যবসিত করার ফল হিসেবে সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমের কর্তৃপক্ষীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা একেবারে ধসে গেছে। এমনকি অধিকাংশ জায়গায় ইউনিয়ন করার অধিকারও হারিয়েছে। ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় অর্জন সংবাদপত্র শিল্পের জন্য বিশেষ করে সাংবাদিক ওয়েজবোর্ড আদায় এখন অনেকটাই নামমাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার যেমন ইচ্ছে দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়ার মাধ্যমে বেতন রফা করা হয়। তা সঙ্গে মহার্ঘ্য ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, যাতায়াত ভাতা ইত্যাকার যে সব অর্থকরী প্রাপ্তির সুযোগ, বেতন বোর্ড রোয়েদাদে রয়েছে তা সবাই পান না। ইনক্রিমেন্ট, বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড কী সবাই নির্দেশিত রীতি অনুযায়ী পান বা পেয়ে থাকেন? মনে হয় অধিকাংশই বলবেন, না, পান না। সাংবাদিকদের অনৈক্যের কারণেই আজ এই দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। টেলিভিশনে যারা কাজ করেন তাদের কি কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে? শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি যদি নাও করি, তবে কি মানুষ হিসেবে মানবিকতার দাবি এরা করতে পারবেন না? রিপোর্টার, ক্যামেরাম্যান বা ফটোগ্রাফারদের ঝুঁকি ভাতা অবশ্যই থাকা উচিত। ইন্স্যুরেন্স তো বটেই।

সাংবাদিকরা মার খাচ্ছেন নিয়মিতই। আগের জমানায় অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকরা দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করতেন এবং কোনো দলের না হলেও লীগ সরকারের বিরোধিতা করলেই সম্পাদক থেকে রিপোর্টার-গ্রেফতার করা হতো। যেমন ধরুন, পাকিস্তান অবজার্ভারের সম্পাদক আব্দুস সালাম, দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া), রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, হাসানুজ্জামান খান, ফয়েজ আহমদ, সন্তোষ গুপ্ত, নির্মল সেন, কামাল লোহানী, আনোয়ার জাহিদ, মাইদুল হাসান এমন অনেকে জেল খেটেছেন। এ ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তানি জামানায়। কিন্তু দৈনিক সংবাদের সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীকে তো দারুণ অসুস্থ অবস্থায় বয়সকালে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সরকার। এই নিগ্রহের দিন কাটেনি, মুক্তিযুদ্ধকালের অবসানেও শেষ হয়নি। বলা যেতে পারে বেড়েছে অনেকাংশে এবং তা নৃশংসতায় পরিণত হয়েছে। শামছুর রহমান, হুমায়ুন কবির বালু, দীপঙ্কর চক্রবর্তী, মানিক সাহা, পরবর্তীকালে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড বিভীষিকার সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকরা দেখলাম ‘তেলেজলে’ মিলে রাজপথ নয় ফুটপাত গরম করল কিছুদিন এখন অলকোয়ায়েট। কেন সাংবাদিক বন্ধুরা? দীর্ঘদিন আগে দৈনিক সংবাদের সিনিয়র সাংবাদিক খ্যাতিমান কবি মোজাম্মেল হোসেন নিহত হয়েছেন।

একটি বেভারেজ কোম্পানির গাড়ি নির্মমভাবে তাকে হত্যা করেছে। তার জন্য তার স্ত্রী ক্ষতিপূরণের দাবি করে মামলা করেছিলেন সেও তো প্রায় ২০ বছর পার হয়ে গেল। রায় হয় আপিলে যায়, এমনিভাবে নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রায় পেয়েছেন কিন্তু এখনো বোধহয় অর্থ হাতে পাননি ভদ্রমহিলা। এই অধ্যাপিকা তার জীবনের এতটা বছর দৌড়ঝাঁপ এবং অর্থ ব্যয় করে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। মাঝে মাঝেই ফুটপাত কাঁপান যে সব সাংবাদিক নেতা তারা কি জানেন, এমন ঘটনা তাদের পূর্বসূরিদের কারো কারো ভাগ্যে জুটেছে?

এত গেল এক ধরনের দুর্ভোগের কথা। আরো যে দুর্গতি সাংবাদিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে তার হদিস রাখছেন ইউনিয়ন কিংবা নেতারা অথবা সমাজের কেউ? সাংবাদিকতা অথবা গণমাধ্যম বলতে এখন যে বিশাল বিস্তৃত এলাকার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে কত যে ‘বেনোজল’ ঢুকে গেছে, তাও কি সাংবাদিক সমাজ, ইউনিয়ন কিংবা নেতারা উপলব্ধি করেন? যে যেমন খুশি সম্পাদকই হয়ে যাচ্ছেন তো সাংবাদিক হতে অসুবিধা কোথায়? যার হাতে টাকা আছে, সেই তো চাইলেই পত্রিকার ডিক্লারেশন নিয়ে নিজে নিজেই সম্পাদক-প্রকাশক হতে পারেন। আজকাল সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার ডিগ্রি না থাকলেও সাংবাদিক কেন সম্পাদকও হয়ে যা খুশি তাই লিখতে পারা যায়, টকশোতে গলা উঁচিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে জাতীয় রাজনীতির বিশ্লেষক পর্যন্ত বনে যান অনেকেই। সরকারের বিধান যাই থাকুক না কেন, আমরা সাংবাদিক ইউনিয়নে থাকতে দাবি করেছি কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলে একজন সম্পাদক হতে পারবেন না। আজকাল টাকা-পয়সা ওইসব বিধানকে লোপাট করে দেয়ায় গয়রহ প্রবেশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যখন যার খুশি, যা খুশি বলে যাচ্ছেন অভিযোগের আকারে।

রাষ্ট্রের সরকারে আসীন শীর্ষ ব্যক্তিরাও অভিযোগ তো করেনই হরহামেশাই এখন তো রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ পান, ধমকও দেন। এসব পরিস্থিতিতে জানি না কেউ আদৌ প্রতিবাদ করেন কিনা? embeded Journalist হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হলে এমন পরিস্থিতির প্রতিবাদ করা উচিত। দলীয় মত থাকতেই পারে একজনার কিন্তু পেশার ক্ষেত্রে তাকে সাংবাদিকই থাকতে হবে। দলের মুখপাত্র হলে পত্রিকার নৈতিক অবস্থান কলুষিত হবে। তবে মনে রাখতে হবে, দেশটা আমাদের, এই দেশকে নিজ মাতৃভূমি রূপ ফিরে পেতে আমরাই লাখো শহীদের রক্তে স্নাত এই জননী জন্মভূমিকে জিতে এনেছি শত্রুনিধন করে।

ওই শত্রুদের এ দেশে থাকারই অধিকার নেই। আজ তারাই বেশি চিৎকার করছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট করার কপট উষ্ণতায়, সহিংস আচরণে। সাংবাদিক হিসেবে এই বিচারের মাপকাঠি যেমন হাতে রাখতে হবে, তেমনি সরকারকে মনে রাখতে হবে দেশটা কোনো দলের নয়, জনগণের। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, টিভি সাংবাদিকতা এতটাই লাগামহীন যে সাংবাদিকতার সংজ্ঞাকেই পাল্টে ফেলতে চাইছে। আধুনিক হব, এগিয়ে যাব, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকব। তাই বলে জনগণকে পথভ্রান্তিতে ভোগানো যাবে না। সেটা আবার অপরাধ হবে। তখন কেবলই জনগণের কল্যাণে যা যাবে, তার সঙ্গেই থাকতে হবে সাংবাদিক সমাজকে। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.