উপজেলার ভোটে যেতে চায় না বিএনপি

একাদশ ভোটে ‘নজিরবিহীন’ পরাজয়ের পর আগামী মার্চে উপজেলা নির্বাচনের যে তফসিল আসছে, তাতে না যাওয়ার পক্ষে বিএনপি। দলটি এখন থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করারও সিদ্ধান্ত নিতে চায়। একাদশ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি বলে অভিযোগ বিএনপির। এর কারণে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও যে সুষ্ঠু হবে, তাতে বিশ্বাস নেই দলটির। এজন্য উপজেলার ভোটে না যাওয়ার পক্ষেই অধিকাংশ নেতা। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলাপ করে তাদের সমর্থনও আদায় করা হবে বলে জানা গেছে। এ জন্য বিগত দিনে বেশ কয়েকটি ঘরোয়া মিটিংয়ে বিএনপির নেতারা এ নিয়ে আলোচনা করেছে।

দলের একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবকণ্ঠকে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনে যাওয়ার কিংবা ও না যাওয়ার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়নি। তবে জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, এদেশে অতীতেও আর আগামীতেও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। তার প্রমাণ একাদশ সংসদ নির্বাচন। তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনে আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তারা ক্ষমতাসীনদের পক্ষে সরাসরি ভোট কারচুপিতে অংশ নিয়েছে। কেন্দ্রে পর্যন্ত বিরোধী দলের ভোটারদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য হুমকি-ধমকি দিয়েছে। এতে নির্বাচনের দিন ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার সাহস করেনি। যারা গিয়েছে, তারা ভোট দিতে পারেনি। ফলে একাদশ নির্বাচনের মতো উপজেলার ভোটে আওয়ামী লীগ একইপন্থা অবলম্বন করতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনা করে বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে থাকতে পারে বলে জানান বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী।

এদিকে নির্বাচন কমিশন মার্চ থেকে উপজেলা নির্বাচন শুরুর ঘোষণা দেয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নড়েচড়ে বসেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরাও এলাকায় তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। তবে বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা উপজেলা নির্বাচন নিয়ে নীরব রয়েছেন। দলীয় সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে ওই নির্বাচন বর্জন করার চিন্তাভাবনা করছে তারা। জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী সরকারের বর্তমান অবস্থান এবং দলের নাজুক পরিস্থিতিতে এই স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত হবে না বলে হাইকমান্ডকে জানাচ্ছেন তৃণমূল নেতারা।

সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জোটের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাও বর্জনের পক্ষে। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই আনুষ্ঠানিক বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে বিএনপি জোট। বিএনপি ও জোটের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিএনপি ও জোটের কয়েক নেতা মানবকণ্ঠকে জানান, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সংলাপে সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে বার বার ঘোষণা দিলেও নির্বাচনে ভয়াবহ কারচুপি হয়েছে। ফলে এ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়ার ইচ্ছা নেই তাদের। অংশ নিয়ে নির্বাচনকে বৈধতা দিতে চান না জোট নেতারা।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তারা এখনো আলোচনা করেননি। জাতীয় নির্বাচনের বিষয় নিয়েই এখনো তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। সময় হলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, উপজেলা নির্বাচনের ব্যাপারে দলীয়ভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মতামত অনুসারে এটুকু বলতে পারি যে, এ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রার্থীরাও রাজি নন। মানুষেরও আগ্রহ নেই। কারণ ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে জাতীয় নির্বাচনে সারাদেশে ভোট ডাকাতির যে মহোৎসব হয়েছে তা শুধু দেশবাসীই নয়, বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে। আদালতে বিএনপি নেতাকর্মীদের জামিন না পাওয়া এবং কর্মীদের প্রতি নেতাদের সহযোগিতার অভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রতি কেন্দ্রীয় নেতাদের সহযোগিতার কোনো অভাব নেই। দু’-একটা জায়গায় হয়তো একটু-আধটু সমন্বয়ের অভাব থাকতে পারে। সেগুলোও সমাধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, আদালতে বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন ঠিকমতো বিচার পাচ্ছেন না। হাজার হাজার গায়েবি মামলা দেয়া হয়েছে।

অপরদিকে বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ না নিলেও কেউ স্বতন্ত্রভাবে অংশগ্রহণ করলে, দলের ভূমিকা কী হবে সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফেব্রুয়ারির শুরুতে উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি অধ্যুষিত এলাকায় স্বতন্ত্রভাবে ভোটে যাওয়া হবে কিনা, তা পরিবেশ দেখেই স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেবে দলটি। এমনকি ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় গাইবান্ধা-৩ আসনের নির্বাচনও বর্জন করেছে দলটি। দলের নীতিনির্ধারক মহল বলছে, মূল নির্বাচন নিয়ে এখনো বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নতুন করে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে ভাবনার অবকাশ নেই। সেইসঙ্গে এখনো সংসদে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনকি এসব বিষয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো সিদ্ধান্তও আসেনি।

অন্যদিকে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে বিএনপি জোটের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে ব্যাপক চাপ ছিল। সরকারের পক্ষ থেকেও সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস দেয়ায় তারা নির্বাচনে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে বিএনপির আশঙ্কাই সত্য হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনের ফলাফলেই এটা প্রমাণিত হয়েছে। ফলাফল দেখে দেশবাসী ও বিদেশিরা বিস্মিত। যার প্রভাব উপজেলা নির্বাচনে পড়বে। সে কারণে দলটির নেতারা সহসাই উপজেলা নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছে না।

তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক নেতা মানবকণ্ঠকে জানান, মাঠপর্যায়ে দলের সক্রিয় নেতাকর্মীদের সবার বিরুদ্ধেই কমবেশি মামলা রয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনেও তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি, উপজেলা নির্বাচনেও সক্রিয়ভাবে মাঠে নামতে পারবেন না। তাছাড়া সরকার সংসদ নির্বাচনের মতোই সর্বশক্তি দিয়ে উপজেলা নির্বাচনেও জোর করে বিজয় ছিনিয়ে নেবে। এ ধরনের নির্বাচনে যাওয়ার চেয়ে বর্জন করা দল এবং নেতাকর্মীদের জন্য মঙ্গলজনক।

বিএনপির এক সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, সদ্যসমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনও বর্জনের ব্যাপারে তৃণমূল নেতাদের চাপ ছিল বিএনপি হাইকমান্ডের ওপর। দলের প্রার্থী ও তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখন ক্ষুব্ধ হাইকমান্ডের ওপর। নির্বাচনের আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলুর ফাঁস হওয়া ফোনালাপেও নির্বাচন বর্জনের কথা উঠে আসে। নির্বাচনের আগে বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানীও প্রকাশ্যেই হাইকমান্ডকে ভোট বর্জনের অনুরোধ করেন।

শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, এবারের নির্বাচনে কারচুপির ঘটনা দেখে সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীরা বিস্মিত ও হতভম্ব। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়ার পরও নির্বাচনে থাকা নিয়েও নেতাকর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন। এ পরিস্থিতিতে তিন মাসের মধ্যে আবারো আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে উপজেলা নির্বাচনে যাব কিনা- দল ও জোট তা বিবেচনা করবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে তৃণমূল নেতারা জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ভোট কারচুপির ঘটনা বিবেচনা করে আগামী উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত হবে না জানাচ্ছেন।

এদিকে বর্তমানে সারাদেশে ৪৯৪ উপজেলার মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের দেড় শতাধিক উপজেলা চেয়ারম্যান রয়েছেন। ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন দুই শতাধিক। গত উপজেলা নির্বাচনে বেশিরভাগ এলাকাতে বিএনপি ও জামায়াত পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পরই উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

মানবকণ্ঠ/এআর