এবিসিকে হারানোর ৪০ দিন আজ

এবিসিকে হারানোর ৪০ দিন আজ

এবিসি, মানে আবু বকর চৌধুরী। দৈনিক মানবকণ্ঠের সদ্য প্রয়াত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তিনি। দেখতে দেখতে কাজ পাগল এই মানুষটাকে হারিয়েছি ৪০ দিন হয়ে গেল। অথচ মনে হচ্ছে এই বুঝি আমাদের বকর ভাই এসে হাঁকডাক শুরু করবেন। এই বুঝি মাথার চুল এলোমেলো করে বলবেন আরো নিউজ লাগবে। গত ১৫ জানুয়ারি ভোরে রাজধানীর ধানমণ্ডির বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। দ্রুত ইবনে সিনা হাসপাতালে নেয়া হলেও চিকিৎসকদের আওতার বাইরে চলে যান তিনি। চিকিত্সকরা ঘোষণা করেন তিনি আর নেই।

আসলে তিনি আছেন, আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, থাকবেন সব সময়। তার কাজের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন তিনি। আমি আমার পরের প্রজন্মের কাছে গর্ব করে বলতে পারব আমি আবু বকর চৌধুরীর অধীনে সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছি। এই ক্ষণজন্মা কাজ পাগলের অধীনে কাজ করা অনেক প্রতিবেদক ও সহ সম্পাদক এখন বড় বড় গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ বড় বড় পদে কাজ করছেন। আর সেই আবু বকর চৌধুরীর অধীনে আমি নিউজরুম সামলেছি, এটা আমার জন্য বড় পাওয়া।

বকর ভাই এমন একটা মানুষ ছিলেন যিনি কাজ ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। সকাল সকাল অফিসে ছুটতেন, গভীর রাত পর্যন্ত নিউজরুমে মগ্ন থাকতেন। সংবাদের শিরোনাম, ছবির ক্যাপশন আর নিউজরুমের মানুষগুলোই ছিল তার আপনজন। নিজের জন্য কোনো সময়ই ছিল না তার।

গত প্রায় সাত বছরে একদিনও ছুটি নেননি তিনি। প্রতিদিন অফিসে না আসলে যেন তার ঘুমই আসত না। সম্পাদক হয়েও সবার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশেছেন, হৈচৈ করেছেন। পরম মমতায়-ভালোবাসায় নিউজরুমের সবাইকে আগলে রেখেছেন। আর এই মানুষটির জন্যই মানবকণ্ঠের সাবেক হয়ে যাওয়ারা এখনো মানবকণ্ঠের নিউজরুম মিস করেন।

কাছের মানুষজন তাকে ভালোবেসে এবিসি বলে ডাকত। একদিন এই এবিসি নামের রহস্য ও ইতিহাসও শুনিয়েছেন নিজ মুখে। আমাদের এবিসি আমাদের প্রিয় বকর ভাই যাকে সবাই আবু বকর চৌধুরী নামে চেনে তিনি আর আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন না।

পেশাদারিত্ব সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য বকর ভাই বলেছিলেন তার বাবাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে তিনি অফিসে চলে এসেছিলেন। আর গত ১৫ জানুয়ারি বকর ভাইকে কবরে শুইয়ে দিয়ে আমি অফিসে এসেছি। আপনি যেখানেই থাকুন এটা নিশ্চই দেখেছেন আপনার নবীন পেশাদারিত্ব ভুলে যায়নি। আপনার শোকে পাথর হয়ে গেলেও পত্রিকা প্রকাশের কথা ভুলে যায়নি। আপনার অবর্তমানে নিউজরুম সামলেছে সেই আপনার মতো করেই। আপনাকে হারিয়েছি ৪০ দিন হলো। আপনার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। দোয়া করি ওপারে ভালো থাকবেন।

আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি রোববার রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন নিউপল্টন মসজিদে বাদ আসর আবু বকর চৌধুরীর মাগফিরাতের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। আবু বকর চৌধুরী: ১৯৬৪ সালের ২১ জুন রাজধানী ঢাকার গ্রিন রোডে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা আবদুল হালিম চৌধুরী ও মা রাজিয়া খাতুন। নয়-ভাই বোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ম্যানেজমেন্টে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর করেন। ২০১১ সালের ১ অক্টোবর দিল আফরোজার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। আবু বকর চৌধুরী ১৯৯১ সালে ‘সাপ্তাহিক প্রত্যয়ন’ পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। কাজের ধারাবাহিকতায় পরের বছর তিনি ‘সাপ্তাহিক খবর’-এর নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৯৫ সালে ‘আজকের কাগজ’-এ সহযোগী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। এক সময় ‘আজকের কাগজ’ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে ‘আমাদের সময়’ পত্রিকায় যোগ দেন। ওই বছরের অক্টোবরে তিনি ‘সকালের খবর’-এ বার্তা সম্পাদক ও ২০১১-এর এপ্রিলে ‘সমকাল’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ২০১২ সালে তিনি বার্তা সম্পাদক হিসেবে ‘দৈনিক মানবকণ্ঠে’ যোগদান করেন। এরপর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদকের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তিনি নির্বাহী সম্পাদক হন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে পুনরায় তিনি দৈনিক মানবকণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস