এখন আমি কী করব?

রহিমা আক্তার মৌ :
আমাদের সমাজে প্রায় ৯০ শতাংশ নারী পরিবারে, অফিসে, এলাকায় বা সমাজে কোনো না কোনোভাবে সমস্যা মোকাবিলা করেই যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অন্যকে প্রশ্ন করতে না পেরে নিজেকেই প্রশ্ন করে- এখন আমি কী করব? এই প্রশ্নটা যেন কমবেশি সব নারীর।
অনেক সময় দেখা যায়, নারীরা পারিবারিকভাবে নির্যাতনের জন্য চাকরিও করতে পারে না। একদিকে চার দেয়ালের বন্দি জীবন অন্যদিকে নির্যাতন। নির্যাতনের রূপ বিভিন্নভাবে হয়। শারীরিক, মানসিক, আর্থিক বিভিন্নভাবে। কখনো স্বামী, কখনো শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ, দেবর আবার কখনো যৌথভাবে। নির্যাতনের প্রতিবাদ জানালে নারীকে অবাধ্য নষ্টাও বলে দোষারোপ করে অথচ একদিন এই দুই পরিবারের সদস্যরা মিলে একটি সুন্দর বন্ধন তৈরি করেছিল। তখন তাদের রূপ-চেহারা থাকে এক রকম আর বিয়ের পর পাল্টে যায় তাদের চেহারা। উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত সব জায়গায় হচ্ছে নারী নির্যাতন। যখন বস্তি এলাকায় চিৎকার, চেঁচামেচি শুনি তখন জোর গলায় বলি আরে বস্তিতে থাকে ঝগড়া করবে না তো কী করবে। নিম্নবিত্তদের এসব দেখা বা শোনা যায়, মধ্যবিত্ত নারীরা মানসম্মানের কথা আর সন্তানের মঙ্গলের কথা ভেবে নীরবে নির্যাতন সহ্য করে আর উচ্চবিত্ত নারীরা যারা স্বামী বা স্বামীর পরিবারের ওপর নির্ভরশীল নয় তারা প্রতিবাদ করতে চায় এক পর্যায়ে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয়।

কেসস্টাডি:
নিপা মজুমদার- এইচএসসি পাস করার পর পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয় দুই পরিবারের সম্মতিতে। বিয়ের পর নিপা লেখাপড়া করতে চায়, কিন্তু স্বামী ফিরোজ পড়াতে রাজি না এটা সরাসরি বলে না তবে কথায় কথায় বলে একা ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। আর পড়া হয় না নিপার। ফিরোজ সাহেব নিজেও কলেজে নিয়ে যায় না। নিপা বলে, তাহলে আমাকে পলিটেকনিকেলে ভর্তি করে দাও, তাও করা হয় না। ফিরোজ সাহেব অফিসের অনেক কাজ বাসায় নিয়ে আসতেন। ওইগুলো নিপা সারাদিন বাসায় বসে করে। নিপাকে কখনো হাত খরচের জন্য ৫০/৫০০ টাকাও দেয়া হয়নি। বিবাহিত ১৭ বছরের মাঝে ৩ সন্তানের জননী নিপা। সন্তান, সংসারের কাজের জন্য আর অফিসের কাজ করতে পারে না। ফিরোজ সাহেব টাকার বিনিময়ে অন্যদের হাতে কাজ করিয়ে নেয়। সন্তানদের ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো টিচার রাখেনি নিপা। নিজেই দেখাশোনা করে। তার মধ্যে ঘরে টিচার আনার ব্যাপারেও রয়েছে ফিরোজ সাহেবের অনীহা। নিপা ছুটে চলে টিচারদের বাসায়। প্রতিদিন সকালে ফিরোজ অফিসে যায়, আসে রাতে। এমনকি ছুটির দিনেও ওনাকে প্রাইভেট কাজগুলোর জন্য বাইরে ছুটতে হয়। মাঝে মধ্যে ওদের কথা কাটাকাটি হয়। ভালো খাবার, ভালো মাছ-মাংস, ফল-ফলাদি ফিরোজ নিজে খেতে চান। বাসায় ফল-ফলাদি এনে ঘোষণা দেন এইগুলো আমার জন্য। কেউ খাবে না। একটা কথা প্রায় পরিবারের সবাইকে (স্ত্রী ও সন্তানদের) শুনিয়ে দেন তা হলো আমাকে বাঁচতে হবে, আমি না বাঁচলে তোমাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। কথায় কথায় বিবাহিত স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেন। থাকেন ঢাকা শহরের ৩০/৩২ হাজার টাকা দামের ফ্ল্যাট বাসায়। একপর্যায়ে বাচ্চাদেরও কথা শোনাতে দ্বিধা করে না উনি। খাবার টেবিলে বসে নিপাকে এভাবে আবারো কথা বলতে শুরু করলে নিপা বলে ‘ঠিক আছে আমি চাকরি করব। আমি চাকরিতে গেলে তোমার সন্তানরা কার কাছে, কীভাবে থাকবে তার ব্যবস্থা কর। উত্তরে ফিরোজ বাবু বলেন না, এখানে থেকে চাকরি করা চলবে না। চাকরি করবে তো এখান থেকে বের হয়ে যাও। শুরু হয় দুইজনের কথা কাটাকাটি। একপর্যায়ে নিপার বড় সন্তান এসে তাকে বলে মা তুমি চুপ কর। কথা যত বলবে পরিবেশ ততই খারাপ হবে। ফিরোজ সাহেব প্রায়ই নিপার নামে মিথ্যা অপবাদ দেয়। কথাগুলো যে মিথ্যা তাও ওদের সন্তানরা জানে। নিপার সন্তানরাও বোঝে ওর বাবার ওপর মা নির্ভর বলেই বাবার অত্যাচার সহ্য করছে। তার পরও অবুঝ সন্তানরা বলে মা তোমাকে মেনে নিতে হবে। নিপা ফিরোজ সাহেবকে বলে চাকরি যখন করতে দেবে না তাহলে আজকের পর থেকে কখনো আমাকে বসে বসে খাবার কথা বলতে পারবে না। নিপা বিবাহিত জীবনে ১৭ বছরের মাথায় এসেও বুঝতে পারে না যে ফিরোজ বাবু ওর কাছে কী চায়। মাঝে মধ্যে ভদ্রলোক ফিরোজ আর তার মা আলোচনায় বসেন।
বাড়িওয়ালার ছেলে বিয়ে করেছে পুরো ফ্ল্যাট সাজানোর সব পেয়েছে কিন্তু আমি কী পেলাম? নিপা এখন কী করবে পথ খুঁজে পায় না। ও জানে ওর অবর্তমানে এখানে সন্তানদের অনেক সমস্যা হবে আর ৩ সন্তান নিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গাও নেই সমাজে। যে বাবা স্ত্রীর সামনে সন্তানদের খাবার ব্যাপারে স্বার্থপরতা দেখায় সে বাবা সন্তানের জন্য নিজেকে কতটুকু উৎসর্গ করবে তা নিশ্চয়ই পাঠক বুঝতে পারে। নিপার এখন কী করা উচিত তাও জানে না। ইদানীং কিছু ঘটনার পর বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন লেখায় বলছেন ‘সন্তানের কথা ভাবার আগে বা সঙ্গে নিজের কথা ভাবতে হবে, ভাবা উচিত। মাঝে মধ্যে নিপার ভয় হয় যদি কখনো ওর জীবনে নেমে আসে কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনা তখন কী হবে ওর এবং কী হবে ওর সন্তানদের। নিপারও একটা প্রশ্ন- আমি এখন কী করব?
হেলেনা আক্তার- হেলেনা সরকারি জব করলেও বেতন কম পায়, যা দিয়ে পুরো পরিবার চালানো যায় না। হেলেনার স্বামী বলে ওকে চাকরি ছেড়ে দিতে। কিন্তু এত লোকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যে চাকরি সে পেল তা ছাড়তে কষ্ট হচ্ছে। মাঝে মধ্যেই ঘরে সমস্যা লেগে থাকে। চাকরি করে নিজে যে বেতন পেত তাই দিয়ে ভালোই চলত তার। সন্তাদের কথা ভেবে বাধ্য হয়ে হেলেনা তার সরকারি চাকরি ছেড়ে দিল। এখন আগের মতো নিজের হাতে টাকা-পয়সা থাকে না, স্বামীর কাছে চাইলেও অনেক কথা শুনতে হয়। হেলেনা বলে, চাকরি গেল, টাকাও গেল। নিজে যেন তার কাছে বাড়তি লোক। আগে নিজে ইনকাম করেছি, যা কিছু প্রয়োজন ছিল নিজেই নিয়ে আসতাম। কিন্তু এখন কিছুই পাই না। নিজের যোগ্যতাও নেই যেন কিছু করার। সন্তানের কথা শুধু মাকেই ভাবতে হয়। সন্তানের জন্য সব ছাড়তে হয়।
হেলেনার প্রশ্ন এখন আমি কী করব?
হেলেনা বা নিপা নয়, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারীর এমন প্রশ্ন। আমাদের দেশ নারী নেতৃত্বে চললেও বাস্তবে নারীর পথ মসৃণ নয়।