ঐক্যফ্রন্টে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে টেক্কা দিতে গণফোরামের নেতৃত্বে বিএনপি, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠন করা হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এর নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগের এক সময়ের নেতা ড. কামাল হোসেন। কিন্তু এই ঐক্যফ্রন্টের ওপর বিএনপি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করছেন দলটির একাধিক নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েক নেতা বলেন, দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান বিদেশে রয়েছেন। নিয়মানুসারে এখন মূল নেতৃত্বে রয়েছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিন্তু তিনি এখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সব সিদ্ধান্ত আসে ঐক্যফ্রন্ট থেকে। এটা বিএনপির মতো একটা বড় দলের জন্য শুভকর নয়। তাদের অভিযোগ ড. কামাল, মাহমুদুর রহমান মান্না, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও আ স ম আবদুর রব অনেক বড় নেতা। তারা ব্যক্তি নন, প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ কথাও তো ঠিক যে- তাদের দলের তেমন জনসমর্থন নেই। কমিটিও নেই সিংহভাগ জায়গায়। বিএনপি একটি বড় দল। সব সময় জোটের নেতৃত্বে থাকে বড় দল। এখানে ঘটেছে তার উল্টো। সব সিদ্ধান্ত ঐক্যফ্রন্ট থেকে আসতে হবে কেন? বিএনপি নিজে সিদ্ধান্ত দেবে। তার কর্মীরা কাজ করবে। সব কিছুর জন্য ফ্রন্টের নির্ভর করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা তারা ভেবে দেখার অনুরোধ জানান। তবে বিএনপির শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ঐক্যফ্রন্টের পরিধি বাড়ছে: নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দাবিতে ফের রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে বাম-ডানসহ সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দল নিয়ে বৃহৎ মোর্চা গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এরই মধ্যে ফ্রন্ট নেতারা দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করেছেন। রোজার মধ্যেই এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে বলে জানা গেছে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর বেশ কয়েকটি বাম রাজনৈতিক দল এবং একাধিক ইসলামী দল রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলেছিল। মূলত এসব দল এ ফ্রন্টে যোগ দিতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। আর এর পেছনে কাজ করে যাচ্ছেন বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের অন্য শরিক দলগুলোর নেতারা। ফ্রন্ট নেতারা মানবকণ্ঠকে জানান, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ক্ষমতাসীনদের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। ফ্রন্টকে শক্তিশালী করার কাজ এগিয়ে চলছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি উত্তর দেননি। তবে তিনি বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হয়েছে। প্রয়োজন পড়লে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পরিধি আরো বাড়তে পারে। তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। তবে এতে আমরা আশাহত নই। যেসব দল গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চায়, তাদের সকলের সঙ্গে আমরা আলোচনা করব।

ফ্রন্ট নেতারা মনে করছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা উত্তরণে ফ্রন্ট ও বিএনপির বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোও নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। সবাই ঐক্যবদ্ধ না হলে আওয়ামী লীগ সরকার প্রবর্তিত নির্বাচনের ধারায় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করছেন। এমন একটি অবস্থায় আপনা-আপনিই বৃহৎ রাজনৈতিক মোর্চা গড়ে উঠবে। জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনে অনিয়মের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সোচ্চার রয়েছে সিপিবি-বাসদসহ ডান-বাম ঘরানার বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ঐক্যফ্রন্টের গণশুনানিতে এসব দলের মধ্যে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদ নেতা খালেকুজ্জামান, বজলুর রশিদ ফিরোজ, বাসদ (মুবিনুল) নেতা মুবিনুল হায়দার চৌধুরী, সুধাংশু চক্রবর্তী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির মোশরেফা মিশু, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের মোশাররফ হোসেন নান্নু এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কৌশলগত কারণে বাম নেতারা এই গণশুনানিতে যাননি। তবে তাদের সঙ্গে কর্মসূচি পালনের ঐক্য গড়ে উঠতে পারে বলে ফ্রন্টের এক নেতা জানান।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির এক নেতা বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে ভবিষ্যতে কোনো আন্দোলন গড়ে উঠলে তখন ঐক্য হতেই পারে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সব আসনে হাতপাখা প্রতীকে প্রার্থী ছিল ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের। সারা দেশে দলটির নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে তারা আন্দোলনে রয়েছেন।

সূত্র জানায়, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ এ রকম আরো কয়েকটি দলকেও ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচিতে নিয়ে আসা হতে পারে। বিএনপির শীর্ষ এক নেতা জানিয়েছেন, রমজানের মধ্যেই নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে নতুন প্রস্তাবনা দেয়া হতে পারে। তারা আশা করছেন, সরকার মেয়াদ পূরণের আগেই সব রাজনৈতিক দলের দাবি মেনে নিয়ে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে।

অন্যদিকে সোমবার ঐক্যফ্রন্ট স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে নতুন কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হয়। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে আরো কী কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায় তা নিয়েও সিদ্ধান্ত হয়। বিগত দিনগুলোতে বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠকও নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়ে আসছে। বৈঠকে দলের কারাবন্দি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নতুন কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা হয়। খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে বিএনপি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে কি না এবং সংসদে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, এগুলো গুজব। বিএনপির সংসদে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ঐক্যফ্রন্টের একমাত্র ভরসা রাষ্ট্রের জনগণ। আমরা আশা দেখছি আমরা পরিবর্তন আনতে পারব। তিনি আরো বলেন, আমরা সারা জীবন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। সব সময় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছি। বাংলার মানুষ কখনো বন্দুকের কাছে মাথা নত করেনি, আগামীতেও করবে না।

মানবকণ্ঠ/এআর

Leave a Reply

Your email address will not be published.