একুশে সংস্কৃতি দুর্ভাবনা ও সম্ভাবনার অকথিত অধ্যায়

ধুমধাম করে বইমেলা হয় দেশে। বলব ঢাকাতেই হয়। বাকি এলাকার বইমেলাগুলো কতটা সফল আর কতটা আসলে বহুমুখী এ নিয়ে তর্ক আছে। যদিও আমি মনে করি সেগুলোতে আন্তরিকতা অধিক। আছে অংশগ্রহণকারী ও পাঠকের ভালোবাসা। ঢাকায় ভালোবাসা থাকে না এমন বলছি না। তার চেয়ে বেশি আছে বাণিজ্যিক বিষয়। এটাও মন্দ নয়। মোটামুটি একমুখী দেশ আমাদের। একক হয়ে যাওয়া সবকিছুতে রাজনীতি অর্থনীতি সমস্যা সম্ভাবনা সব এখন তাই। ঢাকা দেশের রাজধানী। সেখানে না থাকলে জাতীয় লেখক, জাতীয় কবি, জাতীয় অভিনেতা কিংবা জাতীয় ব্যক্তিত্ব কিছুই হওয়া যায় না। এই এককেন্দ্রিকতা এখন রোগের মতো এবং এটাই দস্তুর।

বইমেলার আসল উদ্দেশ্য যে কী সেটা বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। চিত্তরঞ্জন সাহা মুক্তধারার হয়ে যে সামান্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন আজ তা মহীরুহ। আজ তার ব্যাপ্তি আন্তর্জাতিক। কিন্তু আমাদের ভাষা, আমাদের ইতিহাস, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এমনকি জীবনধারা কি আসলে বাঙালিয়ানার সঙ্গে যায়? কী হয়েছে আমাদের, যে আমরা আমাদের অতীত শক্তি ও গর্বের ওপর আস্থা রাখতে পারছি না? পারলে হঠাৎ করে পোশাকে, আহারে, কথায় এসব পরিবর্তন কি আসলেই ভাগ বসাতে পারত? ধর্ম বিষয়ে কিছু বলা মানে বিপদ টেনে আনা। তাছাড়া ধর্ম মানুষের স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত বিষয়। ধার্মিক মানুষ সমাজে আগে ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তাদের কোনো চিন্তা নেই। তারা জানেন তারা কী করেন। গোল বাধিয়েছে রাজনীতি আর প্রচার।

আকাশ সংস্কৃতির নামে খুলে যাওয়া জগৎ আমাদের আসলে কী দিচ্ছে আর কী কেড়ে নিচ্ছে তার একটা হিসাব না হলে এগোনো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। আওয়ামী লীগের আমল মানেই আমরা ধরে নেই সংস্কৃতির রমরমা সময়। কারণ তারাই মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি। তাদের নেতৃত্বে এদেশ স্বাধীন হয়েছিল। বাঙালির জীবনে শ্রেষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই দল আমাদের কপালে বিজয় চিহ্ন এঁকে দিয়ে ভীরুতার দুর্নাম ঘুচিয়েছে। উপমহাদেশে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো স্বাধীন হয়েছিল চুক্তির মাধ্যমে।

আমরা হয়েছি যুদ্ধ করে। রক্ত, ত্যাগ, সংগ্রাম, নারীদের সাহস ও ইজ্জত লুণ্ঠনের মতো ঘটনায় একদিকে যেমন শৌর্য আরেকদিকে আছে বেদনা কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমরা আমাদের দেশীয় দালালাদের রুখতে পারিনি। কত নামে যে তারা সক্রিয়। একটা নাম বিপদে পড়লে আরেক নামে বাজারে আসে তারা। বিএনপি নামের জনপ্রিয় দলটির প্রিয়তার কারণ খুঁজেছেন কখনো? এত ধাক্কা, এত বিপদ, এত কঠিন জায়গায় থাকার পরও কেন তারা আশা ছাড়ে না? কারণ তারা জানে তাদের মূল খুঁটি ককটেল রাজনীতি।

আমি বলব, এটাই পরিবর্তিত বাংলাদেশের সমাজচিত্র। কদিন আগে আমরা ডাকসাইটে মন্ত্রীকে দেখলাম, পাকিস্তানি ক্রিকেটারের বুকে ঢলে পড়তে। খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশাবেন না এই আরেক স্লোগান শুনে মনে হয় যেন ওই তারাই কথা বলছে যাদের স্লোগান বদলে দাও বদলে যাও। প্রশ্ন করেছেন কখনো? কে বদলে যাবে? কাকে বদলে দেবে? তারা কি কখনো পরিবর্তিত পোশাক বাঙালি থেকে ধার্মিক হতে চাওয়ার কথিত প্রবণতা থেকে বদলানোর কথা বলেন? না, কখনো বলেছেন আর যাই করা হোক একাত্তরের দুশমন দেশ ও তাদের ঔদ্ধত্য রাজনীতির বিরুদ্ধে বদলানো চলবে না? বলেন না। কারণ দেশের সব দলে, সব রাজনীতিতে এই উপাদান আছে।

যার পরিচয় দিলেন ওই মন্ত্রী। তিনি কোনো খেলোয়াড়কে শুভেচ্ছা জানাতেই পারেন। গলাগলিও করতে পারেন। কিন্তু প্রটোকল ভুলে বুকে লুটিয়ে পড়া আর তার মাথায় সে খেলোয়াড়ের হাত বলে দেয় একজনের আকুতি আরেকজনের বুঝে নেয়া কতটা। এই হচ্ছে সমস্যা। বদলে যাওয়ার নামে এসব এখন জায়েজ।

যার হাওয়া আমাদের সংস্কৃতিতেও লেগেছে। দু’দিক ম্যানেজ করে চলা মানে দুই নৌকায় পা রেখে চলা জাতি আসলে বাংলাভাষা, সংস্কৃতি কিংবা আদর্শের দিক কতটা বহন করতে পারবে-সেটাই এখন দেখার বিষয়। তারুণ্য সবসময় চলতি হাওয়ার পন্থি। এটাই নিয়ম। যারা আমাদের দেশ স্বাধীন করেছিল, যারা আমাদের দেশকে গঠন করেছিল, যারা আমাদের সমাজকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল তাদের জীবন ও অতীত দেখুন। তারা মনেপ্রাণে বাঙালি ছিলেন। তাদের পোশাক, কথা বলা, লেখা সব ছিল বাংলায়। তাদের আশা, স্বপ্ন কতটা আন্তর্জাতিক ছিল তার প্রমাণ একুশে ফেব্রুয়ারি।

তার উদাহরণ মুক্তিযুদ্ধ। তার নিশান জাতীয় পতাকা। সে স্বপ্ন আজ সে পতাকার তলায় থেকে নষ্ট করেছি আমরা। বিজাতীয় বলতে এক সময় আমরা ইংরেজি, পরে উর্দুুকে ধরে নিতাম। তার বিরোধিতা করতাম। আর আজ? হিন্দি নিয়েছে তার জায়গা। আছে মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তানি আগ্রাসন-এসব আমাদের ভাষাকে ক্রমেই দুর্বল করে ফেলছে। আজ যে ইংরেজি বলা, লেখা বা পড়া হয় সেখানে রবিনসন ক্রুশো নেই। শেক্সপিয়ার নেই। হেমিংওয়ে নাই। আছে হলিউড বা হাল আমলে আমেরিকার বিকৃতি। এ নিয়ে মানুষ হওয়া যায় না। হওয়া যায় ব্যবসায়ী বা চাকরিজীবী। হওয়া যায় কর্পোরেট লিডার। এ বাস্তবতায় লেখালেখি, ছায়াছবি, নাটক, গান সবই আজ খপ্পরে। কার খপ্পরে, কোন খপ্পরে বলার দরকার দেখি না।

এখন ভাবার বিষয়, উত্তরণ কোথায়? কোথায় ভরসা আমাদের? বইমেলায় বই আসছে। মানুষ আসছে। টিভি ক্যামেরা ঘুরছে। তাতেই কি আমরা এগোচ্ছি বলে ধরে নিতে পারি? নবীনদের আপনি প্রশ্ন করে দেখুন তো। কারা ছিলেন একুশের শহীদ? কখন তারা প্রাণ দিয়েছিলেন, কেন তারা মারা গিয়েছিলেন? একশজনে একজনও সঠিক জবাব দিতে পারবে না। দেশের সব জায়গায় যে নতুন আক্রমণ, যে নয়া চক্রান্ত তা কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছাড়া কিছু না। এর আকারগ্রাসী সর্বনাশ আমাদের ঘরে ঘরে হানা দিয়েছে। মানুষ আসলে আর্থিক দিক ছাড়া বাকি সবকিছুতে তেমন ভালো নেই। বলতে পারা না পারার অনেক কারণ। মূল বিষয় একটাই- মানুষ ভরসা রাখতে পারছে না। তারা দ্বিধাগ্রস্ত। আসলে কোনটা সত্য? আমেরিকাপ্রীতি না আমেরিকাভীতি? যারা এদেশের বিরুদ্ধে রাজনীতি করে বলে গলা ফাটায় তাদের সন্তানদের সবাই থাকে সেদেশে। তারা নিশ্চিত নয় ভারত ভালো না খারাপ?

একদিকে ভারত তোষণ আরেকদিকে ঘৃণা। পাকিপ্রেমে হাবুডুবু খাওয়া মানুষ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে। কাঁদে, হাসে। এর মানে কী? এসব দ্ব›েদ্বর নিরসন না হলে সমাজ এগোবে না। দেশ এগোলেও রোহিঙ্গা যাবে না। গেলেও অপরাধ যাবে না। এসবের উত্তর চাই। তাহলেই বইমেলা সার্থক হবে। সার্থক হবে বাংলাদেশের মানবিক ও সামাজিক নৈতিকতা। বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি, বাংলাদেশ এখন একাকার নয়। রাজনীতি তাকে আপদগ্রস্ত করে রেখেছে। জানি না মুক্তি কোথায়?

আবার কি কোনো বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন কিংবা তেমন কাউকে আসতে হবে? নাকি তারুণ্যের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসবে একদল শক্তি? সে ভরসাই আমাদের শেষ পাথেয়। আমরা বিশ্বাস করি, নদী, চাঁদ, আকাশ, হাওয়া যেমন বাঙালি তেমনি আমাদের সংস্কৃতিও বাংলাময়। একদিন না একদিন সেই আমাদের পথ দেখাবে।- লেখক: সিডনি প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এএম