কচিকাঁচার বাংলাদেশ শূন্য হাতে সিরিজ শেষ

ক্রীড়া প্রতিবেদক :
বদলে যাওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেটের গল্পের পটভূমি কত দ্রুতই না বদলে গেছে! যে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে ডেকে এনে বিশ্বসেরা ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাকে শূন্য হাতে বিদায় করেছে। পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সাফল্যের ঝাণ্ডা সুউচ্চে উড়িয়েছে। আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে উঠেছে। রঙিন পোশাকের সাফল্যের ধার সাদা পোশাকের টেস্ট ক্রিকেটে করেছে শাণিত। ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো জাঁদরেল দলকে হারিয়েছে। নিজেদের শততম টেস্টে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কাকে। সেটা আবার তাদেরই মাঠে। দিন বদলের গল্পের সেই রূপকারদের আজ চিনে নিতে বড়ই কষ্ট হচ্ছে। এরাই কি সেই কুশীলব! যাদের হাত দিয়ে রচিত হয়েছে ক্রিকেটে দিন বদলের গল্প! এই বাংলাদেশের সঙ্গে তো তাদের মেলানো যাচ্ছে না। নতুন এই বাংলাদেশের ক্রিকেটার, তাদের পারফরম্যান্স যেন এক যুগ আগের প্রেতাত্মা।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন যুগের সূচনা বেশি দিনের নয়। এই তো গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ থেকে। ওই সিরিজে টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি তিন ফরম্যাটেই ব্যর্থ হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফেরে আসে লাল-সুবজের দল। প্রোটিয়া সফরে ব্যর্থ বাংলাদেশের সঙ্গে এরপর সম্পর্কচ্ছেদ করে চলে যান বদলে যাওয়ার বাংলাদেশের রূপকার কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। টাইগারদের দায়িত্বে ছেড়ে কাঁধে তুলে নেন নিজ দেশ শ্রীলঙ্কার। দক্ষিণ আফ্রিকায় না হয় ভিন্ন কন্ডিশন, বৈরী আবহাওয়া; সেখানে সাফল্যে সহজে ধরা দেবে না সেটাই খুবই স্বাভাবিক। এটা মেনে নেয়ার মতো। মেনে নিয়েছেনও ক্রিকেটপ্রেমীরা। তাই বলে ঘরের মাঠে ব্যর্থতা! শূন্য হাতে সিরিজ শেষ। এটা কি সহজে মানার! যে মহানায়কের হাত ধরে বদলে যাওয়া গল্পের মুখবন্ধ লিখেছিল বাংলাদেশ। সময়ের বাঁকে সেই মহানায়ক চন্ডিকা হাথুরুসিংহে হয়েছেন ভিলেন। স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হাথুরুসিংহে। গতকাল শেষ হওয়া বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সিরিজে দু’দল ছাপিয়ে প্রতিপক্ষ হাথুরুসিংহেই। সিরিজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আলোচিত-সমালোচিত চরিত্র তো তিনিই।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন যুগের, ব্যর্থ যুগের সূচনা সংগীতের রচিয়তা লঙ্কান কোচ হাথুরুসিংহেই। তার কৌশলের কাছেই শেষ পর্যন্ত ঘরের মাঠে রিক্ত, অশ্রুসিক্ত, কচিকাঁচার দলে পরিণত বাংলাদেশ। ত্রিদেশীয় সিরিজ দিয়ে বাংলাদেশ মিশন শুরু হাথুরুসিংহের। সেই সিরিজে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তৃতীয় দল ছিল জিম্বাবুয়ে। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচেই স্বাগতিক বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ আবার হাথুরসিংহের বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত। হাথুরুর দলের বিপক্ষে জয় ১৬৩ রানের। ত্রিদেশীয় সিরিজে যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাফল্য। শুধু ত্রিদেশীয় সিরিজ কেন? লঙ্কানদের বিপক্ষে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ সব মিলে এই একটি জয়ই বাংলাদেশের গত এক মাসে প্রাপ্তি। পুরো সিরিজ জুড়ে এরপর শুধু লঙ্কানদের, হাথুরসিংহের দলের সাফল্যের গল্প। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ব্যর্থ বাংলাদেশ। লঙ্কানদের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে চট্টগ্রাম টেস্ট ড্র করলেও ঢাকা টেস্টে বাজে হার। টি-টোয়েন্টি সিরিজে তো আরো করুণ দশা। দুই ম্যাচের দুটিতেই পরাজয়। যার একটি ঢাকা। অপরটি গতকাল নয়াভিরাম সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে।
সাকিববিহীন বাংলাদেশ যেন তলাবিহীন ঝুড়ি। এটা ক্রিকেটে প্রবাদ বাক্য হিসেবে চালু করলে খুব বেশি অত্যক্তি হওয়ার মতো নয়। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ফিল্ডিং করতে গিয়ে আঙুলে চোট পান সাকিব। ওই ম্যাচে ব্যাটই করতে পারেননি। ম্যাচটি হেরে যায় বাংলাদেশ। ওই চোটে খেলেননি টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজ। এক সাকিবের অনুপস্থিতি দলে কত পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে দেয়। চট্টগ্রাম টেস্টে অভিষেক হয় স্পিনার সানজামুল ইসলামের। চার বছর পর টেস্টে ফিরিয়ে আনা হয় অভিজ্ঞ স্পিনার আবদুর রাজ্জাককে। চট্টগ্রামে তাকে না খেলালেও খেলানো হয় ঢাকা টেস্টে।
এরপর টি-টোয়েন্টি সিরিজে দলে কতটা পরিবর্তন-পরিবর্ধন এনেছে বাংলাদেশ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ঢাকায় প্রথম টি-টোয়েন্টিতেই চারজনের অভিষেক। জাকির হাসান, আফিফ হোসেন ধ্রুব, নাজমুল ইসলাম অপু এবং আরিফুল ইসলাম। বাদ যায়নি সিলেটে অনুষ্ঠিত কাল দ্বিতীয় ম্যাচেও। এখানে সংখ্যা কমে দুইয়ে। এবার অভিষেক ঘরের ছেলে আবু জায়েদ রাহী এবং মেহেদী হাসানের। কচিকাঁচার দল নিয়ে আর যাই হোক যুদ্ধ জয় করা যায় না। সেখানে আবার প্রতিপক্ষের প্রধান সেনানি যদি হন হাথুরুসিংহের মতো অভিজ্ঞ তার বিরুদ্ধে জেতা আকাশকুসুম কল্পনার সামিল। সিরিজ শেষে সেটাই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে বাংলাদেশ।