উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ

একজন ইংরেজ রোমান্টিক কবি। যাকে ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম প্রধান কবি মনে করা হয়, যিনি সাধারণ মানুষের জীবনাচরণ, আবেগ অনুভূতিকে শৈল্পিকসৌন্দর্যে উপস্থাপন করেছেন কাব্যে। ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় নিকটবর্তী এলাকা ককারমাউথতে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন প্রেম-নিসর্গের গহনচারী কবি এবং রোমান্টিক কাব্যের যুগস্রষ্টা উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ। প্রকৃতির সাদামাটা ও তুচ্ছ বিষয়-আশয়কে অসাধারণ মহিমায় সাজিয়ে তুলেছেন তিনি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের সহযোগিতায় প্রচলিত কাব্যধারাকে ভেঙেচুরে রোমান্টিক যুগের গোড়াপত্তন ঘটান। ইংরেজি সাহিত্যে একজন দক্ষ সমালোচক হিসেবেও তার অবস্থান খুব শক্ত। দার্শনিক শিল্পপ্রয়াসী এই কবির প্রায় প্রতিটি কবিতার মধ্যেই পাওয়া যায় প্রকৃতি-নিসর্গের নান্দনিক উপাদান। প্রকৃতি এবং জীবন, দুয়ের মিশেলে ভিন্নতর এক আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তিনি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ শৈশবে পাহাড়-পর্বত চষে, নৌকাবাইচ এবং হৈ-হুল্লোড়ের সঙ্গে বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটিয়ে, পরিণত বয়স এসে কাব্যসাধনায়
যুক্ত হন। ফলে সূূচনাকাল থেকেই তিনি সাফল্যের ঘ্রাণ পেতে শুরু করেন।
খুব অল্প বয়সে কবি পিতামাতা হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন। তখন লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে আত্মীয়স্বজনদের সহযোগিতার হাত প্রসারিত থাকায় তার অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়নি। যৌবনে তিনি ফরাসি বিপ্লবের ‘সাম্য ও মৈত্রী’ আদর্শের আপ্তবাক্য শুনে বিপ্লবের প্রতি অতি-উৎসাহী হয়ে ফ্রান্সে ছুটে যান। কিন্তু তার বয়স যখন আটাশের কোঠায় এসে ঠেকল তখন বিপ্লবের নীতি ও আদর্শের বিপথগামিতা দেখে ওয়ার্ডসওয়ার্থ দারুণভাবে মর্মাহত হন। বিশেষত ১৭৯২ সালের ‘সেপ্টেম্বর ম্যাসাকার’ ঘটনায় পিশাচপ্রতিম উল্লাসে মানুষহত্যা এবং ধ্বংসলীলার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে তার চিন্তাচেতনার পরিবর্তন ঘটে। অবশেষে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে আর্থিক অনটন এবং অতীতের স্মৃতি তার মধ্যে ভীষণভাবে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। এ সময় তার বন্ধু রাইজল কলর্ভাট কবিকে অর্থের জোগান দেন এবং সব ভুলে গিয়ে কাব্যসাধানায় মত্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। রাইজলের সহযোগিতায় ওয়ার্ডসওয়ার্থের সাহিত্যচর্চার পথ ধীরে ধীরে সুগম হতে থাকে। এক্ষেত্রে তার বোন ডরোথির সেবাযতœ ও অনুপ্রেরণার বিষয়টিও অবিস্মরণীয়। কিছুকাল বাদে যখন কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে তখন আর পেছনে তাকাতে হয়নি ওয়ার্ডসওয়ার্থকে। কোলরিজ এবং ওয়ার্ডসওয়ার্থ দুই বন্ধু মিলে প্রকৃতির নির্মল আলোছায়ায় বসে সাহিত্য আলোচনার পাশাপাশি কাব্যচর্চায় ব্রতী হয়ে ওঠেন। ১৭৯৮ সালে কোলরিজের সহযোগিতায় প্রকাশিত ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘লিরিক্যাল বালাড্স’ কাব্য; যা সমগ্র বিশ্বে নতুন একযুগের দ্বারোন্মোচন করে। শুরু হয় রোমান্টিক যুগের। সেখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের বিখ্যাত Tintern অননবু কবিতাটিসহ মোট ১৯টি কবিতা স্থান পেয়েছিল। সেই সঙ্গে স্থান পেয়েছিল কোলরিজের বিখ্যাত The Ancient Mariner কবিতাটিসহ কিছু কবিতা। কালোত্তীর্ণ এই দুটি কবিতার বাইরেও কিছু কবিতা সংকলনটিকে অনেক বেশি ঋদ্ধ করেছে; যার বদৌলতে ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজের পরিচিতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় গ্রাম্য রাখাল, শ্রমজীবী মানুষ, কিষাণ-কিষাণী, কুলি-মজুরের স্থান অনেক উপরে। কেননা এ সমস্ত মানুষ কৃত্রিমতা জানে না, অভিনয় জানে না। তাদের জীবনটাই স্বচ্ছ কাচের মতো পরিষ্কার এবং নির্ভেজাল। এরা প্রত্যেকেই প্রকৃতির সন্তান। সমাজের উঁচুস্তরের মানুষগুলোর চেয়ে এসব মানুষের জীবনটাই অনেক বেশি বিশুদ্ধ। ওয়ার্ডসওয়ার্থের The Solitary Reaper কবিতায় স্কটল্যান্ডের পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়-অরণ্যময় ঘেরা একটি ফসলি মাঠে, প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য ছড়িয়ে; নির্জন নিরালায় যে পাহাড়ি তরুণীর ফসল কাটা আর করুণ সুরে গান গাওয়ার ছবি এঁকেছেন তা তুলনারহিত।
কোকিলকণ্ঠকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সেই তরুণীর সুরের ধমকে যেন সাগর-নদীরাও ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠে! তবে- ‘একাকী সে ফসল কাটছে আর আঁটি বাঁধছে,/আর গাইছে একটি করুণ সুরের গান;/ আহ, শোন! গভীর উপত্যকাটি/উপচে পড়ছে গানের তানে।’ এই পঙ্ক্তিমালা পাঠক মনে করুণ উদ্রেক সৃষ্টি করে, ভীষণ নাড়া দেয়। পরবর্তী অংশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে কবি যখন বলে ওঠেন-‘কেউ কি আমায় বলবে না সে কি গান গায়?-/হয়তো বা বিষাদের কোনো গানের প্রবাহ/পুরনো, অসুখী, বহু আগের জিনিস,/এবং বহু আগের যুদ্ধের গাথা/নাকি এটা কোনো চারণ কবির গাথা/আধুনিকযুগের পরিচিত ঘটনা?/কোনো স্বাভাবিক দুঃখ, হারানোর বেদনা,/যা ঘটেছে এবং আব রো ঘটতে পারে?’ অনুবাদ-জয়নুল আবেদীন। এখানে কবির মতো সাধারণ মানুষের মনেও হাজার রকমের প্রশ্ন উদিত হয়-এ গান কি সুখের, নাকি বুক ছেঁড়া কষ্টের? নাকি অন্য কিছু? ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার The Solitary Reaper একটুখানি কবিতায় বিধ্বস্ত সময়ের ইঙ্গিতসমেত অজস্র প্রশ্ন রেখে গেছেন পাঠকের জন্য। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, মানবতাবোধ সবসময় পাশাপাশি অবস্থান করে। কল্পনার সুউচ্চ প্রাসাদের মধ্যেও তিনি ছিলেন ভীষণ বাস্তববাদী মানুষ। ইংল্যান্ডের কবি সাদির মৃত্যুর পর ওয়ার্ডসওয়ার্থ রাজকবির মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। কিন্তু তার মনটা সর্বদাই সাধারণ্যের কাতারে পড়ে থাকত। আজ তাঁর জš§দিন।
সাবেরীন সেতু