এখন মুখ বন্ধ রাখাই ভালো!

এখন মুখ বন্ধ রাখাই ভালো!

কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবি আদায় করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েছে রাজাকার। মেধাবী সন্তান হয়েছে কুলাঙ্গার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগের ছাত্র তরিকুল ইসলামকে অচল পা নিয়ে হাসপাতাল ছাড়তে হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ তার চিকিৎসা দেবে না। কেন? এমন কুলাঙ্গার রাজাকারের চিকিৎসা কেন দেবে সরকারি মেডিকেল কলেজ? সংস্কার আন্দোলনের আরেক নেতা রাশেদ খানের বাবাকে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ হুমকি দিয়ে বলেছেন, কেমন সন্তান জন্ম দিয়েছেন? সে তো একটা কুলাঙ্গার। যদি আন্দোলন থেকে ছেলেকে ফিরিয়ে না আনেন তাহলে তাকে গুম করে দেয়া হবে। সংস্কার আন্দোলনের আরেক নেতা ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র তারেক আদনান ২ জুলাই রাত থেকে নিখোঁজ। আরেক নেতা মাহফুজ কোথায় কেউ বলতে পারে না। তরিকুলকে ছাত্রলীগ নেতারা কীভাবে পিটিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিস্তর ছবি রয়েছে। যারা পিটিয়েছে পুলিশ তাদের কাউকে গ্রেফতার করেনি। উল্টো যাদের পিটিয়েছে তাদেরই গ্রেফতার করেছে। হয়রানি হামলা মামলায় জেরবার সংস্কার আন্দোলনের নেতারা এখন এসব ভোগান্তি থেকে রেহাই চান। এই হল বর্তমান বাংলাদেশের লাবণ্যময় সুশাসনের নমুনা। স্বাধীন দেশের পুলিশ, জনগণের ট্যাক্সে চলা প্রশাসন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যার প্রধান দায়িত্ব তার কর্মকাণ্ড আর কথাবার্তা শুনে এই রাষ্ট্রটিকে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ছাড়া আর কী বলা যায়? এসব দেখেও আপনি চুপ করে থাকবেন কিন্তু তারপরও আপনিই গণতন্ত্রের পক্ষের, প্রগতিশীলের পক্ষের, সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষের বুদ্ধিজীবী।

তারপরও ধরে নিচ্ছি, আপনিই প্রগতিশীল ঘরানার একজন কেউকেটা বুদ্ধিজীবী। ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের পর্ব থেকে শুরু করে নব্বই দশকের স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন এবং তারও পরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের একজন জান লড়িয়ে দেয়া সৈনিক আপনি। প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে কোনো না কোনো শিষ্য সাগরেদ আপনার পাঁচ দশকের দৌর্দণ্ড সংগ্রামী ভূমিকার কথা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ সাধন পর্বে আপনি কি নায়কোচিত ভূমিকা রেখেছিলেন তা স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। শুনেছি, সেই ষাট দশকে শুরু হয়েছে প্রগতি নিয়ে আপনার সংগ্রাম, যা চলছে এখনো। শুনেছি, বাংলাদেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে প্রতিটি দ্রোহে আপনি প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছেন। শুনেছিই কেবল। দেখার কপাল হলো না। আপনার মতো নামজাদা সেলিব্রেটি বুদ্ধিজীবী সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে একটি ন্যায্য কথা বললে এই মুহূর্তে অত্যাচারিত ছাত্রদের পক্ষে অনেক বড় সহায় হতো। আমরা আশা করেছিলাম, কোটা সংস্কারের ন্যায্য আন্দোলনের পক্ষে যারা বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীর ছবি-সেøাগান ধারণ করেও জামায়াত শিবিরের কর্মী হিসেবে আখ্যা পেয়ে এখন পুলিশের তোপের মুখে আছে তাদের হয়ে অন্তত একটি বাক্য আপনি উচ্চারণ করবেন। কিন্তু না। পেটোয়া ছাত্রলীগের মতো, ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর মতো ছদ্ম প্রগতিশীলের মতো, দলীয় ক্যাডারের মতো আপনিও ভাবছেন আন্দোলনকারীরা জামায়াত-শিবিরের মদতে চলছে। মনে মনে যদি আপনি নাও ভাবেন অন্তত মুখে আপনি তাই উচ্চারণ করেন। কারণ ইতিমধ্যেই আপনি বিক্রি হয়ে গেছেন। হয় কোনো প্লটের কাছে, নয়তো কোনো পদ-পদবির কাছে, নয়তো কোনো পুরস্কারের কাছে। সরকারি সুবিধা বলয়ে প্রবেশের পর আপনার পক্ষে সত্য উচ্চারণ কঠিন বটে। ছাত্রদের আন্দোলনের পক্ষে আমরা বরং এমন কিছু শিক্ষককে দেখেছি যারা তথাকথিত তারকাখচিত বুদ্ধিজীবী নন। তবে নামের পাশে তারা সংযুক্ত হওয়ার চেয়ে সাধারণ মানুষের মনে সম্মান পাওয়া অনেক বড়। সুবিধাবাদের বলয়ে প্রবেশ করে যেসব বুদ্ধিজীবী ইতিমধ্যেই বিপুল ক্ষমতা এবং প্রভাব অর্জন করেছেন তারা অর্জিত ক্ষমতা এবং প্রভাব ধরে রাখার জন্য জনমানুষের চাহিদার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। বাঘ যেমন একবার নরমাংসের স্বাদ পেলে বারবার পেতে চায়, দলীয় বুদ্ধিজীবীরাও তাই। ক্ষমতার ননী মাখন সর খেয়েছেন। এখন কেবল ক্ষমতারই গুণ গাইতে পারবেন। জনগণের নয়। আমরা যারা নবিস, গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের ইতিহাস সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না তারাও এইটুকু অন্তত জানি যে পছন্দের দল ক্ষমতাসীন হলেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম শেষ হয় না। গণতন্ত্রের আন্দোলন আমৃত্যু, আজীবনের। গণতন্ত্র এমন চিরদিনের, কখনো শেষ হওয়ার নয়।

দুই.
বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতার বলয়ভুক্ত হলে কি অসুবিধা? পলায়ন মনোবৃত্তিসম্পন্ন ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা বাড়লে কোনো পেশাজীবীরাই তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারে না। চিকিৎসকরা রোগীকে রোগী এবং মানুষ বিবেচনা না করে রাজাকার না হলেও রাজাকার বিবেচনা করে চিকিৎসা না দিয়ে ছেড়ে দেয়।

আমরা দেখেছি কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনে এসেছেন বঙ্গবন্ধু আর প্রধানমন্ত্রীর ছবি হাতে। তারা সেøাগানও দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর নামে। এতেও মুক্তি মেলেনি। মাত্র একটি ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলন করায় রাজাকার বনে গেছে অথচ ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পর আন্দোলনকারীরা কিন্তু বাড়ি ফিরেও গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার দু’মাস পরও কোটা সংস্কার বিষয়ে যখন প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি তখন তারা সংবাদ সম্মেলন করে কেবল প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছে। ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী যেদিন কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন সেদিন ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল কোটা সংস্কারের পক্ষে তারা জোর দাবি তুলেছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তাহলে কেন এই হামলা? ছাত্রলীগ ছাত্রলীগের কাজ করেছে। অন্তত নতুন প্রজš§ ছাত্রলীগকে বরাবর যে ভূমিকায় দেখেছে এখনো সেই পেটোয়া বাহিনীর ভূমিকাতেই দেখছে। কিন্তু বুদ্ধিজীবী হিসেবে আপনার ভূমিকা কী? সত্যি কথা বললে বলতে হয় আপনার ভূমিকা ছাত্রলীগের চেয়েও খারাপ। দলীয় ক্যাডারের চেয়েও শোচনীয়। এখন সময় এই মন্তব্যকে ‘জামায়াতী মন্তব্য’ হিসেবে আখ্যা দেয়ার। যে জামানায় প্রকৃত জামায়াতীরা প্রগতিশীল সেজে বসে থাকে সে জামানায় কেউ সত্য কথা বলার অপরাধে জামায়াতী হবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সামাজিক গণমাধ্যমে যারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলামের ভাঙা পা এবং ভাঙা হাড়ের এক্স-রের ছবি দেখেছেন, যারা তরিকুলকে নির্মমভাবে হাতুড়ি, রামদা, লাঠি দিয়ে পেটানোর দৃশ্য দেখেছেন, ‘নারীবাদী’ ছাত্রলীগের হাতে একজন ছাত্রীকে পেটানোর অমানবীয় দৃশ্য দেখেছেন এবং এসব কিছুতে আপনারা নীরবতা লক্ষ্য করেছেন, তারা আপনার সম্পর্কে কী ধারণা করে? এদের চোখে আপনি ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর অধিক কি? গণতন্ত্র প্রগতিশীলতা বুদ্ধিজীবিতাসহ আরো কিছু শব্দের আভিধানিক অর্থ বদলে দিয়েছেন আপনি। আপনি হলেন সেই বুদ্ধিজীবী যিনি নিজের পছন্দের দল বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় দেখার জন্য গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও অর্থ বদলে দেন। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ঘরে ঘরে মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সামান্য কিছু বাদ দিয়ে অধিকাংশ দরিদ্রকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয়েছে। কমিউনিটি হাসপাতালের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেছে। দেশের সব মানুষ তিনবেলা খেতে পারছে। অভাব, দারিদ্র্য, অন্যায়-অবিচার, অনিয়ম এসব কিছু মানুষ এখন আর উপলব্ধি করে না। তাহলে মানুষ কেন পরিবর্তন চাইবে? প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে এই প্রশ্ন উত্থাপন করেন সরকার সমর্থক গোষ্ঠী। টক শোতে বিরোধী দলের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলেও দাবি করেন। সরকার সমর্থক গোষ্ঠীর এই দাবির সঙ্গে আমরা একমত। ক্ষমতাসীন দল এবং তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা যা যা বলেন তার সব সত্য সব ঠিক। ‘চমৎকার, চমৎকার, চমৎকার যে হতেই হবে হুজুরের মতে অমত কার’? সবকিছু চমৎকারভাবে চলছে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আমরাও এ বিষয়ে একমত।
এই দাবির বিপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে গুম কিংবা হেনস্থা হওয়ার অথবা সম্ভ্রম হারানোর কোনো ইচ্ছাই আমাদের নাই।
– লেখক: কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এসএস