ওল্ড ক্লাউনদের নির্বুদ্ধিতা ও আমাদের রাজনীতি

বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে সব প্রকার বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আজকের বাংলাদেশ আর অতীতের বাংলাদেশ এক নয়, দুটোর মধ্যে রয়েছে যোজন যোজন ব্যবধান। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়াকে আজ আর অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবু যারা কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করছেন- জনগণ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। জনগণের মনোভাব বুঝে যারা রাজনীতি করে না তারা এক সময় আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিবিদই এখন উল্টাপাল্টা কথা বলে সার্কাসের ক্লাউনের মতো আচরণ করছেন। এরা বুঝতে পারছেন না নিজেদের এরা যত বড় বুদ্ধিমান মনে করছেন, মানুষ এদের ঠিক ততটাই নির্বোধ বলে বিবেচনা করছেন। এদের জ্ঞানশূন্য উদ্ভট কথায় শুধু মানুষ নয়, বোধকরি গুলিস্তানের ঘোড়াগুলিও হাসছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে মাল্টিকালার পলিটিশিয়ান বলে পরিচিত মওদুদ আহমদ সাহেব বলেছেন গণঅভ্যুত্থানের মতো অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বর্তমান সরকারের পতন ঘটাবেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয় গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর মতো বিশাল-বিপুল শক্তি ও সাহস আসলেই মওদুদ আহমদরা রাখেন কিনা? নাকি এগুলো কেবলই তাদের কথার কথা? বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলো গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে সেগুলোর ইতিহাস যদি আমরা পর্যালোচনা করে দেখি তাহলে দেখব বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে সময় লেগেছিল ২২ বছর। এমনকি এক সময়ের স্বৈরাচার বলে খ্যাত এইচএম এরশাদের পতন ঘটেছিল যে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই অভ্যুত্থান ঘটাতেও সময় লেগেছিল প্রায় দশ বছর। মওদুদ আহমদ বা মওদুদ আহমদের মতো পলিটিশিয়ান বাংলাদেশে যারা আছেন আমার জানা মতে তাদের পক্ষে গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর মতো ক্ষমতা বা গণসম্পৃক্ততা নেই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন দেখা বোকামি ছাড়া আর কি হতে পারে?

ব্যারিস্টার মওদুদ ভাই আপনার সঙ্গে একসময় আমার যে সখ্য ছিল তা আমি বিস্মৃত হইনি। আপনি রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে বঙ্গবন্ধুর ব্যাগ টেনেছেন, আবার বঙ্গবন্ধুর আমলেই জেল খেটেছেন। কেন বঙ্গবন্ধু আপনাকে জেলে পাঠিয়েছিলেন আর আপনার শ্বশুর কবি জসিমউদদ্ীন বঙ্গবন্ধুর কাছে তদবির করে আপনাকে জেল থেকে মুক্ত করেছেন সেই ইতিহাস আশাকরি আপনি ভুলে যাননি। আপনি সব আমলেই ক্ষমতার স্বাদ নিয়েছেন। জিয়াউর রহমানের পিঠে চড়ে ফায়দা লুটেছেন, এরশাদ সাহেবের কোলে চড়ে প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতি হয়েছেন, খালেদা জিয়ার বগলের তলে থেকেও মন্ত্রী হয়ে দুধ-মধু খেয়েছেন। আর কত! সার্কাসের ক্লাউনের মতো লোক তো আর কম হাসালেন না- এবার দয়া করে ‘ক্ষ্যামা’ দিন। বাংলাদেশে বহুরূপী রাজনীতিবিদদের দিন শেষ হয়ে এসেছে- এখনও যদি আপনার মতো একজন বিচক্ষণ আইনজীবী পরিবর্তনের এই বিষয়টি বুঝতে না পারেন তাহলে বুঝতে হবে- আপনার জন্য রাজনীতি নয়, রাজনীতি ইস্তফা দেওয়াই হবে এ মুহূর্তে বুদ্ধিমানের কাজ।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতোই আরেকজন ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেন। আপনার সঙ্গে রাজনীতি করারও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে আমার। সংবিধান প্রণেতা বলে ড. কামাল বিখ্যাত হলেও তার চরিত্রের মধ্যে রয়েছে দ্বৈত স্বভাবের প্রবণতা। তিনিও যখন যেখানে সুবিধা পান সেখানেই হাজির হয়ে জয়ধ্বনি দেন। নিজেকে তিনি এতটাই বড় আর বুদ্ধিমান ভাবেন যে, ভোটে দাঁড়ালে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। তিনি দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিন্তু তার বর্তমান অবস্থান পুরোটাই আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের বিপক্ষে। আইন বিশেষজ্ঞ ড. কামাল এখন বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি থেকে পুরোপুরি নির্বাসিত। তিনি যে দল গড়েছেন সারা দেশে সে দলের কর্মী বা সমর্থক এতই নগন্য যে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও দেখা যাবে কিনা সন্দেহ।

ড. কামাল হোসেন যখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন তখন তিনি ল’ মিনিস্টার, ফরেন মিনিস্টার, পেট্রোলিয়াম মিনিস্টারই শুধু নন, রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে তিনি আওয়ামী লীগকে নয় বরং নিজেকেই ধ্বংস করেছেন। ব্যারিস্টার মওদুদ কিংবা ড. কামাল হোসেনদের এদেশে ভোট নেই, কিন্তু পত্র-পত্রিকায় এরা খুবই সরব। বাস্তবে এরা কিছু না করতে পারলেও কথায় কথায় গণঅভ্যুত্থান বা বিকল্প শক্তি গড়তে এদের জুড়ি মেলা ভার। এরা বাংলাদেশের মানুষকে উপকার করতে না পারলেও এদেশের মানুষের দুরবস্থাকে আরো শোচনীয় করতে এদের তুলনা নেই।

‘বিকল্পধারা’ পার্টি তৈরি করে যিনি বাংলাদেশকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি হলেন বিএনপির পরিত্যক্ত নেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ডা. চৌধুরী আপনার নিশ্চয়ই রেল লাইন দিয়ে দৌড়ানোর স্মৃতি মনে আছে, বঙ্গভবন থেকে আপনাকে যে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয়েছিল আশাকরি সে কথাও আপনার ভুলে যাওয়ার কথা নয়। আপনার যদি আত্মসম্মানবোধ থাকে তাহলে আপনার উচিত রাজনীতি বাদ দিয়ে স্বপেশায় মনোযোগ দেয়া। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন আপনার দলে কর্মী সংখ্যা অঙ্গুলিমেয়, অথচ আপনি যখন এদেশের রাজনীতিতে নিজেকে ফ্যাক্টর বলে মনে করেন তখন আপনার কাণ্ডজ্ঞান দেখে ভীষণ লজ্জিত হই। আপনি এবং আপনার মতো আরো যারা এখন রাজনীতি করছেন, আপনাদের এখন রাজনীতি থেকে অবসর নেয়া দরকার। জীবনে শুধু ছুটে চলা নয়, কখনো কখনো থামতেও হয়।

যারা থামতে জানে না, তাদের জন্য দুর্ঘটনা অবধারিত। জানি না আপনার বা আপনাদের এই বার্ধক্যকবলিত জীবনেও কোনো দুর্ঘটনা ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে কিনা। আপনারা কখনো আর্মির সঙ্গে আঁতাত করেন, কখনো হাত মেলান রাজাকার-মৌলবাদীদের সঙ্গে। কখনো বিদেশি শক্তির পায়ে চুমু খান, কখনো গালাগাল দেন বিদেশি শক্তিকে। আপনারা জোটেও থাকেন আবার একলা একলা ভোট করারও জিকির তোলেন। মানুষ আপনাদের কথায় এক পয়সাও দাম দেয় না এখন। যারা মুহূর্তে মুহূর্তে ভোল পাল্টায় মানুষ তাদের কখনোই বিশ্বাসভাজন মনে করে না।

বাংলাদেশের রাজনীতির ওল্ড ক্লাউনরা আপনারা হয়তো ভাবছেন আপনারা এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আপনাদের ভাবনা মোটেই ঠিক নয়। ইতিহাসে চালাক ও প্রতারকরা কখনো স্থান পায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেরে বাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবুন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান এমনি এমনি স্থায়ী আসন পাননি। এর জন্য মৃত্যু পর্যন্ত তাদের সাধনা করতে হয়েছে, তারা কখনোই দেশ ও দলের সঙ্গে প্রতারণা করেননি। আর প্রতারণা করেননি বলেই আজ তারা প্রত্যেকেই নমস্য।

সুবিধাবাদীরা তাৎক্ষণিকভাবে লাভবান হয় বটে কিন্তু ইতিহাসে এরা দণ্ডিতই থেকে যায়। আগামী দিনের ইতিহাস কর্ম অনুযায়ী যাকে যে স্থান দেয়ার তাকে সেখানেই রাখবে। সুতরাং ভবিষ্যৎ ইতিহাসের কথা স্মরণ করে হলেও এদেশের কিছু রাজনীতিকের আচরণ সংশোধন করা দরকার। বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে দূষিত বলেই মনে হচ্ছে। এই দূষণের দায় তাদেরকেই নিতে হবে এখন যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এক সময় আমিও রাজনীতি করতাম। এখন করি না। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় সরে এসেছি। প্রত্যেককেই একটি নির্দিষ্ট সময় পর অবসর নিতে হয়। এদেশের যারা বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন তারা আর কত রাজনীতি করবেন? এবার দয়া করে অবসর নিয়ে জাতির প্রতি এবং নিজের প্রতি সুবিচার করুন।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন অনেকটাই ব্যবসায়ী এবং দুর্বৃত্ত কবলিত। রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অনুপ্রবেশ যথাসম্ভব বন্ধ করতে হবে। রাজনীতি যখন টাকার কাছে, শক্তির কাছে নত হয় তখন সত্যিকার ত্যাগীদের জন্য রাজনীতি করা কঠিন হয়ে যায়। অনেক ত্যাগী নেতাই নির্বাচন এলে দলীয় মনোনয়ন পেতে বঞ্চিত-ব্যর্থ কেবল অর্থাভাবের কারণে। আওয়ামী লীগের দুটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থেকে জীবনে এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। এখনও তা-ই দেখছি।

বাংলাদেশের রাজনীতি সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। সৎ, যোগ্য ও ত্যাগী নেতারা যখন রাজনীতি করবেন তখনই সুস্থ হবে এদেশের রাজনীতি। এখন যারা বড় বড় কথা বলছেন সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রবর্তন করা অসম্ভব। কেননা এরা নিজেরাই সুস্থ-স্বাভাবিক নন, যারা নিজের দল ভেঙে, নিজের দলের সর্বনাশ করে, নিজের স্বার্থ নিয়ে কেটে পড়ে তাদের কাছে সুস্থ রাজনীতি আশা করা অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কি হতে পারে? আমি আওয়ামী লীগের অন্ধ সমর্থক নই বরং তীব্র সমালোচক। আওয়ামী লীগের ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখলে আমার কলম কখনোই সে সবের সমালোচনা না করে ছাড়ে না। এ জন্য জীবনে আমি কম খেসারত দেইনি, তবু নিজের লাভ না দেখে সত্যে অটল রয়েছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সর্বক্ষেত্রে সাফল্যের যে ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছে এবং তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই নজিরকে যারা গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে ভুণ্ডুল করার চেষ্টা করে প্রকারান্তরে তারা দেশকে পিছিয়ে নিতে চান বলেই মনে হয়। সরকারি দলের উদ্দেশে বলতে চাই, শুধু ভালো ভালো কথা বললেই হবে না, সেই কথা বাস্তবে কার্যকর করে দেখাতে হবে।

ঘরে ঘরে যেতে হবে এবং সত্তরের মতো নির্বাচনী জোয়ার তুলে আগামী নির্বাচনের বৈতরণী পার করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলেই নেমে আসবে ভয়াবহ দুর্যোগ। সেই কথা স্মরণে রেখে- শক্ত হাতে দমন করতে হবে ছদ্মবেশী ও ষড়যন্ত্রকারীদের। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ- এর গতিমুখ যারা বদলাতে চায় তারাই দেশ ও উন্নয়নবিরোধী। সময় এসেছে দেশবিরোধী ওল্ড ক্লাউনদের রুখে দাঁড়াবার। বাংলার মানুষ এসব ভাঁড়দের রুখে দাঁড়াবেই।
– লেখক: রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এফএইচ