উচ্ছেদ অভিযান হলেও মামলা হয়নি

উচ্ছেদ অভিযান হলেও মামলা হয়নি

বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ পাড়ে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি থেকে বিআইডব্লিউটিএর জোরালো উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। চলমান এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ২ হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা ও ৫টি হাউজিং প্রকল্প উচ্ছেদ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। দীর্ঘ প্রায় দেড়মাস ধরে এ অভিযান চললেও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত একটি মামলাও করেনি বিআইডব্লিউটিএ। জরিমানার পরিমাণও খুবই নগণ্য। সংস্থাটির ঢাকা বন্দর প্রধান বলছেন, উচ্ছেদের পাশাপাশি দখলদাররা জরিমানা ও শাস্তির আওতায় না এলে অভিযান টেকসই হবে না। ঐতিহাসিকভাবে বয়ে যাওয়া রাজধানীর চারপাশ দিয়ে নদীগুলোই যেন ঢাকার লাইফ লাইন। তাছাড়া ঢাকার জনপদকে সুরক্ষিত নাগরিক সভ্যতা গড়ে ওঠার মূলেও এসব নদীর প্রবাহই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। অথচ মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো সব উপযোগিতাই হারিয়ে ফেলেছে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে থাকা রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো এখন যেন জনসাধারণের কাজে আসছে না। অবাধে চলেছে নদী ভরাট, অপদখল এবং নদী বিনাশী নানান তত্পরতা। যেন নদী দখল ও দূষণের প্রতিযোগিতা চলছে। আর দিন দিনই যেন জলাবদ্ধতার ভোগান্তি আরো বেড়েছে।

অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কয়েক দফা অভিযান চালালেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত একটিও মামলা করেননি অভিযোগ করে নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য সচিব আমিনুর রসুল বাবুল বলেন, অভিযানে দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলার পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো ঢাকাবাসীর জন্য প্রকৃতির আশীর্বাদ হলেও অবৈধ দখলদারদের কারণে এখন তা ক্রমেই যেন ভণ্ডুল হতে বসেছে। পরিবেশবিদদের চাপের মুখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে এসব দখলদারদের উচ্ছেদের নামে চালিয়েছেন দায়সারা অভিযান। তবে এবারের উচ্ছেদ অভিযানটার মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। তাছাড়া এবারে নদীর সব দখল উচ্ছেদ করে অচিরেই নদীর ওপর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।

তিনি বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর মধ্যে তুরাগ অন্যতম একটি নদী। এ নদীটি দখলের জন্য ঢাকা ও গাজীপুর জেলা প্রশাসন কিছুটা হলেও দায়ী। সম্প্রতি তুরাগ পাড়ে দখলদার ঠেকাতে সিমেন্টের তৈরি পিলার ও বাঁশের খুঁটি দিয়ে নদীর সীমানা চিহ্নিন্ত করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেছে পিলার ও খুঁটির কোনো স্মৃতি চিহ্নও নেই। এ ব্যাপারে যদি তখন তারা তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নিতেন তাহলে অন্যান্য দখলদারের পরবর্তিতে আর উদ্বুদ্ধ হতো না।

নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দিতে চলমান অভিযানের ১৭তম দিনে গতকাল বুধবার তুরাগ পাড়ে উচ্ছেদ চালায় বিআইডব্লিউটিএ। এ সময় দেখা যায়, সাভারের আমিন বাজার এলাকায় তুরাগ নদীর শত শত বিঘা জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে সিলিকন সিটি ও আকাশ নিলা ওয়েস্টার্ন সিটি। হাউজিং দুটির অবৈধ স্থাপনার পাশাপাশি উপড়ে ফেলা হয়েছে প্লটের সীমানা পিলার।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা বন্দর প্রধান ও যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, উচ্ছেদের পাশাপাশি দখলদারদের আর্থিক জরিমানা ও শাস্তির আওতায় না আনলে উচ্ছেদ ফলপ্রসূ হবে না। বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদী বন্দরের এ যুগ্ম পরিচালক বলেন, যত ভবন রয়েছে কোনো ভবনের রাজউকের অনুমোদন নেই। দেড় মাসেরও বেশি অভিযানে মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজারের মতো জরিমানা করা হয়েছে। ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজধারী মামলা হওয়া উচিত। সরকারের অর্থ ব্যয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে এদের কাছ থেকে এসব অর্থ নেয়া দরকার। আইনের বিধানে দখলদারদের উচ্ছেদের পাশাপাশি মামলারও অনুমোদন রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে আইনে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয় সে আইনে বিধান আছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের জন্য মামলাও করা যায়। তবে মামলা না দেয়ার জন্য তিনি দখলদারদের সরেজমিনে না পাওয়ার অজুহাত দেন।

প্রসঙ্গত, প্রথম দফায় গত ২৯ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সপ্তাহে তিন দিন করে মোট ১২ দিন উচ্ছেদ অভিযান চলে। ওই সময় ১ হাজার ৮৪৩টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, প্রথম দফায় ২৯ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা ওই অভিযানে ১ হাজার ৮৪৩টি অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এর মধ্যে যেমন বহুতল ভবন রয়েছে। তেমন রয়েছে পাকা, আধাপাকা এবং টিনশেড স্থাপনা। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম দফার অভিযানে ১ হাজার ৮৪৩টি উচ্ছেদকৃত স্থাপনার মধ্যে রয়েছে ১৬৬টি বহুতল ভবন। বহুতল ভবনের মধ্যে রয়েছে ১ তলা থেকে ৬ তলা ভবন পর্যন্ত। অভিযানে ৩০ একর জমি উদ্ধার করা হয়। অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগে অনেককে জরিমানাও করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকার জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই অভিযানে আধাপাকা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে ৩৪১টি। টিনশেড স্থাপনা ভাঙা হয়েছে ১ হাজার ৩৩৬টি।

উল্লেখ্য রাজধানীর চারপাশের নদী দূষণ নিয়ে দৈনিক মানবকণ্ঠে গত ১ অক্টোবর থেকে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.