কলম জাদুকরের প্রয়াণ দিবস

শিল্প-সাহিত্যের মুখ্য উদ্দেশ্য মানুষকে বিনোদন ও আনন্দ দেয়া। এ কাজটি যিনি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন তিনি হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের লেখালেখির ভুবনে প্রবাদ পুরুষ হুমায়ূন আহমেদ। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তিনি শরৎচন্দ্রকে ছাড়িয়ে যান। রচনার ব্যাপ্তি, বিষয়ের বৈচিত্র্য, চরিত্র নির্মাণ, রচনাশৈলী, সংলাপ প্রভৃতি মিলিয়ে এক অভিনব ধারা সৃষ্টি করেন তিনি। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের গতানুগতিক ধারাকে অতিক্রম করে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেন এক স্বতন্ত্র ভুবন।

একজন সফল লেখক হিসেবে সাহিত্য-শিল্পের বিভিন্ন শাখায় স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ তাকে এনে দেয় বিপুল জনপ্রিয়তা। তার উপস্থিত বুদ্ধিজাত প্রকাশ ও রসবোধের কারণে তার রচনা সহজেই পাঠকের চিত্ত স্পর্শ করে। তিনি ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করে প্রথমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের রসায়ন বিভাগেই প্রভাষক হিসেবে নিযুক্ত হন।

১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি অধ্যাপনা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং সার্বক্ষণিক সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৭২ সালে লেখা ‘নন্দিত নরকে’ নাতিদীর্ঘ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তার আবির্ভাব। নন্দিত নরকে বাংলাদেশের পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। তার দ্বিতীয় উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার (১৯৭৩)। গল্প, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, শিশুতোষ গ্রন্থ, নাটক, প্রবন্ধ, আত্মজৈবনিক রচনা প্রভৃতি মিলিয়ে তার গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক। তার শেষ উপন্যাস দেয়াল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা জনপ্রিয় উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্প।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস মধ্যাহ্ন এবং বাদশাহ নামদার। আত্মজৈবনিক রচনায়ও তিনি স্বাচ্ছন্দ্য। তার স্মৃতিকথাগুলো সুখপাঠ্য। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখকের বর্ণনার কৌশলে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলি তিনি উপস্থাপন করেন বাস্তবতার আবরণে, যা পাঠক সানন্দে গ্রহণ করে। তার শিশুতোষ রচনা নির্মল আনন্দের পরিবেশ তৈরি করে। ভূতের গল্পগুলো আকর্ষণীয় এবং রোমাঞ্চকর।

হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র নির্মাণেও সার্থক। তার প্রথম ছবি আগুনের পরশমণি (১৯৯৫) এবং শেষ ছবি ঘেটুপুত্র কমলা (২০১২)। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র শ্যামল ছায়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি অবলম্বনে নির্মিত। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মধ্যবিত্ত দর্শকদের হলমুখী করে তোলেন। তার রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য চরিত্র নির্মাণ। তার কল্পনাশক্তি এক একটি চরিত্রকে পাঠকের অন্তরে ঠাঁই করে দেয়। হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, বাকের ভাইÑ এরা এই শ্রেণির চরিত্র। এদের মধ্যে আছে প্রগাঢ় মানবিক মূল্যবোধ ও বৈশিষ্ট্য। হুমায়ূন আহমেদের বহুমাত্রিক সৃজনকর্মের মধ্যে সংগীত একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের অগ্রগতির ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের অবদানও অতুলনীয়।

তিনি স্বীকৃতিস্বরূপ হুমায়ূন আহমেদ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার (১৯৮৭), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার [শ্রেষ্ঠ কাহিনী-১৯৯৩, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র-১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ-১৯৯৪], একুশে পদক (১৯৯৪), শেলটেক পুরস্কার (২০০৭)। বাংলাদেশের বাইরেও তিনি সম্মাননা পেয়েছেন।

নিসর্গ-প্রেমিক হুমায়ূন আহমেদ নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কোলে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। তাই গাজীপুরের পিরুজালি গ্রামে স্থাপন করেন ‘নুহাশ পল্লী’ এবং সেন্ট মার্টিনস দ্বীপে ‘সমুদ্র বিলাস’ নামে বাড়ি।

জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে সারাদেশে নানা আয়োজনের সঙ্গে গাজীপুরের ‘নুহাশ পল্লী’র সমাধিতে দিনভর পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন স্বজন ও ভক্তরা। স্বামীর কবর জিয়ারত করতে ছেলে নিষাদ ও নিনিতকে নিয়ে নুহাশ পল্লীতে আসবেন স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন এবং লেখকের ভাই ও অন্য সন্তানসহ ভক্তরা আসবেন বলে জানিয়েছেন নুহাশ পল্লীর কর্মকর্তারা।

এ ছাড়াও বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন গাজীপুরের পিরোজআলী নুহাশ পল্লীতে। এরমধ্যে স্থানীয় কয়েকটি এতিমখানার ছাত্রদের নিয়ে কবর জিয়ারত, কোরান তিলাওয়াত, দোয়া মাহফিল ছাড়াও ভক্তদের ব্যাপক কর্মসূচি রয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হবেন এই লেখকের অনুরাগী হিমু পরিবহনও। মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করার লক্ষ্যে তার কবরের সাদা পাথর দিয়ে করা মূল কবরের চারপাশে কাঁচ এবং লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য কবরের পশ্চিম পাশে গেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বাংলা সাহিত্য অঙ্গনের এক কালজয়ী নক্ষত্র ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল শামসুর রহমান। তার পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে হুমায়ূন ছিলেন সবার বড়। সাহিত্য জগতে অসম্ভব জনপ্রিয়তা ও পাঠকপ্রিয়তা পেলেও এই নন্দিত লেখক ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হয়ে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলে যান না ফেরার দেশে। মৃত্যুর পর নিজের প্রতিষ্ঠিত নুহাশ পল্লীতেই শেষ ঠাঁই নিয়েছেন তিনি। আজ তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। কিন্তু তার কথা, তার চিন্তা, তার গল্প, তার জাদু এখনো আমাদের সঙ্গে আছে। বাংলা সাহিত্যের এ মুকুটহীন সম্রাটের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ