একই পেশায় বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

স্বপ্ন দেখে সবাই, পূরণ হয় ক’জনের? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা কি স্বপ্ন দেখে? দেখে, দেখতে শুরু করেছে! সে ধারণা পরিষ্কার হলো ইসমত নাজ ববির সঙ্গে কথা বলে। তিনি একই পেশায় বহুমুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহমুদ সালেহীন খান
তিনি ইসমত নাজ ববি। কর্মরত আছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীনস্থ বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডে। তিনি একই সঙ্গে মার্কেটিং বিভাগ, পিআরও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পিএ’র দায়িত্ব পালন করছেন সফলভাবে।

কর্মক্ষেত্রে নারীর কোন জায়গাটি চ্যালেঞ্জিং?
আমি কাজ করি আইটি সেক্টরে। বাংলাদেশের বৃহৎ আইটি প্রতিষ্ঠান। এই জায়গা ছাড়াও নারীদের জন্য কমবেশি সব পেশাতেই চ্যালেঞ্জ আছে। আমার মনে হয় কাজ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রযুক্তি এখন অনেক এগিয়ে। নারীরাও ঘরে বসে নেই। যারা বাইরে কাজ করছেন না, তারাও প্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইন ব্যবসা করছেন। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারটা জানতে হবে। অফিসগুলোর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার একটা দিক আছে। শুধু আইটি নয় কাজ করতে গেলে সব পেশাতেই নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুযায়ী। চ্যালেঞ্জ থাকবেই এটাকে সহ্য করার মতো মানসিক শক্তিও থাকতে হবে। মানসিক শক্তিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এটা সবার থাকে না। যাদের থাকে তারাই জয়ী হয়।
আপনার ক্যারিয়ারের পেছনের গল্পটা শুনতে চাই
স্বপ্ন তো অনেক ছিল। এইচএসসি পাস করার পর ইচ্ছে হয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে আর্কিটেক্ট হওয়ার স্বপ্ন ঘিরে ধরে, সংবাদ পাঠ, উপস্থাপনার প্রতিও আমার খুব আগ্রহ আছে। ২০০৫ সালে এটিএন তারকা নির্বাচিত হয়েছিলাম। চার বছর ধরে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলে কাজ করছি। আমি মূলত আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্টাডি করেছি এবং ১ বছরের ডিপ্লোমা ইন ইনটেরিওর ডিজাইন (অভ্যন্তরীণ নকশা) কোর্স সম্পন্ন করেছি এবং বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) এ কাজ করছি ৩টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে।
যৌতুক ও বাল্যবিয়ের কবলে পড়ে অনেক নারী আÍহননের পথ বেছে নিচ্ছে এ সম্পর্কে আপনার কিছু মন্তব্য কি?
নারীর মূল্যায়ন ও ক্ষমতায়নে বর্তমান সরকার অনেক কাজ করেছে তবুও প্রতিনিয়ত খবরের কাগজ খুললেই, এই দুটো সমস্যা আমাকে খুব ব্যথিত করে। আমি মনে করি এই দুটো ক্ষেত্রেই আইনের প্রতিফলন থাকতে হবে, কোনো ছাড় বা গ্রাম্য সালিশ দিয়ে ফল ভালো হবে না, অন্য কথায় নারী নির্যাতন বন্ধ হবে না। আরো একটা বড় কথা যে এনজিওগুলো এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমাজে সচেতনতা জাগানোর জন্য আরো নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। চৎব-চৎবমবহপু তে নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে অভিভাবককে সচেতন করতে হবে।
পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে নারীদের কাজ করার পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত?
আসলে কী নারী বা পুরুষ বলে কোনো কথা নেই। অফিসে কাজ করতে গেলে সমস্যা থাকবেই। আপনি যখন ভালো কাজ করবেন তখন নানা দিক থেকে বাধা দেয়া হবে। বাধাটা তৈরি হয় আশপাশে যারা কলিগ, বিশেষ করে সিনিয়র কলিগদের থেকেও নেতিবাচক প্রভাব থাকে। আবার অনেক সময় ব্যক্তিগত ইস্যু নিয়েও আশপাশের পরিবেশকেও ঘোলা করা হয়। নারীকে শুধু নারী হিসেবে দেখলে হবে না। মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা থাকতে হবে। একজন নারীকে অবশ্যই বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেছেন, কাজ করছেন একটা ভিন্ন মাধ্যমে। তাও একাধিক দায়িত্বে কাজের সমন্বয়টা কিভাবে করছেন, আর পড়াশোনার সঙ্গে কাজের সমন্বয়টা কিভাবে হচ্ছে একটু যদি বলতেন?
হ্যাঁ এটা একটা চ্যালেঞ্জের কাজ। কোম্পানির এমডি’র পিএ হিসেবে তার অফিসিয়াল কাজগুলোকে সুন্দর করে গুছিয়ে করা। আবার পিআরও হিসেবে সবার সঙ্গে সমন্বয় করা এবং পাশাপাশি কোম্পানির মার্কেটিংটাকেও শক্তিশালী করা আমার কাজ। আমি মূলত আর্টিটেক ইঞ্জিনিয়ার। চার বছর ধরে আমি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছি। তা বেশ সুনামের সঙ্গেই। আমি যেহেতু আর্টিটেক ইঞ্জিনিয়ার কোম্পানির বড় বড় কনফারেন্সের ডিজাইন আমি করে দেই। কুয়াকাটায় প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সাবমেরিন স্টেশনের যে অনুষ্ঠান হয় তার আমন্ত্রণপত্র আমার ডিজাইন করা। কোম্পানির যে কোনো অনুষ্ঠানেরও বিভিন্ন ডিজাইনের কাজও আমি করি। অফিসের ইন্টেরিয়রের কোনো বিষয় থাকলেও এটা আমার হাতের ছোঁয়া থাকে। বিদেশের কোনো ডেলিগেট এলে, মন্ত্রীদের বা আরো উচ্চপদের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কোনো মিটিং থাকলে কোম্পানি আমাকে সমন্বয়কারী হিসেবে পাঠায়। কারণ, তাদের এতটুকু বিশ্বাস হয়েছে আমি কাজটা সুষ্ঠুভাবে করতে পারব। গুছিয়ে কাজ করা, নান্দনিক উপস্থাপন এ বিষয়টা এসেছে আমার ভেতরে লালিত একাডেমিক ব্যাক গ্রাউন্ডের জন্য। আসলে প্রত্যেকটা কাজই গুছিয়ে করা যায় যদি কাজের মধ্যে সমন্বয়তা এবং চ্যালেঞ্জ নেয়ার মানসিকতা থাকে।
নারীদের ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
অনেক অনেক অনেক। আমি এই পর্যন্ত এসেছি আমার মায়ের অনুপ্রেরণার জন্য। মা আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন আর তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য স্থাপত্য শিল্প বেছে নেয়া। ছাত্র অবস্থা থেকেই আমি স্কাউট করেছি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছি। মিডিয়াতেও টুকটাক যা করেছি সবই আমার আম্মুর অনুপ্রেরণায়। আমি ভাগ্যবান যে শতভাগ সমর্থন আমার পরিবারের ছিল।
আপনার প্রজšে§র নারীদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতে চান?
আমার শুধু এতটুকুই বলা, নিজের মধ্যে আÍবিশ্বাস থাকতে হবে। একজন নারী চাইলেই পারেন লক্ষ্যে পৌঁছে তা সব নারীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। পাশাপাশি নারীদের সঙ্গে নিয়ে নিজের এবং সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। ইদানীং বিভিন্ন শ্রেণীর-পেশায় সমানভাবে কাজ করছেন আমাদের নারীরা। আমরা গর্ব অনুভব করি যখন দেখি আমাদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী, মাননীয় স্পিকার সবাই নারী। এতে আমরা শিখড়ে উঠতে উৎসাহ পাই। বাঙালি নারী হিমালয়ের চূড়ায় উঠে বাংলাদেশের পতাকা স্থাপন করেছে, তাই আমরা পারব, নারীরা সব কিছুতেই এগিয়ে যেতে পারবে, সব বাধা অতিক্রম করতে পারবে। যদি থাকে আÍবিশ্বাস।