এবারের নির্বাচনে ‘বড় ফ্যাক্টর’ সোয়া দুই কোটি তরুণ ভোটার

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘বড় ফ্যাক্টর’ হিসেবে দেখা দিয়েছে দেশের সোয়া দুই কোটি তরুণ ভোটার। এদের মধ্যে এবারের নির্বাচনে প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন প্রায় সোয়া এক কোটি তরুণ। নির্বাচনী বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাদের ভোটই পাল্টে দিতে পারে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ। এ কারণে দেশের বড় দুটি জোটই এই নতুন তরুণ ভোটারদের দিকে নজর রাখছেন। তরুণ ভোটারদের কথা চিন্তা করেই এবারের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছে রাজনৈতিক দলগুলো বলে জানা গেছে।

নির্বাচনী বিশ্লেষকরার মনে করেন, সম্প্রতি দেশে সংঘটিত হওয়া বেশ কয়েকটি অরাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে তরুণদের অংশগ্রহণ বিস্মিত করে অনেককে। তাদের সৃজনশীল আন্দোলনগুলো নাড়া দেয় দেশের কোটি মানুষের হৃদয়কে। কোটা সংস্কারের আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও তরুণদের সমর্থন ছিল। এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে আন্দোলনে নামে তরুণরাই। আন্দোলনটিও সফল হয়। সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা ৩৫ করার দাবিতেও মাঝে সোচ্চার ছিলেন তরুণ সমাজ। আসন্ন নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে ওই তরুণ প্রজন্ম এমনটাই ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সোয়া দুই কোটি। যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে। এ ছাড়াও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন প্রায় সোয়া কোটি ভোটার। এবারের নির্বাচনে প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন তারা। গড় হিসাবে দেশে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ১০৫ এবং নারী ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন। ২০১৮ সালে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫৪৫ জন। ভোটারের এ সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে ভোট দেবেন ১ কোটি ২১ লাখ ৭৭ হাজার ২১৪ জন।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, তরুণ ভোটাররা আগামী সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভ‚মিকা রাখবেন। কারণ মোট ভোটারের প্রায় চারভাগের একভাগ তরুণ। যাদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কে ধারণা রাখেন। দেশের উন্নয়ন বিবেচনায় তারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। তাই এবার তরুণদের ভোট যে দল এবং প্রার্থী বেশি পাবে, তাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে।

ইসির তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের সময় ভোটার ছিল ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ জন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে নবম সংসদ নির্বাচনের সময় দেশে মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার। নবম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত গত ১০ বছরে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৫ লাখের মতো ভোটার অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তালিকায়। এ সময় ভোটার বেড়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ ৫৫ হাজার ৩৭৮ জন। যাদের মধ্যে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৭ হাজার ২১৪ জন ভোটার প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।

ভোটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল মোট ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার ৬২৯ ভোট। আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল ২ কোটি ২৭ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ ভোট। সেবার নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন যে, তরুণ ভোটাররা আওয়ামী লীগের এই জয়ে বিরাট ভ‚মিকা রেখেছিল, যার ধারা বজায় ছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও।

এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চলতি মেয়াদের শেষ ভাগে এসেও তরুণরা নিজেদের দাবি আদায়ে একত্রিত হন। গত অক্টোবরে সরকারি চাকরিতে প্রবেশে কোটা সংস্কারের দাবিতে মাঠে নামেন প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীরা। যাদের অধিকাংশই একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। সরকার তাদের দাবি মেনে নিয়ে কোটা পদ্ধতি বিলুপ্ত করে।

এরপর চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ ভাগে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবিতে মাঠে নামে স্কুলের শিক্ষার্থীরাও। এসব শিক্ষার্থী ভোটার না হলেও তাদের আন্দোলনে প্রায় সবাই সমর্থন জানান। সরকারবিরোধীদের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনে ইন্ধন ও গুজব ছড়ানো হয়। তবে সেই আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও দাবি পূরণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয় সরকার।
এসব তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তৈরি করছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে ইশতেহার। ভিশন-২০৪১-এর আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত করেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। আগামী ইশতেহারে জাতিকে টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাবে দলটি। সেই সঙ্গে থাকবে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার অঙ্গীকার। অর্জন ও ব্যর্থতার পাশাপাশি শুধরে নেয়ার লক্ষ্যে তুলে ধরা হবে ভুলগুলোও। শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তবায়নের রূপরেখাও থাকবে নির্বাচনী ইশতেহারে।

‘দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে, আনবে পরিবর্তন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’, ‘জনগণ এ রাষ্ট্রের মালিক’- এমন প্রত্যয় নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কথা মাথায় রেখে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমানোর ঘোষণাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে থাকছে কৃষকের স্বার্থ, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের কৌশল ও ঘোষণা। কিছু ‘অপআইন’ সংশোধন আর পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য বন্ধের পরিকল্পনাও থাকছে ইশতেহারে। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে তরুণদের। তরুণদের একাংশের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করার অঙ্গীকার করা হবে, অবসরের বয়স বাড়ানো হবে।

শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী সংস্কার করা হবে চাকরিতে প্রবেশের কোটা, কমানো হবে ইন্টারনেটের দাম। এ ছাড়া পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিনের নৈরাজ্য বন্ধে থাকছে বিশেষ অঙ্গীকার। গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া কার্যকর করা, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মতো পরিবহন খাতকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। যেমন- লাইসেন্স, ফিটনেস ইত্যাদি প্রতিটি জেলার অফিস থেকে দেয়া হবে। এগুলো প্রদানের ক্ষমতা থাকবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। তবে সরকার ‘বোর্ড সুপারভাইজার’ হিসেবে থাকবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আমল মজুমদার জানান, ২০০৮ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে কিন্তু তরুণরাই ভোট দিয়েই নির্বাচিত করেছিল। দিনবদলের ইশতেহারে বিশ্বাস রেখে ওই সময় তরুণ ও নিরপেক্ষ ভোটাররা বর্তমান সরকারকে ভোট দিয়েছিল বলেই তারা জয়ী হয়েছে। বর্তমান তরুণরা অনেক সচেতন। তারা নিজেদের কর্মসংস্থান ও সমান অধিকারের বিষয়ে বেশি সচেতন। তাদের বিশ্বাসযোগ্য ইশতেহার যে দল দিতে পারবে, সে দলই তরুণদের কাছে টানতে পারবে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ