এখনো আমরা নিঃশেষ হয়ে যাইনি: জাফর ইদ্রিস

তরুণদের মাঝে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
তরুণরা আজকাল প্রবীণদের মানতে চান না। প্রবীণদের প্রতি তরুণদের শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। এর কয়েকটি কারণগুলো হচ্ছে: (ক) কর্ম ব্যস্ত বাবা-মার কাছ থেকে সন্তানরা যথেষ্ট পরিমাণ সান্নিধ্য পায় না বিধায় বখে গিয়ে শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলে। (খ) আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন, আকাশ সংস্কৃতির খারাপ দিকটির প্রতি আকর্ষণে শালিনতা বোধের অপমৃত্যুর আর একটা কারণ। (গ) রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরাও তরুণদের শ্রদ্ধাবোধ হরণের জন্য অনেকটা দায়ী, যেমন, এক নেতা অন্য নেতার চরিত্র হননের জন্য অঙ্গসংগঠনের তরুণদের অপব্যহার করে প্রতিপক্ষকের বিষোদ্গার করে, যা তরুণদের চরিত্রে প্রতিফলন ঘটে এবং তা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষীয় শিক্ষকদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করে। নেতা-নেত্রীর অশোভন বাক-ভঙ্গিও তরুণরা অনুকরণ করে।
তরুণ-প্রবীণের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
তরুণ-প্রবীণদের মধ্যে শ্রদ্ধা ও স্নেহের সেতুবন্ধের ব্যাপক চির ধরেছে, তা পুনরুদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক ও পারিবারিক একটা আন্দোলনের সূচনা করতে হবে। তরুণদের স্নেহের বন্ধনে বাঁধতে হবে, প্রতিপক্ষকে
প্রতিহত করতে বাবা-মা বা রাজনৈতিক নেতা সবাইকেই তরুণদের অপব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে, আর মাদক থেকে তাদের দূরে রাখতে হবে। শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে সম্প্রীতি, শ্রদ্ধা ও স্নেহের সেতুবন্ধে আবদ্ধ করতে হবে, এ জন্য বাবা-মা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
আপনি যখন নবীন ছিলেন আপনার জীবনযাপনে নানা ধরনের সংকট, হতাশা কাজ করেছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ থেকে আপনি কীভাবে বেরিয়ে এসেছেন?
আমার নবীন সময়টায় অর্থনৈতিক টানাপড়েনে কেটেছে। বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। আট ভাইবোন ছিলাম, চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি ছিল যৎসামান্য। লেখাপড়া করেছি ভাগিনার পুরনো বই দিয়ে কারণ ভাগিনা আমার এক ক্লাস উপরে পড়ত, বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেই তার বইগুলো নিয়ে আসতাম যার কারণে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেয়ার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। আজকের মতো সে সময় স্কুল থেকে বিনামূল্যে বই দেয়া হতো না। অর্থনৈতিক কারণে বিজ্ঞান নিয়ে পড়া সম্ভব হয়নি তাই বাণিজ্য বিভাগ বেছে নিতে হয়েছিল, যদিও ক্লাসে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়য়ের মধ্যে রোল থাকত। আই কম পাসের পরে ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজ বি কমে ভর্তি হয়ে ঢাকায় কষ্টে লজিং, টিউশনি আশ্রয় নিতে হয়েছে। বাকি কষ্টের কথা আর নাইবা বললাম। তবে আমি বর্তমানে যে অবস্থানে অবস্থান করছি তাতে স্রষ্টার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। বর্তমান তরুণ প্রজšে§র নানা ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, এসব অস্থিরতা থেকে তরুণদের বেরিয়ে আসতে আপনার পরামর্শ যদি কিছু থাকে বলুন?
বর্তমানে দেশে প্রবীণমুখী বিধিবিধানই বেশি কার্যকরী। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করছি। বাবা-মা ছেলে-মেয়েদের অনেক অর্থ ব্যয়ে লেখাপড়া করিয়ে উচ্চশিক্ষিত করছেন কিন্তু লেখাপড়া শেষে তারা চাকরি পাচ্ছে না, চাকরির পদ যথেষ্ট খালি থাকে না এর মূল একটা কারণ প্রবীণ চাকরিজীবীরা কৌশলে বারবার তাদের অবসরের মেয়াদকাল সরকার থেকে বাড়িয়ে নিয়ে স্বপদে থাকছেন, পদ আর খালি হচ্ছে না এবং নতুনরাও চাকরি পাচ্ছে না যার ফলে নবীদের ভেতর হতাশার আগুন জ্বলছে। আর একটা হতাশার কারণ হচ্ছে, কোটার সুষম বণ্টনের অভাবে নবীনদের অনেকে সরকারি চাকরি পাচ্ছে না, এটাও নবীনদের হতাশার আর একটা কারণ। বেসরকারি পর্যায়ও তেমন বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান হচ্ছে না আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্মমুখী শিক্ষা কোর্স চালু করলে শিক্ষিত নবীনরা কর্মমুখী হয়ে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
সন্তানরা বাবা-মা থেকে দূরে সরে থাকছে। বাবা-মার সঙ্গে সন্তানদের বন্ধুত্ব কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
সন্তান প্রথম যাদের অনুকরণ করে তারা হলেন মা-বাবা, আদর্শ বাবা-মার সন্তান আদর্শ হওয়ার কথা কিন্তু যখন বাবা-মায়ের সান্নিধ্য থেকে ছেলেমেয়েরা বঞ্চিত হয় তখনই তাদের মধ্যে একটা নিঃসঙ্গতা চলে আসে এবং একটু সুখ বা আনন্দের জন্য বিভিন্ন দিকে হাত বাড়িয়ে হাত পুড়ে ফেলে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানকে বাবা-মাদের সময় দেয়া দরকার এবং তাদের সুখ-দুঃখ শেয়ার করা এবং বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।
দিনের অন্তত একবার হলেও চায়ের টেবিলে বা খাবার টেবিলে সবাই মিলিত হয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বা তাদের চাহিদা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করা আর মন্দের কুফল নিয়ে সরব থাকা উচিত। সন্তানের প্রকৃত এবং আদর্শ বন্ধু হলো বাবা-মা।
আপনার সমবয়সী অনেকে আছেন নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেছেন, মানসিক টানাপড়েনের মধ্যে আছেন। তাদের অনুপ্রাণিত করার জন্য আপনার অভিমত যদি কিছু থাকে?
আমার সমবয়সী যারা তারা ষাটোর্ধ্ব, তাদের জীবন একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে গেছে, তাদের নতুন করে আশার বাণী শোনানোর কি থাকতে পারে, তারা ঘাত-প্রতিঘাতে এক কঠিন বাস্তবতায় অবস্থান করছেন। কর্ম অবসরে চলে এসেছেন। তবুও বলব এখনো আমরা নিঃশেষ হয়ে যাইনি, অবসরটা একটু মধুময় করার জন্য এবং কর্মজীবনের কর্মকে শারীরিক সুস্থতার মাঝে ধরে রাখার জন্য ছাদ কৃষি বা আঙ্গিনা কৃষিতে আত্মনিয়োগ করুন, গৃহপালিত পশু পালন করতে পারেন যেমন দুধের গাই, হাঁস, মোরগ সীমিতভাবে পালন করতে বা মজা পুকুরে মাছ ফেলে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারেন, তাতে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকবেন এবং নিঃসঙ্গতা দূর হবে, সময় কেটে যাবে।
আপনার সময় আর এখনকার সময়ের দাবি অনুযায়ী তরুণদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতে চান?
আমাদের তরুণ সময় এবং বর্তমান সময়ের পার্থক্য আমি নিম্নরূপে বিশ্লেষণ করলাম-
(ক) আমাদের সময় মাদকের ব্যাপকতা ছিল না যা এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে।
(খ) আমাদের সময় আকাশ সংস্কৃতির ভালো-মন্দ কোনো দিকই ছিল না, বিজ্ঞান প্রযুক্তির বর্তমান ভালো দিকটি তরুণদের সফলতার নেয়ামক হিসেবে কাজ করছে আবার খারাপ দিকটি অনেক তরুণ-তরুণীকে উচ্ছন্নে নিয়ে যাচ্ছে।
(গ) আমাদের সময় রাজনীতিবিদদের নিঃস্বার্থ একটা রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ ছিল তা আজ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং ভুল রাজনীতি তরুণদের নৈতিকতাকে কলুষিত করছে এবং বিপথগামী করছে। আমাদের সময় ছাত্র রাজনীতির একটা আদর্শ ছিল, ’৫২, ’৬৯, ’৭১-এ তারা জাতির কর্ণধার বা কাণ্ডারি হিসেবে কাজ করছে এখন রাজনৈতিক ক্রীনড়ক হিসেবে কাজ করছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে তরুণদের বিপথগামিতা থেকে পথে আনা এক প্রকার অসম্ভব।
তবে আশার কথা হলো সম্প্রতি তরুণদের ভেতর দেশ মেরামতে যে বাণী জাতি অবলোকন করল তাকে নতুনভাবে আশান্বিত করছে।
আপনার জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে কিছু বলেন।
দক্ষিণের একটা অনাগ্রসর বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা জেলা বরগুনায় আমার জš§। যখন ঢাকায় প্রথম আসি তখন হাতে গোনা দুই-একজন এলাকার পরিচিত লোক ছাড়া কাউকে চিনতাম না, সেখান থেকে শুরু হয় নাগরিক জীবন। সময়টা ছিল ১৯৭৬-এর ২৫ মে। আমি একজন ব্যবসায়ী, সেই থেকে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। বর্তমানে বাসাবো কদমতলায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছি। আমার তিন মেয়ে এক ছেলে, স্ত্রী ও আমি, এই ছয়ে পরিবার। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় মেয়ে ডাক্তার, জামাইও ডাক্তার, মেজ মেয়ে কানাডা পিএইচডি করছে অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির ওপর, তৃতীয় মেয়ে এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়ে বারডেমে, ছেলে দ্বিতীয় বর্ষে নটর ডেমে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে। স্ত্রী জায়েদা বেগম এজিএম জনতা ব্যাংক মতিঝিল, ঢাকা। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী।