একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনগণের প্রত্যাশা

একাদশ জাতীয় নির্বাচন ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ভোট নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। এ পরিবর্তন যেন দুর্নীতিকে এগিয়ে না আনতে পারে। অব্যাহত উন্নয়নের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে হবে। উন্নয়নের অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে যাতে অন্যের পকেটে ঢুকতে না পারে সে দায়িত্ব কঠিনভাবে পালন করতে হবে জনগণকে।

যুগ যুগ ধরে যারা দুর্নীতির মাধ্যমে পকেট ভর্তি করেছে, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে এ জাতীয় প্রার্থীদের বয়কট করতে হবে। তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে রাজনৈতিক দল এবং জনগণকে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে যেসব দল অংশগ্রহণ করবে তারা যেন সৎ, যোগ্য, আদর্শবান, দেশপ্রেমিক লোককে মনোনয়ন দেন। নির্বাচনের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক প্রার্থীর সঙ্গে দলের সম্পর্ক। উন্নয়নের সঙ্গে দেশ ও জনগণের সম্পর্ক জড়িত। নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কেউ উন্নয়ন করতে পারে না। উন্নয়ন আর নির্বাচন দুর্নীতিমুক্ত না হলে সেখানে সঠিক উন্নয়ন জনগণ দেখতে পায় না।

যতই দিন যাচ্ছে ততই নির্বাচনী হাওয়া মাঠে বইতে শুরু করেছে। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেকেই শঙ্কা ও আতঙ্কের মধ্যে আছেন। নির্বাচন-পূর্ব কোনো সহিংসতা, অস্থিরতা বা রাজনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হয় কিনা? তবে এহেন কোনো অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বা কেউ সৃষ্টি করতে চাইলে তাদের পরিণাম হয়তো ভালো হবে না। জনগণই তাদের উচিত জবাব দিয়ে দিবেন। কেউ জনগণকে নিয়ে তামাশা বা টালবাহানা করতে চাইলে জনগণ তাদের অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে। পরিষ্কার পানিকে ঘোলাটে করে যদি কেউ ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করে বা নির্বাচনকে ঘোলাটে করে বা জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইলে প্রকারান্তরে জনগণ তাদের উচিত শিক্ষা দেবে। এক্ষেত্রে জনগণ তাদের সস্তা জনপ্রিয়তায় কোনো আন্দোলন বা সরকার উৎখাতের জন্য বেপরোয়া হয়ে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কাজে এগিয়ে আসবে না। ইতোমধ্যে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আগামী নির্বাচনের বিষয়ে বিভিন্ন মতামত দিয়ে যাচ্ছেন।

তাদের কেউ কেউ জোট ও ভোটের রাজনীতির কথা বলছেন, নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিবেশ ও পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছেন, সব আসনে জয়লাভে আকাক্সক্ষার কথা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার কথা বলছেন, কেউ কেউ জাতীয় নির্বাচন ও আন্দোলন নিয়ে কথা বলছেন এবং কেউ বা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ইত্যাকার বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক প্রশ্নে জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য ও মতামত দিয়ে যাচ্ছেন। তবে একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অধিকাংশ জনগণ যেভাবে ভাবছেন এবং যে আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দাবিতে সোচ্ছার তা নিম্নে তুলে ধরা হলো। জনগণ একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। যেখানে জনগণের স্বাধীন মতামত প্রতিফলিত হবে। জনগণ একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আশা করে।

আগামী নির্বাচন যেন প্রতারণা ও কারচুপিমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে জনগণ বরাবরই সেটা আশা করে। সে লক্ষ্যে জনগণ একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ একটি কমিশন গঠনের কথা বরাবরই বলে থাকে। কারণ স্বাধীন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করতে পারে। তারা কোনো দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না। শান্তিপ্রিয় জনগণ নির্বাচন নিয়ে সহিংসতা পছন্দ করে না। এ জন্য নির্বাচন কমিশন ভোটকেন্দ্রে কারচুপি বা কেউ সন্ত্রাসী আচরণ করলে তার ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এটাই জনগণের প্রত্যাশা। এছাড়া ভোটকেন্দ্রে কোনো নাশকতা ও গোলযোগ সৃষ্টির পাঁয়তারা করলে কমিশন তাকেও ছাড় দেবে না। ভয়ভীতি, হুমকি, অনুরাগ, বিরাগের বশবর্তী হয়ে নির্বাচন কেন্দ্রে কেউ দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা পক্ষপাতদুষ্ট কোনো আচরণ করলে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিক যথাযথ ব্যবস্থা করলে সাধারণ জনগণের ইচ্ছা পূরণ হবে। এছাড়া নির্বাচনের পূর্বে সব দলের অংশগ্রহণে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে-জনগণ তাই প্রত্যাশা করেন। এ যাবৎ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্বাচনে সন্ত্রাসী ও সহিংস কার্যক্রমসহ জালভোট ও কারচুপির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। আগামী নির্বাচনে জনগণ পূর্বেকার ঘটনাবলি পুনরাবৃত্তি চায় না। এছাড়া অতীতের নির্বাচনের মতো খারাপ নেতাকর্মী আছে বা অতীতের রেকর্ড যাদের খারাপ আগামী নির্বাচনে জনগণ তাদের অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আগামী নির্বাচন হবে অনেক চ্যালেঞ্জের। এই নির্বাচনে দলীয় অনেক ত্যাগী, স্বচ্ছ ও সততার পরীক্ষায় পরীক্ষিত ত্যাগী ও দীক্ষিত কর্মী হয়তো নমিনেশন পাবে কিন্তু তার প্রতিপক্ষ, বিরোধীপক্ষ বা বিদ্রোহী প্রার্থিতা ইত্যাদির কারণে সামনের নির্বাচনে কোনো বিশেষ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে সাংবিধানিক সংকট এড়িয়ে ঐক্য, সমঝোতা, সমন্বয়ের মাধ্যমে জোটবদ্ধ সরকার গঠন হতে পারে। সব সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কোনো অঘটনঘটনপটিয়সী এক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর যদি বিদেশি প্রভুদের সহায়তায় আঘাত হানতে চেষ্টা করে তা শক্তভাবে প্রতিহত করতে হবে। কেননা এ পর্যন্ত দেশের যত অর্জন হয়েছে এবং আমাদের যে সুনাম হয়েছে তাকে অক্ষুণœ রাখতে এর বিকল্প নেই। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী নির্বাচন একটি উদাহরণ সৃষ্টিকারী গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচন হবে আন্তর্জাতিক মানের এবং বিশ্বের এক রোল মডেল। একমাত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই সেটা আশা করা যায়। কেননা তিনি সমস্ত ক্ষমতা, লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে। তিনি ক্ষমতা, লোভ, লালসা, ধন, সম্পদের কাঙ্গাল নন, তিনি পরশ্রীকাতরও নন। তিনি উদার, মানবতাবাদী ও নির্ভেজাল ভালোবাসার মায়াবী সরোবর। তিনি একাধারে ধার্মিক, ন্যায়নিষ্ঠ, সৎ ও সততার পথিকৃৎ। প্রাপ্তির চেয়ে হারানোর পাল্লা যার ভারী তিনি তো কখনোই সস্তা প্রাপ্তির ধার ধারেন না।

যারা সস্তা প্রাপ্তির জন্য ব্যাকুল, যারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেন, জনগণকে নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, জনগণের পয়সা লুটপাট করেন তারা আজ কোথায়? নিশ্চয়ই তাদেরও বোধোদয় হবে। ঠকবাজ, প্রতারক ও ষড়যন্ত্রকারী চক্র আগামী নির্বাচনে প্রত্যাখ্যাত হবে। দেশপ্রেমিক, নিঃস্বার্থ, পরোপকারী ও মহানুভব ব্যক্তি এবং মেহনতি কর্মী ও নেতাকে সাধারণ জনগণ তাদের রায় দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। এটা মেনে নেয়ার মতো সৎ, সাহস ও বড় মন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আছে। কেননা তিনি পারিবারিক বলয়ে সেভাবেই গড়ে উঠেছেন। কোনো কারচুপি, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে শাসন-শোষণ করা তার স্বভাববিরুদ্ধ। দেশের প্রশাসন আজ অনেক শক্ত। আইনশৃঙ্খলার অবস্থা সুদৃঢ় ও মজবুত। এ অবস্থায় পানি ঘোলাটে করে কেউ সুবিধা নিতে চেষ্টা করলে তিনি বিপদে পড়ে যাবেন নিঃসন্দেহে। দেশে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনে ঢেলে সাজিয়ে আরো শক্তিশালী করতে হবে। সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন সবাইকেই তাদের পেশাদারিত্বের মর্যাদাকে অক্ষুন্ন রাখতে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবলীল নেতৃত্বে আগামী বাংলাদেশ হবে সুখী, সমৃদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ।

একাদশ জাতীয় নির্বাচন দেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব ও জনগণের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন। অতীতের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে এ নির্বাচন অধিক গুরুত্ব বহন করে। তাই দেশ ও জনগণ সরকারের স্বার্থেই দুর্নীতিবাজ কালো টাকার মালিক অসৎ শ্রেণির লোক ও দলকে বয়কট করার শপথ এখন থেকেই গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতির শক্তি দুর্বল হবে এবং মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। এ দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে দেশপ্রেমিক সব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে পালন করতে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই নির্বাচন ও উন্নয়ন জাতির জন্য সফলতা বয়ে আনবে। – লেখক: গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.