উন্নয়ন নিয়ে তিন মেয়র প্রার্থীর কাড়াকাড়ি!

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি) নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী নগরীর উন্নয়ন নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর দাবি নগরীর দৃশ্যমান উন্নয়ন তাদের আমলেই হয়েছে। আর বিএনপি প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ারের দাবি তিনি পরপর চারবার এমপি ও বিসিসির প্রথম নির্বাচিত মেয়র। তাদের আমলেই বৃহৎ উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতা ইকবাল হোসেন তাফসের দাবি বরিশালে যত উন্নয়ন হয়েছে সব জাতীয় পার্টির আমলেই হয়েছে। এখন সেই উন্নয়নের ওপর চলছে ঘষামাজা।

১৯৯৩ সালে বরিশাল বিভাগে এবং ২০০১ সালে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে উন্নিত হয়। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। ২০০২ সালে বিসিসির প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন বর্তমান মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। ওই সময় তিনি চার বছর মেয়রর দায়িত্ব পালন করেন। ওয়ান ইলেভেনে এক বছরের বেশি সময় জেলে ছিলেন সরোয়ার। সরোয়ারের দাবি মেয়রর দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে পৌরসভা ও ৬টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত নগরীকে একইভাবে উন্নয়নে কাজ শুরু করেন। তার প্রথম কাজ ছিল পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়া নগরীর সরু সড়ক ও সড়কের মোড় প্রশস্তকরণ। একেবারে নবগঠিত সিটি কর্পোরেশন হওয়ায় বরাদ্দও তেমন ছিল না। স্থানীয়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করে কাজ করেছেন। এ ছাড়া নগরীর মধ্য থেকে বয়ে যাওয়া ২২টি খাল উদ্ধারে তিনি ভূমিকা রাখেন। সিটি কর্পোরেশনের আয় বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সরকারি দফতর থেকে জমি নিয়ে সেখানে মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল তার। তিনি মেয়র থাকাকালীন এক টুকরো জমিও লিজ দেননি। এমনকি ওই সময় তার দল ক্ষমতায় থাকায় আধুনিক নৌবন্দর, আধুনিক স্টেডিয়াম, বাসস্ট্যান্ড, ডিভাইডার সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন করেছেন। তার সরকারের আমলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও দপদপিয়া ব্রিজের কাজ শুরু হয় বলে দাবি সরোয়ারের।

তাছাড়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে উন্নিত হওয়ায় তৎকালীন চেয়ারম্যান বিএনপি দলীয় বর্তমান মেয়র আহসান হাবিব কামাল দীর্ঘদিন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। বিসিসির তৃতীয় নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আহসান হাবিব কামাল। এ কারণে নগরীর উন্নয়ন আর থেমে থাকেনি। আহসান হাবিব কামালের দাবি নির্বাচনকালীন সময় উন্নয়নে তিনি যে ইস্তেহার দিয়েছিলেন তার চেয়ে বেশি উন্নয়ন করেছেন। তিনি বিগত প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরনের উন্নয়নকে লিপিস্টিক মার্কা উন্নয়ন বলে অভিহিত করেন।

বিসিসির দ্বিতীয় মেয়র নির্বাচিত হন তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনে মাত্র ৫শ’ ভোটের ব্যবধানে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে পরাজিত করেছিলেন হিরন। হিরনের আমলে নগরীর উন্নয়ন দৃশ্যমান হওয়ায় তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। হিরনের উন্নয়ন দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে জনপ্রতিনিধিরা বরিশালে এসেছিলেন। তবে হিরনের উন্নয়নের টাকা এসেছিল জাইকা প্রকল্প থেকে। প্রথম মেয়র সরোয়ারের দাবি ওই প্রকল্প তৈরি করা ছিল তার আমলে। কিন্তু প্রজেক্টের টাকা আসে হিরনের আমলে। তাছাড়া হিরন যে উন্নয়ন করেছে তা আমার উন্নয়নের ওপরই। নগরীর উন্নয়নে আমি পথ দেখিয়েছি। সরোয়ার আরো বলেন, হিরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা মাফিক হয়নি। বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে ফোর লেন করে কোটি কোটি টাকা নষ্ট করা হয়েছে। ওই ফোর লেন কোনো কাজে আসছে না। তাছাড়া চার কোটি টাকা দিয়ে নগরভবন আধুনিকায়ন করা হয়েছে। অথচ ওই টাকায় বহুতল ভবন করা যেতো। এভাবে নগর উন্নয়নের নামে হিরন টাকা লুটপাট করায় পরবর্তী নির্বাচনে নগরবাসী তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

তবে সরোয়ারের এসব অভিযোগ মানতে নারাজ আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সাদিক আব্দুল্লাহর মুখপাত্র মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল। তিনি বলেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের দৃশ্যমান উন্নয়নে হিরনের অবদান নগরবাসী কোনোদিন ভুলবে না। আওয়ামী লীগের আমলেই হিরন মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় সরকার থেকে বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই বরাদ্দ পেয়ে হিরন বর্ধিত নগরী থেকে শুরু করে বস্তি এলাকায় উন্নয়ন করেন। যা দেশব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। এ কারণেই আগামী নির্বাচনে নগরবাসী আওয়ামী লীগ থেকেই মেয়র নির্বাচিত করবেন। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ নগরবাসীকে বলেছেন, নির্বাচিত হওয়ার পর হিরনের অস্পূর্ণ কাজ শেষ করবেন। একই সঙ্গে নগরবাসীর চাহিদার প্রেক্ষিতে উন্নয়ন করবেন। যে উন্নয়ন হবে টেকসই।

এদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, বরিশালের উন্নয়ন শুরু করেছে আমার দল। জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে একটানা আট বছর বরিশালে মন্ত্রী থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতারা। এ কারণে বরিশালের উন্নয়ন হয়েছে দ্রুত গতিতে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন সেই উন্নয়নের ওপর ঘষামাজা করছে। তাপস দাবি করেন, নগর ভবন ছিল পূর্বে পৌরসভা কার্যালয়। সেই কার্যালয়টি জাতীয় পার্টির আমলে নির্মিত। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির আমলের উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরলে তা শেষ হবে না।

তাপস আরো বলেন, নগরবাসী জাতীয় পার্টির উন্নয়নে ফিরে যেতে চায়। তারা আমাকে কথা দিয়েছে ৩০ জুলাই নির্বাচনে লাঙ্গলে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে। আর আমি বিজয়ী হলে প্রথমেই সিটি কর্পোরেশনকে দুর্নীতি মুক্ত করব। ঠিকাদারি কাজে কোনো পার্সেন্টিজ থাকতে পারবে না। এ ছাড়া মা ও শিশু এবং তরুণদের উন্নয়নে আমার কাজ করার ইচ্ছে আছে। তিনি বলেন, নির্বাচিত হই আর না হই আমি তাপস নগরবাসীর সঙ্গে আছি থাকব, এটা আমার প্রতিজ্ঞা।

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.