কক্সবাজারে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আবারো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কক্সবাজারের পালংখালীর আনজুমানপাড়া পয়েন্ট দিয়ে গত দুই দিনে ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। আরো ১৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে আটকে আছে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে মাঝিদের সহায়তায় একটি দলাল চক্র রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সীমান্তে আনছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে, জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নির্ধারিত ক্যাম্পে নেয়ার দাবিতে ‘কক্সবাজার পিপলস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন স্মারকলিপি দিয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা স্রোত অব্যাহত রয়েছে। বেশ কয়েক দিন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও গত দুই দিনে তা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের আনজুমানপাড়া পয়েন্ট দিয়ে ১৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯ থেকে ১৭ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে তারা আনজুমান উত্তরপাড়া সীমান্তে অর্থাৎ নাফ নদীর বেড়িবাঁধে অবস্থান করছেন। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশিরভাগই বুছিধং থানার মগনামা, কোয়াইনডং, জাদীপাড়া, লাওয়াডং গ্রামের বাসিন্দা। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়েও রাতের আঁধারে নৌকাযোগে প্রায় দেড় হাজারের অধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। তাদের প্রায় সবাই রাখাইনের বুছিধং থানার বাসিন্দা।

এদিকে, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ১৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আটকে আছে বলে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের আগে সীমান্তে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই করার প্রক্রিয়া দ্রুত করারও আহ্বান জানানো হয়। গতকাল মঙ্গলবার সংস্থার এক বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে প্রায় ১৫ হাজার রোহিঙ্গা আটকে রয়েছেন। এ রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ সীমানার আরো ভেতরে নিরাপদে স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানানো হয় ওই বিবৃতিতে।

সংস্থাটির এক মুখপাত্র বলছেন, যে কোনো দেশ তার সীমানায় আসা কারো সম্পর্কে খবর নেবে কিন্তু নতুন আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সীমান্তে মানবেতর অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে পাঁচ লাখ আশি হাজার রোহিঙ্গা ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাদের জন্য খাদ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা মঙ্গলবার কিছু ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেছে। ওইসব ফুটেজে দেখা যায় উখিয়ার পালংখালীর কাছে নাফ নদী পার হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করছে। এর আগে রোহিঙ্গাদের আসার সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিল। তবে গত দুই দিন ধরে সীমান্তে আবারো রোহিঙ্গা স্রোত দেখা যাচ্ছে।

রোববার রাতে নাফ নদী পার হতে গিয়ে নাফ নদী ও সাগরের মোহনায় আবারো নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। নৌকাডুবির ঘটনায় ৫ শিশু ও ৬ নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এ ঘটনায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ২১ জনকে। আরো অন্তত ৩০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ রয়েছে।

আনজুমানপাড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা বুছিধং থানার কোয়াইডং গ্রামের মো. ইসমাইল (৬৫) জানান, রাখাইনের সহিংসতার পর থেকে তাদের বাজার বন্ধ রয়েছে। কোনো কাজকর্ম করতে পারছি না। বাড়িতে খাদ্য নেই। পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেকদিন ধরে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছি। মগ সেনারা কোথাও দেখলে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে এক প্রকার অবরুদ্ধ হয়ে আছি। প্রতি মুহূর্ত আতঙ্ক আর প্রাণের ভয়। তাই এপারে আসতে বাধ্য হয়েছি। তিনি আরো জানান, গত ৭ দিন যাবত পাহাড়ের ঢালু ও বিভিন্ন গ্রাম অতিক্রম করে সীমান্ত পাড়ি দিতে হয়েছে।

রহিমা খাতুন (৪৫) নামে রাখাইনের লাউয়াডং এলাকার এক বাসিন্দা জানান, এক বিভীষিকাময় ও অবরুদ্ধ পরিবেশ থেকে উদ্ধার হয়ে খোলা আকাশে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। অর্ধাহারে-অনাহারে হাঁটতে হাঁটতে শরীর ক্লান্ত ও ব্যথা হয়ে গেছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য সোলতান আহমেদ জানান, বর্তমানে ওপারে হত্যা নির্যাতন বন্ধ হলেও অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গাদের ভুল বার্তার মাধ্যমে তারা এপারে ঢুকছে। নতুন করে অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গারা বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও তিনি জানান।

হঠাৎ করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে কক্সবাজারে অবস্থিত ৩৪ বিজিবির মেজর আশিকুর রহমান জানান, এপারের রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকা তাদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাদের ডেকে আনছে বলে ধারণা করছেন তিনি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

এদিকে, অতিরিক্ত টাকার লোভে মাঝিদের সহায়তায় এক শ্রেণির অসাধু দালাল চক্র রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে এনে জড়ো করছে বরে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে তারা মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া টু শাহপরীর দ্বীপ রুটকে অত্যন্ত নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েক মাঝি এ প্রতিবেদককে জানান, মানবিক দিকটা বিবেচনা করে নৌকা নিয়ে মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকা থেকে মুসলিম রোহিঙ্গাদের টেকনাফে আনা হচ্ছে। এ যাত্রায় টাকা দিলে নেয়া হয় কিন্তু না দিলেও চলছে। কারণ নৌকা চলে তেল দিয়ে।

তারা আরো জানান, প্রথম দিকে তেলের টাকা পাওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা পারাপার করেছি। কিন্তু এখান আর সেই মানবিক দিকটা নেই। প্রতিটি নৌকায় জনপ্রতি বাংলাদেশি ১০-১৫ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেক নৌকা মাঝি ও মালিকরা রোহিঙ্গা পারাপার করে কয়েকদিনে ৩০-৫০ লাখ টাকার মালিক বনে গেছে বলেও মাঝিরা জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের আনা বিষয়ে উখিয়ার সাবরাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূর হোসেন বলেন, অন্তত এক হাজার নৌকায় রোহিঙ্গাদের আনার ব্যবসা চলছে। এক্ষেত্রে দেড় শতাধিক দালাল সক্রিয় রয়েছে। ছোট নৌকায় ১০-১২ এবং বড় নৌকায় ৩৫-৪০ জন লোক তোলা হয়। কম করে হলেও প্রতিবারে তাদের এক লাখ টাকা আয় হয়। তিনি আরো জানান, টাকার লোভে পড়েই মাছ ধরার নৌকাগুলো এখন রোহিঙ্গা ধরার নৌকায় পরিণত হয়েছে।

দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ওসি মাইন উদ্দিন খান বলেন, রোহিঙ্গা পারাপারের অভিযোগে ২৭টি নৌকা আগুনে পোড়ানো হয়েছে। প্রায় শতাধিক নৌকার মাঝি ও দালালকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা প্রদান করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বাধা দেয়া হয়। হঠাৎ সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক দিক-বিবেচনার নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে সীমান্ত এলাকার কিছু কিছু দালালরা টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে লিপ্ত হয়েছে। এরই মধ্যে অনেক দালালকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে।

এদিকে, কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নতুন ও আগে আসা সব রোহিঙ্গাদের উখিয়া-টেকনাফে সরকার নির্ধারিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে তাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত করার দাবিতে ‘কক্সবাজার পিপলস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। ফোরামের সভাপতি সাংবাদিক ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবালের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেনের কাছে এই স্মারকলিপি দেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসীন শেখ, সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইব্রাহিম খলিল মামুন, প্রছার সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে এসে কিছু ক্যাম্পে এবং অনেকেই জেলার বিভিন্ন জায়গায় স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন। অনেক প্রভাবশালী তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এবং আশ্রয় দিচ্ছে। এতে স্থানীয়রা কর্মসংস্থান থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে তেমনিই আইনশৃঙ্খলারও চরম অবনতি হচ্ছে। জেলায় চুরি, ডাকাতি, খুন, পাহাড় কাটা, গাছকাটা, অস্ত্র ও মাদক সরবরাহসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে এসব রোহিঙ্গা। এর প্রেক্ষিতে পুরনো ও নতুন আসা সব রোহিঙ্গাদের একই স্থানে ক্যাম্পে নিয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়ছে। তাদেরও বায়োমেট্রিকের আওতায় এনে তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন।

এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। এটি আমাদের কর্ম পরিধিরও আওতাভুক্ত। যত দ্রুত সম্ভব তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গিয়ে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির আওতাভুক্ত করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। এ কাজে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ