ঈদে যাত্রী পরিবহনে নামছে ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ

আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে নৌপথে যাত্রী পরিবহনে প্রস্তুত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ। ভরা বর্ষায় বৈরী আবহাওয়ায় যাত্রীপরিবহনে এসব লঞ্চ যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চমালিকরা এ ব্যাপারে নির্বিকার। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবহন, লঞ্চের ছাদে যাত্রীবহন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ লঞ্চ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও লঞ্চমালিকরা তার তোয়াক্কা করেন না। বরং ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই লঞ্চ নিয়েই তারা মাঝনদীতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরা নিয়ে এবারো রয়েছে নানা আশঙ্কা। অনেকের মতে, সরকারি নৌযানের অপ্রতুলতাই বেসরকারি ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে যাত্রীপরিবহনের সুযোগ পাচ্ছে।
লঞ্চমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট বদিউজ্জামান বলেন, এবার ঈদে ছোট যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলের ওপর মালিকদের নিষেধ করা হয়েছে। আগের তুলনায় মালিকরা আরো সচেতন। দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে মালিকরাও পথে বসে যাওয়ার কারণে অনেক ত্রুটিপূর্ণ নৌযানও আমরা চলাচল থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর অবৈধভাবে কোনো নৌযান পরিচালনার সুযোগ নাই বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ঈদকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে নৌপথে চলছে ব্যাপক আয়োজন। লঞ্চমালিকরা নতুন-পুরনো সব ধরনের লঞ্চেই ঈদে যাত্রীপরিবহনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য নৌপথের বিভিন্ন রুটে নামছে হাজারেরও বেশি ছোট-বড় লঞ্চ। এসব লঞ্চের বেশির ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন। এ ছাড়াও ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর আশপাশের ডকইয়ার্ডগুলাতে আরো কয়েকশ’ চলাচলের অযোগ্য লঞ্চ ঈদে ঘরমুখো যাত্রীপরিবহনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। শত শত শ্রমিক দিনরাত এসব লঞ্চ মেরামতের কাজ করছেন। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ২৭টি ছোট-বড় ডকে এসব লঞ্চ মেরামত ও রং করার কাজ চলছে। সদরঘাটের বিপরীত দিকে বুড়িগঙ্গার তেলঘাটের তীরের ডকগুলোতেও শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ঈদের আগ পর্যন্ত প্রতিটি ডকই এ কাজের জন্য বুকিং দেয়া হয়েছে। কারণ লঞ্চমালিকরা চাচ্ছেন ঈদের আগেই তাদের লঞ্চ মেরামত ও রং লাগিয়ে পানিতে ভাসাতে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঈদের অনেক আগে থেকেই ডকইয়ার্ডগুলোতে মেরামত ও রং করানোর জন্য নৌযান আসতে শুরু করে। এ জন্য লঞ্চমালিকরা আগেই ডক ভাড়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকেন। ফিটনেস থাকা ও না-থাকা সব ধরনের লঞ্চই এ সময়টাতে ডকে আসছে। লঞ্চ মেরামতকারী ডকমালিকরাও জানিয়েছেন, ঈদের আগে তাদের অনেক বেশি কাজের চাপ পড়ে। মালিকদের মতামতের ভিত্তিতে ডকে লঞ্চ মেরামত করতে হয় তাদের। এ ক্ষেত্রে কোনো লঞ্চের ফিটনেস আছে নাকি, নেই তা তাদের জানার বিষয় নয়। তবে ডি ক্যাটাগরির ৫ শতাধিক লঞ্চকে নৌপথ চলাচলের অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও কোনো সরকারই এসব নৌযানের গতিরোধ করতে পারেনি। ২০০৫ সালে লঞ্চের সঙ্গে মূল নকশার অমিল, লঞ্চের তলদেশ হালকা, ত্রুটিপূর্ণ ও মরচে ধরার কারণে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর বেশকিছু লঞ্চকে চলাচলের অযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর ওইসব লঞ্চ চলাচল একদিনের জন্যও বন্ধ করতে পারেনি। আসন্ন ঈদে ভরা বর্ষা মৌসুমে নৌপথে ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন এসব লঞ্চ ব্যবহারের কারণে নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে নৌযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, প্রায় ৯০ ভাগ যাত্রীবাহী নৌযানের ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে তদন্ত না করেই মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে সার্ভে সনদ দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যাদের সার্ভে সনদ নেই তারা টাকার বিনিময়ে মাসিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে টোকেন সংগ্রহ করে লঞ্চ পরিচালনা করেন। ফলে নৌপথে যাত্রী নিয়ে চলাচলকারী অধিকাংশ লঞ্চই ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন। বর্তমানে সারাদেশে নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এর মধ্যে চলতি বছর মাত্র ৫ হাজার নৌযানের বার্ষিক জরিপ হয়েছে। তা ছাড়া নৌপথে চলাচল করছে প্রায় ২০ হাজার ছোট-বড় নৌযান। ফলে এত নৌযানের ভিড়ে অনেক সময় নিবন্ধন থাকা নৌযানও পরীক্ষার জন্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) লঞ্চ সার্ভেয়ার কর্মকর্তা মির্জা সাইফুল বলেন, পুরাতন লঞ্চের মধ্যে যেগুলো মেরামত করলে ফিটনেস ফিরে পাবে- সেগুলোই শুধু মেরামতের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়। আবার মেরামতের পরেও সেগুলোর ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়। পরে ফিটনেস ঠিক থাকলেই কেবল তা চলাচলের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়, অন্যথায় বাতিল করে দেয়া হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদিন বলেন, আমরা ঈদের সময় বাড়তি নজরদারি করি যাতে কোনো ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল না করতে পারে। এ বছরও সিসিটিভির মাধ্যমে তা তদারকি করা হবে। তবুও অনেক সময় অনেক লঞ্চের ভিড়ে ফাঁকফোকর দিয়ে এসব লঞ্চ যাত্রী নিয়ে চলে যায়। ধরা পড়লে জরিমানা এবং কারাদণ্ড দেয়া হয়।
ঈদে নৌপথে যাত্রীপরিবহন প্রসঙ্গে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান জানান, ঈদে নৌপথের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসি পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করেছে। নৌপথের সব বিষয়ে তদারকিসহ জেল-জরিমানা করার ক্ষমতাও থাকবে টাস্কফোর্সের। পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঈদের আগে ও পরে নৌপথে টহল ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে।

মানবকণ্ঠ/জেডএইচ

One Response to "ঈদে যাত্রী পরিবহনে নামছে ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ"

  1. Pingback: নির্বাচিত হেডলাইন - ১৮ জুন ২০১৭ ⋆ সাম্প্রতিক ডটকম