কর্ণফুলী নদীসহ ঢাকার আশপাশের নদীর দূষণ নিয়ে আজ বিশেষ সভা

নদী দূষণ বন্ধ করার জন্য সরকারের বিভিন্ন কমিটি কাজ করলেও, পুরোপুরি দূষণ বন্ধ হচ্ছে না। বরং এক নদী থেকে আরেক নদী দূষণের কবলে পড়ছে। এই দূষণ প্রতিরোধ নিয়ে আজ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কারিগরি কমিটির বৈঠক হতে যাচ্ছে। বৈঠকে শুধু দূষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নদীগুলোর নাব্য বাড়ানোর বিষয়।

আজ বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। বৈঠকে নৌ বাহিনী প্রধান, বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওয়াসার এমডি, চটগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআই ও বিকেএমইয়ের সভাপতি ছাড়াও সংশ্লিষ্টদের তথ্য-উপাত্তসহ উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে পাওয়া।

এদিকে, ১৭ মে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাস্টার প্ল্যানের খসড়া তৈরি করার নির্দেশনা ছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার। সে অনুযায়ী পরিবেশ অধিদফতর একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। যা আজকের বৈঠকে উপস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। কর্মপরিকল্পনায় পানির গুণগতমান নিশ্চিত করাসহ বেশ কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ইটিপির যথাযথ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, পরিবেশ দূষণ কমানোর কার্যক্রম গ্রহণ করা, দূষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ পাঠানো, নদীর তীরে ৩০০ মিটারের মধ্যে স্থাপিত ইটের ভাটাগুলো বন্ধ করে দেয়া, নদীর তীরে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া, পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত এনর্ফোসমেন্ট পরিচালনা করা ও ঢাকার চারপাশে চারটি নদীর প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম পুনর্জ্জীবিত করা। এছাড়াও তারা আগামী দিনের জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে নদীতে দূষণের মাত্রা নির্ধারণসহ ৬টি বিষয় তুলে ধরেছে।

জানা গেছে, পরিবেশ অধিদফতর ১৯৭৩ সাল থেকে ভূগর্ভস্থ পানির মান পরীক্ষা করে আসছে। ২৭টি নদীর ৬৩টি স্থানে পানির গুণগত মান নিয়মিতভাবে মনিটরিং করে। কিন্তু এরপরও কোথাও কোথাও পানির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে পরিবেশ অধিদফতরের দাবি, বুড়িগঙ্গা নদীর পানি দূষণের অন্যতম কারণ হচ্ছে, হাজারীবাগ এলাকার ট্যানারির বর্জ্য। ইতিমধ্যে ৫৪টি কারখানা সাভারের হরিণধরা শিল্প নগরীতে স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু ঢাকা জেলার কেরাণীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা ঘেঁষে যে ছোট ছোট তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছে সেখান থেকে বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ৩১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে। ঢাকা কেরাণীগঞ্জ উপজেলায় কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার সেন্ট্রাল ইটিপি সংবলিত ওয়াশিং, ডাইং শিল্প নগরী সম্পর্কিত চার পাতার এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে আগানগর, শুভ্যাডা ও জিঞ্জিরা ইউনিয়নে প্রায় ৮ হাজার ছোট ছোট কারখানা রয়েছে। ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০টি মার্কেট। যার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে মোট চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগ তৈরি পোশাক সরবরাহ করা হয়। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ৩৫টি দেশে এসব তৈরি পোশাক রফতানি হচ্ছে। ৭০ হাজার নারীসহ কমপক্ষে সাড়ে ৩ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। তৈরি করছে পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, স্যুট, ব্লেজার, সব রকমের শীতের পোশাক।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, এ সব কারখানা থেকে বছরে ১০ কোটি পিস জিন্স, গ্যাবাডিনের প্যান্ট তৈরি হয়। কেরাণীগঞ্জের প্রায় ৯০টি আর ঢাকার শ্যামপুরের কদমতলীর প্রায় ৩২টি ওয়াশিং ও ডাইং কারখানার মাধ্যমে ওয়াশিং আর ডাইং করা হয়। অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত এসব কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার না থাকার ফলে অপরিশোধিত পানি বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। এর ফলে বুড়িগঙ্গা দূষিত হচ্ছে। তবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কিছু কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি, জরিমানাও করা হয় বলে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক আর্থ সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এই ক্ষুদ্র গার্মেন্টস পল্লী বিকাশে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায় থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সহযোগিতা নেই। সম্প্রতি কেরাণীগঞ্জে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এই এলাকায় ওয়াশিং শিল্পনগরী গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে চামড়া শিল্প নগরীর মতো এ শিল্পকে কেন্দ্রীয় ইটিপির আওতায় আনলে এই শিল্পখাতের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে।

প্রতিবেদনে তৈরি পোশাক বিকাশের স্বার্থে অত্যাধুনিক সেন্ট্রাল বর্জ্য শোধনাগার সংবলিত ওয়াশিং পল্লী স্থাপনসহ ৫টি সুপারিশ করা হয়েছে। অন্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- সরকার কর্তৃক এদের জন্য আলাদা জায়গা ব্যবস্থা করা, এখানে তিতাসের অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মানবকণ্ঠ/এসএস