এক ধাক্কায় ব্যয় কমল ১৬০৯ কোটি টাকা

কনসালটেন্সি অঙ্গেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। ফসলের ক্ষতি পূরণ বাবদ ৩ কোটি টাকা। কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ কেনার জন্য ৬০ লাখ টাকা, ক্যামেরার জন্য ৫ লাখ টাকা, নদীর তীর রক্ষাবাঁধ অঙ্গে ৮১৩ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়। এ ছাড়া প্রকৌশল জরিপে ব্যয় ১০ কোটি টাকা, সরকারি ও বেসরকারি ড্রেজারের জন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।

এভাবে প্রতিটি অঙ্গে খুবই বেশি ও অযৌক্তিকভাবে ব্যয় প্রাক্কলন করে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বুরিশ্বর-পায়রা নৌপথ এবং পুরনো ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার, পুনর্ভবা, তুলাই এবং সোলা নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার নামে প্রকল্পটির এ চিত্র। তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে ব্যয়ের এ অসঙ্গতি ধরা পড়ে। যা রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়। এ নিয়ে ব্যাপকভাবে হই-চই পড়ে।

পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পরিকল্পনা কমিশন বাধ্য হয়ে ৩ মন্ত্রণালয়কে নিয়ে ৯ সদস্য বিশিষ্ট ব্যয় যুক্তিযুক্তকরণ একটি কমিটি গঠন করে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত আইএমইডির নেতৃত্বে সম্প্রতি ওই কমিটির অনুষ্ঠিত সভায় ব্যয় কমিয়ে প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এক মিটিং বা সভাতেই ওই অযৌক্তিক ব্যয় কমানো হয়েছে ১ হজার ৪০৯ কোটি টাকা বা প্রায় ২৭ শতাংশ।

এ ব্যাপারে চানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ-আইএমইডির সচিব মো. মফিজুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, আইএমইডিকে যে দায়িত্ব দেয়া হয় তা ভালোভাবে পালন করার চেষ্টা করা হয়। রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়রোধ করতে সবসময় সঠিকভাবে কাজ করে আইএমইডি। উন্নয়ন কাজের অনিয়ম দূর করা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই আমাদের। কিন্তু যে কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে, কাজ শুরুর আগে, চলমান অবস্থায় এমনকি প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও মনিটরিং করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশ করে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়। তা আমলে নিলেই সরকারের অনেক উপকারে আসে, কাজের কোয়ালিটি রক্ষা করা যায়, অর্থের অপচয়ও রোধ করা যায়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইএমইডির প্রতিবেদন আমলে নেবে না নেবে না তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। আমাদের কিছু বলার নেই।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) প্রকল্পটি দিনাজপুরসহ অন্য জেলায় বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব-ডিপিপি তৈরি করে। তাতে ২৭টি অঙ্গ বা উপাদানে ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে। তা অনুমোদনের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে যাচাই-বাছাই করতে ২৬ এপ্রিলে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি-পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্পের প্রায় অঙ্গে ব্যয় খুবই বেশি বলে মনে হয়। তাই আইএমইডির নেতৃত্বে পানি মন্ত্রণালয় ও নৌ মন্ত্রণালয়ের ৯ সদস্য বিশিষ্ট ব্যয় যুক্তিযুক্তকরণ কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটি ৩ মাস বিভিন্ন অঙ্গের পরিমাণ ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ব্যয় কমিয়ে প্রাক্কলন করেছে ৪ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। ৮ জুলাই কমিটির ওই সভায় এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। একইসঙ্গে সভায় পিইসি সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বুরিশ্বর-পায়রা, দুধকুমার, এবং সোয়া ৩ নৌপথকে বাদ দিয়ে পুরনো ব্রহ্মপুত্র, পুনর্ভবা, তুলাই, ধরলা ৪টি নৌপথের ড্রেজিংয়ের জন্য ব্যয় যুক্তিযুক্তকরণ করা হয়। সভায় কর্মকর্তাদের জন্য বেতন-ভাতা ঠিক রাখা হলেও ভূমি অধিগ্রহণ ৮শ’ একরের জায়গায় দেড় একর করা হয়।

ফসলের ক্ষতি বাবদ ৩৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১০ কোটি টাকা করা হয়। পরামর্শক অঙ্গে ৮০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে প্রাক্কলন করা হয় ৩২ কোটি টাকা। নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধ অঙ্গটিতে ৮১৩ কোটি ১২ লাখ টাকার স্থলে ধরা হয়েছে ৪০৫ কোটি টাকা। অফিস বিল্ডিং নির্মাণ ও ভাড়া অঙ্গটিতে থোক ২০ কোটি টাকা ধরা হলেও ব্যয় যুক্তিযুক্তকরণ কমিটি ২০১৮ সালের রেট সিডিউল অনুযায়ী তা থেকে কমিয়ে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ের সুপারিশ করেছে। প্রকল্পে যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে প্রাক্কলন ঠিক না থাকায় তা ঠিক করে ধরা হয় ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে- ড্রেজিং কার্যক্রম। সমজাতীয় প্রকল্পে এ অঙ্গে ব্যয় প্রতি ঘনমিটার বেসরকারি ড্রেজিং ১৮০ টাকা এবং সরকারি ড্রেজিং ধরা হয় ১২০ টাকা। তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করে পিইসির সিদ্ধান্ত মোতাবেক সরকারিভাবে ১৮০ লাখ ঘনমিটারে ২৭০ কোটি টাকার বিপরীতে ২১৬ কোটি টাকা ধরা হয়। আর বেসরকারিভাবে ১ হাজার ২০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ে ২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার জায়গায় ১ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। একইভাবে সংরক্ষণ খননে ১ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকার জায়গায় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।

এভাবে প্রায় অঙ্গে বেশি ব্যয় মনে হওয়ায় কমিটি তা থেকে কমিয়েছে। এ ছাড়া বিবিধ খাতে ২১ কোটি টাকা রাখা হলেও সভায় ওই মিটিংয়ে কমিয়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। আর ক্যামেরা এবং টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম খাতের প্রয়োজন না থাকায় এ দুই খাতে যে ৩৯ লাখ টাকা বাদ দেয়া হয়। প্রকল্পের সব অঙ্গে ব্যয় কমানোর ব্যাপারে কমিটির সব সদস্য একমত পোষণ করায় তা চূড়ান্তভাবে প্রাক্কলন করা হয়েছে বলে নৌ মন্ত্রণালকে জানানো হয়েছে।

প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

মানবকণ্ঠ/এএএম