ঐক্যফ্রন্টের গণসম্মিলন ৬ ফেব্রুয়ারি

ঐক্যফ্রন্টের গণসম্মিলন ৬ ফেব্রুয়ারি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবার নেমেছে আন্দোলনে। হামলা ও মামলার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন থেকে মাঠ দখল করতে না পারা জোটটি এবার আন্দোলনে নিয়ে ভিন্ন কৌশল। নির্বাচনকে সামনে রেখে গঠন হওয়া জোটটি এবার চেষ্টা ভোটে অনিয়ম ও কারচুপির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার। এ লক্ষ্যে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজন করতে যাচ্ছে ‘গণসম্মিলন’। ইতিমধ্যেই ঠিক করা হয়েছে গণসম্মিলনের ভেন্যু। গণসম্মিলনে আমন্ত্রণ পাবে জামায়াত ছাড়া প্রতিটি রাজনৈতিক দল। গণসম্মিলনে সকলের মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছে ঐক্যফ্রন্টের একটি সূত্র। গতকাল বৃহস্পতিবার ৬ ফেব্রুয়ারির গণসম্মিলনকে সফল করতে বৈঠক করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যরা। তবে বৈঠকে ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীর কিংবা বিএনপির কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

বৈঠক শেষে ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির শীর্ষ নেতা জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন ৩০ ডিসেম্বর যে নির্বাচন হয়েছে তাতে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। এই নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে গণসম্মিলন করা হবে। এই আন্দোলনে সব মানুষের অংশগ্রহণের অংশ হিসেবে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, অবস্থান কর্মসূচি পালনের কথাও ভাবছে ঐক্যফ্রন্ট। এ ছাড়া নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রক্রিয়াও চলছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টর স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু মানবকণ্ঠকে বলেন, সবার মতামত নিয়ে আমরা আমাদের করণীয় ঠিক করতে এ ‘গণসম্মিলনের’ আয়োজন হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দলকেই এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হবে। এ ছাড়াও আমন্ত্রণ করা হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে সৃষ্ট সংকট সমাধানে সবার মতামত নিয়েই ঐক্যফ্রন্ট এগোতে চায় সামনের দিকে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সূত্রে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছরের অক্টোবর মাসে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয়, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জেএসডিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়নে গঠন করা হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ফ্রন্টের নেতৃত্বে ছিলে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। নানা নাটকীয়তা শেষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নজিরবিহীন ভাবে পরাজিত হয় জোটটি।

ফ্রন্টের নেতাদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীনদের হামলা ও মামলার কারণে তারা ভোটের মাঠে প্রচারণায় নামতে পারেননি। এমনকি ভোটের দিনও কেন্দ্রে যেতে পারেননি তাদের প্রার্থী ও ভোটাররা। নজিরবিহীন কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮ আসনে জয়লাভ করেছে।

এদিকে ভোটের পরেও হামলা ও মামলার ভয়ে মাঠে নামতে চায়নি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তারা আন্দোলনে নিয়েছে ভিন্ন কৌশল। ঐক্যফ্রন্ট যাচ্ছে শান্তিপূর্ণ বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে কারচুপির ভোটের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা।

নির্বাচনের পর গত ৮ জানুয়ারি ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে ৩টি কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেন নেতারা। কর্মসূচি ৩টি মধ্যে ছিল গণসম্মিলন, নির্বাচনী সহিংসতায় সিলেটের বালাগঞ্জে নিহত ছাত্রদল নেতা সায়েম আহমদ সুহেলের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের খোঁজখবর নেয়া এবং বিভিন্ন জেলায় জেলায় সমাবেশ করা। ইতিমধ্যে গত সোমবার ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, জেএসডির সভাপতি আসম রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দীকিসহ শীর্ষ নেতারা বালাগঞ্জের ছাত্রদল কর্মী সায়েম আহমদ সুহেলের বাড়িতে গিয়ে পরিবারকে সহমর্মিতা জানিয়েছেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সূত্রে জানায়, গণসম্মিলনের জন্য প্রাথমিকভাবে তিনটি ভেন্যু ঠিক করা হয়েছে। এগুলো হল— রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন, কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন ও গুলিস্তানের মহানগর নাট্য মঞ্চ। গতকাল বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএমপি কমিশনারের কাছে আবেদন জানানো হয়। অনুমতি পাওয়ার পর যে কোনো একটিতে অনুষ্ঠিত হবে এই গণসম্মিলন। এর আগে শুরু হবে আমন্ত্রণপত্র ছাপা ও বিতরণের কাজ।

গণসম্মিলনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো এবং বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকেও আমন্ত্রণ জানানো হবে। ইতিমধ্যে একটি তালিকাও তৈরি করেছে জোটটি।

জামায়াতে ইসলামী বাদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ বাম প্রগতিশীল ঘরানার অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের মতে, সবার উপস্থিতি সংলাপকে কার্যকর করবে।

সংলাপে রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, চিকিত্সক, লেখক, সাহিত্যিক, এনজিও প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হবে।

জামায়াতকে আমন্ত্রণ না জানানো প্রসঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জামায়াতে ইসলামী কখনোই ছিল না। এখনো নেই। গণসম্মিলনেও জামায়াত থাকছে না। জামায়াত ছাড়া নির্বাচনে যে সব দল অংশ নিয়েছে তাদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানুষ ৩০ নভেম্বর ভোটের নামে প্রহসন দেখেছে। মধ্যরাতে ভোটের বাক্স ভরে রাখা হয়েছে। দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় এসব খবর উঠে এসেছে। এই ভোট ডাকাতি এবং প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একটু সময় প্রয়োজন। আমরা সেই সময়টা নিচ্ছি। সংলাপের আয়োজন করতে যাচ্ছি। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। তারা সবাই কথা বলবেন, মতামত দেবেন। সবার মতামত নিয়ে আমরা আমাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

তিনি আরো বলেন, জনগণ ক্ষুব্ধ। তারা এই অবিচার মেনে নেবে না। আজ হোক, কাল হোক এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেই তারা।

অন্যদিকে রাজনীতির মাঠের বিরোধী শিবিরে আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল যোগ দিতে পারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। এদের সিপিবি ও বাসদের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক বাম জোট এবং ইসলামী আন্দোলন ঐক্যফ্রন্টের যোগ দিতে পারে বলে একাধিক সূত্রে মানবকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে।

ভোটের কারচুপির অভিযোগ এনে গণতান্ত্রিক বাম জোটও নামছে আন্দোলনে। ঘোষণা করেছে তাদের কর্মসূচি। গত শুক্রবার নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রর্থীদের নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে গণশুনানি করে বাম জোট।

জোটির শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মানবকণ্ঠকে বলেন, আমরা ৩টি কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। কর্মসূচিগুলো হলে- গণতদন্ত কমিশন গঠন করে ভোটের অনিয়মগুলো তদন্ত করা। গণতদন্ত কমিশন স্বাধীনভাবে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে ভোটের অনিয়মের চিত্রগুলো তুলে আনবে এবং তার রিপোর্ট পেশ করবে, ঢাকা নানা পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় জনসভা ও কর্মিসভা করে মানুষকে সচেতন করবে গণতান্ত্রিক বাম জোট।

ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাম জোট ঐক্যফ্রন্টের যোগ দেয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো আলোচনা হয়নি।

তবে যোগ দেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, যারা বিরোধী শিবিরে রয়েছে তারা একসঙ্গে রাজপথে আন্দোলন করলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোল করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

মানবকণ্ঠ/এসএস