ঈদ যাত্রায় ভোগাবে উন্নয়ন প্রকল্প ও চালকদের বিশৃঙ্খলা

ঈদ সামনে রেখে রাজধানীবাসীর বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। শেষ হয়েছে বাস ও ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি। কিন্তু কেমন হবে এবারের ঈদযাত্রা? রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার প্রধান রাস্তাগুলোর কয়েকটিতে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় যানবাহন চলাচলে সময় বেশি লাগছে। এর সঙ্গে বৃষ্টি যোগ করেছে ভোগান্তির নতুন মাত্রা। বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে যাওয়ায় গাড়ি চলতে সময় বেশি লাগছে। পাশাপাশি রয়েছে ঈদের বাজারে বাড়তি আয় করতে পরিবহনগুলোর অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। এবার ঘরমুখো মানুষকে এই দুটি কারণ দুর্ভোগে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে রাজবাড়ী অংশের দৌলতদিয়া ঘাটে আরো দুটি ফেরিঘাট নির্মাণের কাজ চলছে। নতুন ফেরিঘাট দুটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে দৌলতদিয়া অংশে ফেরিঘাটের সংখ্যা দাঁড়াবে ৬টিতে এবং বাড়তি যানবাহনের চাপ সামলানো আরো সহজ হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লোকবল ও সরঞ্জামের অভাবে ঈদের আগে ফেরি দুটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এ নৌরুট দিয়ে চলাচলে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জানা যায়, দৌলতদিয়ায় নতুন দুটি ঘাট চালু করতে ২ ও ৬ নম্বর ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব ২টি পন্টুন আনা হয়েছে। সেখানে শ্রমিকরা বালু ও ইটের টুকরাভর্তি বস্তা ফেলে ঘাটের সংযোগ সড়ক চালুর কাজ করছেন। কয়েক শ্রমিক জানান, পন্টুন ও ঘাট চালু করতে লোকবল যথেষ্ট নয়। আরো লোক দরকার। পন্টুন ধরে রাখতে আরো আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদে ঘরমুখো হাজার হাজার মানুষ এবং যানবাহন পারাপার নির্বিঘ্ন করতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ১৯টি ফেরি ও ৬টি ঘাট চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে এই নৌপথে ছোট-বড় মিলে মোট ১৭টি ফেরি চালু রয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে আরো ২টি ঘাট বাড়াতে বিআইডব্লিউটিএর ২টি পন্টুন আনা হলেও তদারকি করতে প্রয়োজনীয় লোকবল দরকার। পন্টুন ধরে রাখতে তারসহ সিলভার না থাকায় এখন পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ঈদের আগে যথাসময়ে ঘাট ২টি চালু করা সম্ভব না হলে যাত্রী এবং যানবাহন পারাপার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানান, অতিরিক্তি নতুন ২টি ঘাট চালু করতে ইতিমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে লোকবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে ঘাট ২টি চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে দেখা গেছে, সড়ক পথে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের বিলম্ব শুরু হচ্ছে গাবতলী পার হয়ে সাভার থেকে। বিশেষ করে আমিন বাজার সেতুর মুখে। এখনো এই সড়কের যানজট কমেনি। যারা সিরাজগঞ্জ হয়ে যাচ্ছেন, তাদের ভোগান্তির মূলে রয়েছে গাজীপুর মহাসড়ক ও যমুনা সেতুর যানজট।

পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী থেকে বের হতেই প্রচণ্ড যানজট সহ্য করতে হচ্ছে। এরপর কাঁচপুর ব্রিজ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট তো রয়েছেই। তবে এ মহাসড়কের ফেনী ফতেহপুরে নতুন চালু হওয়া রেলওয়ের ২টি ওভারপাস গত ১০ দিন ধরে যানজট কমাতে একটু অবদান রাখছে।

উত্তরবঙ্গ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের ৬ জেলার যাত্রীরা আবদুল্লাহপুর ও টঙ্গী সেতু এলাকার যানজটে ভোগান্তিতে পড়ছেন। গাজীপুর থেকে ঢাকা, গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইল এবং গাজীপুরের চান্দনা-চৌরাস্তা এলাকা থেকে জেলা শহরে নিয়মিত যানজট হচ্ছে। জয়দেবপুর চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস মোড়, সাইনবোর্ড, চেরাগ আলী পর্যন্ত যানজট থাকে।

গাজীপুর থেকে ঢাকা যেতে ৪-৫ ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। টঙ্গী কলেজ গেট থেকে ভোগড়া বাইপাস মোড় পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো স্থানে রাস্তার পানি বাসের ভেতরেও ঢুকে পড়ে। এই মহাসড়কে যানজটের মূল কারণগুলো হচ্ছে- চলমান নির্মাণ কাজ, ফুট ওভারব্রিজ না থাকা, জলাবদ্ধতা, অবৈধ পার্কিং এবং গাড়িচালকদের বিশৃঙ্খলা।

গাজীপুরের নাওজোর মহাসড়ক পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক অহিদুজ্জামান জানান, চান্দনা-চৌরাস্তায় ও ভোগড়া বাইপাস মোড় এলাকায় চলমান ফ্লাইওভার ও ড্রেনেজ নির্মাণ, বিআরটিএর রুট নির্মাণের কাজ এবং বৃষ্টির কারণে রাস্তার জলাবদ্ধতা, রাস্তার ওপরে ট্রাকস্ট্যান্ড এবং ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানোর কারণে যানজট হয়। কিন্তু এগুলোর মধ্যে যেগুলো পুলিশের দায়িত্বের ভেতরে রয়েছে সেগুলো আমরা পালন করব। তবে মানুষকেও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে যানজটের অন্যতম বড় কারণ চালকদের অতিরিক্ত যাত্রী উঠানোর প্রবণতা।

গাজীপুর ট্রাফিক বিভাগের এএসপি সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, সিটি কর্পোরেশনের ছয়দানা, চান্দনা-চৌরাস্তা ও ভোগড়া বাইপাস মোড় এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে মহাসড়কের প্রশস্থতা কমে গেছে। নির্মাণ কাজ চলমান সময়ে বিকল্প কোনো রাস্তার ব্যবস্থা করা হয়নি।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এবার অপেক্ষাকৃত কম যানজট হচ্ছে। তবে গাজীপুরের যানজটের প্রভাব পড়ছে এই সড়কে। সিসিক্যামেরা বসিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের তদারকির কারণে যানজটসহ দুর্ঘটনা, চুরি-ডাকাতি ও অনিয়মের ঘটনা কমেছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির সহসভাপতি রবিউল হোসেন শাহিন জানান, ঈদ উপলক্ষে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে না। কেউ যদি কোনো যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করে তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চারলেন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি বর্ষা সামনে রেখে শুরু হওয়া বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরবঙ্গসহ ২১ জেলার যাত্রীদের চরম যানজট ও ভোগান্তিতে পড়তে হবে। গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত প্রতিদিনই যানজট লাগে। মহাসড়কের কদিমধল্যা, পাকুল্যা, নাটিয়াপাড়া, টাঙ্গাইল বাইপাস, ধেরুয়া, ঘারিন্দা বাইপাস, রসুলপুর ও এলেঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া মহাসড়কে ভাঙাচোরা গর্তে যাত্রীবাহী বাস ও মালবাহী ট্রাক বিকল হয়ে যানজট আরো অসহনীয় করে তুলেছে। টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিমুল এহসান জানান, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ৮ জুনের মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংস্কারসহ যানজট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তাই ঈদ যাত্রায় যাত্রীদের চরম যানজট ও ভোগান্তির হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

চারলেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক জিকরুল হাসান জানান, চারলেন প্রকল্পের প্রায় ৬৫ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে। প্রকল্পের আওতায় ২৬টি সেতুর মধ্যে ২৪টি সেতু ঈদের আগেই চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হচ্ছে। ফলে যানবাহন চারলেনে চলতে পারবে। এতে যানজট কমবে বলে আশাবাদী তিনি।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় গণমাধ্যমকে জানান, ঈদ সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু সেতু ঢাকা-মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মির্জাপুরের ধেরুয়া রেলক্রসিং, কালিহাতীর পুংলী সেতু, টাঙ্গাইল শহর বাইপাসের রাবনা মোড়সহ যে সমস্ত স্থানে যানজটের আশঙ্কা থাকে সেখানে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনাকবলিত এবং রাস্তায় বিকল হওয়া যানবাহন দ্রুত সরিয়ে নেয়ার জন্য কয়েকটি স্থানে রেকার প্রস্তুত রাখা হচ্ছে এবার। ঈদের ৩ দিন আগে থেকে মহাসড়কে যান চলাচলের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য কাজ করবে ৩টি কমিটি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী ফতেহপুর রেলওয়ে ওভারপাসের ২টি লেন চালু হওয়ার পর যানজট কিছুটা কমেছে। তবে চারলেন প্রকল্পের অপর দুই লেনের কাজ এখনো চলছে। ফলে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের বিড়ম্বনা এবারো আগের মতোই হবে।

মানবকণ্ঠ/এএএম