কত দূরে আলোর রেখা?

২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কে প্রতিযোগিতায় নামা একটি বাস রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা দিলে নিহত হয় দুই কলেজ শিক্ষার্থী। আহত হয় আরো কয়েকজন। প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের সেই প্রতিবাদই হয়ে ওঠে সব মানুষের কণ্ঠস্বর।

ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দেয়া দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়া হলেও শিক্ষার্থীরা ঘরে ফেরেনি। বরং নিরাপদ সড়ক চাই দাবিতে রাজপথে তাদের অবস্থান এবং যানচলাচল নিয়ন্ত্রণে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার মধ্যেই ৩ আগস্ট রাজধানীর মগবাজারে বাসের ধাক্কায় নিহত হয়েছে এক বাইক আরোহী। তার মানে এই দাবি, এই আন্দোলন, এই আশ্বাস কোনো কিছুই আমাদের সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড থামাতে পারছে না।

আমরা একটু পেছনে ফিরে যাই। ২০১১ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে চালকের কারণে প্রাণ দিতে হয়েছিল ৪৫ কিশোরকে। যাদের ভেতরে ছিল অবারিত সম্ভাবনা আর স্বপ্নের বীজ। যে মৃত্যুতে সেদিন সারাদেশের মানুষের চোখের পানিতে ভিজে উঠেছিল মাটি। সেই ৪৫ স্বপ্নতাড়িত কিশোরকে হত্যার দায়ে ঘাতক ট্রাক চালকের হয়েছিল মাত্র পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। তখনই দাবি উঠেছিল মোটরযান আইন সংশোধনের। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা তো হত্যাকাণ্ডের বিচার পাইনি বরং সড়কে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ‘ঘাতক’ বলার অধিকারও হারিয়েছি।

গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ হত্যাকারীকে ঘাতক বলা যাবে না, এই দাবিতে রাজধানীতেই শ্রমিকদের বিশাল সমাবেশের কথাও মনে পড়ছে। সেদিনের শ্রমিকদের সেই আন্দোলন আজ নীরব ধর্মঘটে রূপ নিয়েছে। নিরপত্তার কথা বলে আজ রাস্তা থেকে তারা উঠিয়ে নিয়েছে গাড়ি। সে সময়ে যিনি (তখনো মন্ত্রিসভার সদস্য) সামনে থেকে শ্রমিকদের আন্দোলনে চালকদের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেয়ার বিষয়ে বলেছিলেন- ‘গরু, ছাগল চিনতে পারলেই হলো’। সেই তিনিই আজকেরও ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে অসংযত কথা এবং হাসি দিয়ে প্রতিবাদের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছেন।

প্রসঙ্গক্রমে দীর্ঘদিন আগের একটা কথা মনে পড়ছে। দিনাজপুর থেকে সড়ক পথে ঢাকা আসছি। গাইবান্ধার কাছাকাছি সম্ভবত চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল, ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে। গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র চেক করা হচ্ছে। আমি যে বাসের যাত্রী, সে গাড়িরও কাগজপত্র দেখা হলো, সব ঠিকঠাক থাকায় গাড়ি ছেড়ে দিল দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট। চালকের আসনের পেছনের সিটেই ছিল আমার আসন। এতে শুনতে পাচ্ছিলাম চালক ও সুপারভাইজারের কথোপকথন। গাড়ি চলা শুরু করলে চালক গাড়ির সুপারভাইজারকে যা বলেছিল তার সারাংশ এ রকম- ‘কোনো এক সার্জেন্টকে সে রাস্তায় ভাগমতো পাচ্ছে না। পেলেই ডলা দিয়ে দেবে।’ সেদিন আঁতকে উঠেছিলাম। কারণ তখনো জানা ছিল না, দুর্ঘটনার জন্য চালক দায়ী হলেও ট্রাফিক আইন অনুযায়ী ৩০২ ধারায় তাদের বিচার হয় না। তাই চালকরাও হয়ে উঠেছে বেপরোয়া।

যার ফলে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে সড়কে হত্যার মিছিল। সড়কে দুর্ঘটনার চেয়ে হত্যাকাণ্ডই যে বেশি, তার উদাহরণও ভূরি ভূরি। পাঠকের সুবিধার্থে পেছন থেকেই আরো একটি ঘটনা তুলে আনি। ২০১৪ সালে নিরাপত্তাজনিত কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও কালিয়াকৈর-নবীনগর সড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড় থেকে জেলা পুলিশের ট্রাফিক বক্স প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এ বছরের ২৩ মে ট্রাকচাপায় গাজীপুরে এক ট্রাফিক কনস্টেবল নিহত হয়েছিলেন। পরদিন অধুনালুপ্ত দৈনিক সকালের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘মহাসড়কে বিভিন্ন যানবাহন থেকে হাইওয়ে পুলিশ ও থানা পুলিশ নিয়মিত দৈনিক ও মাসিক চাঁদা আদায় করে থাকে। সিগন্যাল অমান্য করলে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা জরিমানা করে পুলিশ। চাঁদার হাত থেকে বাঁচার জন্যই ঘাতক ট্রাকচালক ট্রাফিক কনস্টেবলের গায়ের ওপর দিয়ে ট্রাক চালিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

একই কারণে ট্রাফিক বক্স প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও ধারণা সংশ্লিষ্টদের।’ সেদিন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটির কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া না আসায় স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তি ছিল। বহুদিন আগে বাসের যাত্রী হয়ে চালকের যে কথা শুনেছিলাম, তারও বহু বছর পরে গাজীপুরে তার উদাহরণ দেখেছিলাম সংবাদপত্রে। সত্যিকার অর্থেই ‘জীবন পাতার অনেক খবর যে রয়ে যায় অগোচরে’ তা আজ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আজ দেখে শুনে মনে হয়, ‘সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ।’ গরু, ছাগল চিনলেও, আমাদের চালকরা রাস্তায় মানুষ চিনতে পারেন না সম্ভবত, তাই প্রতিদিন গাড়িচাপা পড়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর মিছিল শুধু বাড়ছে। অথচ এইসব মৃত্যুর কোনো বিচার হচ্ছে না, কারণ চালকরা বেশিরভাগই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর যারা ধরা পড়ে, বিচারে তারা যে শাস্তি পায়, তা নামমাত্র।

আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে একটি আইনি কাঠামোতে আনার জন্য ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সরকার ১৭৭টি ধারা সম্বলিত ‘মোটর ভেহিক্যাল অধ্যাদেশ ১৯৮৩’ প্রণয়ন করেছিল। ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ সংশোধন এবং যুগোপযোগী করার দাবি দীর্ঘ দিনের। প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। এজন্য আমাদের সড়কগুলো দুরবস্থা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী অনভিজ্ঞ চালকরাও। সেইসঙ্গে ট্রাফিক আইন না মানার মতো অপরাধ প্রবণতাও রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য আমাদের আইনে যে শাস্তি রয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে নানা কথাও হয়েছে।

কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের হুমকির মুখে শাস্তি বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ কাজে আসেনি। বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও চলাচল ২০১২ নামে যে নতুন ট্রাফিক আইন সেখানেও দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র পাঁচ বছর কারাদণ্ড। সঙ্গে জরিমানা আর ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এও কি যথেষ্ট? ২০১৪ সালে চন্দ্রা ত্রিমোড়ে ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবলকে ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করার পেছনের কারণ কি উদ্ঘাটিত হয়েছে? কেন নিরাপত্তা দোহাই দিয়ে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল সেদিন সেখানের পুলিশ বক্স? পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী মানুষকে নিরাপত্তা দেবে।

সরকার মানুষকে নিরাপত্তা দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা পালিত হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর মাধ্যমে। তাহলে তারা কেন সেদিন নিরাপত্তাহীনতার কারণের প্রত্যাহার করেছিল পুলিশ বক্স। আজ নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে থাকা শিক্ষার্থীরাই বা কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর গাড়িতে প্রয়োজনীয় কাগজের অনুপস্থিতি খুঁজে পাচ্ছে? কেন, সেইসব গাড়ির চালকেরও লাইসেন্সে অসংগতি পাচ্ছে? সত্যিকার অর্থেই এখন আমাদের সবদিক থেকেই খোলনলচে পাল্টে যাবার সময় এসেছে। শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে যেসব অসঙ্গতি দেখিয়ে দিয়েছে, সেগুলো রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয় বলে এড়িয়ে যাবারও সুযোগ নেই। বরং উদ্যোগ নিতে হবে, যা প্রকৃত অর্থেই হবে আন্তরিক এবং দৃশ্যমান।

আর মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা অথবা পরিকল্পিতভাবে হত্যা যে অভিধাতেই অভিহিত করি না কেন, এসব মৃত্যুর জন্য যেসব চালক দায়ী তাদের নামমাত্র শাস্তির বিধান পাল্টাতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী চালককে গ্রেফতার করা হয় না, যায় না। ফলে কোনো চালক যদি সচেতনভাবেও কাউকে হত্যা করে, তাহলেও নামমাত্র শাস্তিতেই সে আবার মুক্ত জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পায়। রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীর মৃত্যু আমাদের সামনে এই প্রশ্নটি রেখে গেল আবারো- সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের সাজা কী হবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। নইলে সড়কে পরিকল্পিত খুনের বিচার হবে না, বিচারের বাণী নীরবে কাঁদবে শুধুই, তাতে ভারি হবে আমাদের অক্ষমতা ও লজ্জাহীনতার দৃষ্টান্ত। – লেখক: সাংবাদিক, কবি

মানবকণ্ঠ/এএএম