ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনিশ শতকের এমন একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার যার অবদান এত যুগ পরেও মানুষের কল্যাণে পথিকৃৎ হয়ে রয়েছে। প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই তিনি বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল তার। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ করে তোলেন ও অপরবোধ্য করে তোলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয়সহ একাধিক পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহু রচনা। অগাধ পাণ্ডিত্য তো বটেই, মায়ের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশে দুঃসাহসী কর্মকাণ্ডের কারণেও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে বাড়ির পথে গভীর রাতে নদী পার হওয়ার কোনো উপায় না পেয়ে ঝড় ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ নদী তিনি সাঁতরে পারি দিয়েছিলেন। মাতৃভক্তির এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া ভার। উনিশ শতকের ভয়াবহ অন্ধকার সময়েও বিধবা বিবাহ ও স্ত্রী শিক্ষার প্রচলনকে তিনি যুক্তিযুক্ত মনে করেছিলেন এবং এ লক্ষ্যে তিনি নানা রকম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এমনকি নিজের ছেলের সঙ্গে বিধবা বিবাহ দিয়ে এটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার মতো মানসিক দৃঢ়তা তিনি দেখিয়েছেন। বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহুবিবাহের মতো একটি কুপ্রথাকে নির্মূল করতেও আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন বিদ্যাসাগর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জš§গ্রহণ করেন। ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ ঈশ্বরচন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন। পাঁচ বছর বয়সে বাবা ঠাকুর দাস বালক ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের সনাতন বিশ্বাসের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন। পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী গ্রামের বীরসিংহের একটি নতুন পাঠশালায় ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র। এই পাঠশালায় তিনি সেকালের প্রচলিত বাংলা শিক্ষা লাভ করেছিলেন। ১৮২৮ সালের নভেম্বর মাসে পাঠশালার শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পিতার সঙ্গে কলকাতায় আসেন। ১৮২৯ সালের ১ জুন সোমবার কলকাতা গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। সাড়ে তিন বছর তিনি ওই শ্রেণিতে পড়াশোনা করেন। এরপর ধাপে ধাপে শিক্ষার সব শ্রেণি তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ করেন। ১৮৩৯ সালের ২২ এপ্রিল হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় যথারীতি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৬ মে ল কমিটির কাছ থেকে পাওয়া প্রশংসাপত্রে তাকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি দেয়া হয়। শিক্ষা, সমাজ এবং মানবদরদি এই মানুষটির কৃতকর্ম এই স্বল্প পরিসরে লিখে শেষ করার নয়। বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রয়াত হন ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই, বাংলা ১২৯৮ সালের ১৩ শ্রাবণ কলকাতার বাদুড়বাগানস্থ নিজ বাসভবনে। আজ গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করছি।
– আব্দুল্লাহ আল সিফাত